পাঠপ্রতিক্রিয়া

নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ১৭:১৭
‘গল্প বলেই আমি নোবেল পেয়েছি’—মো ইয়ানের আত্মবিশ্বাসী এই কথাটি মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। নোবেলপ্রাপ্ত লেখকদের মধ্যে এমন চমত্কার গল্পকথক আমরা কমই পেয়েছি। তিনি যে গল্পকে তাঁর শিল্পদৃষ্টির উপাদানরূপে গ্রহণ করেছেন, তার সঙ্গে জীবনের বাস্তব শিক্ষাই অনেক বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। গল্প বলতে মো ইয়ান গল্প ও উপন্যাসের আখ্যানে যে বর্ণনারীতি আছে, তার শক্ত বুনিয়াদকে ইঙ্গিত করেছেন। আমরা যাকে ছোটগল্প বলছি, উপন্যাস বলছি গল্পের গতিতেই তার বর্ণনা দেওয়া হয়। অর্থাত্, গল্পটি মাধ্যম। মো ইয়ানের ‘ফ্রগস’, ‘স্যান্ডেলউড ডেথ’, ‘দ্য গার্লিক ব্যালাডস’, ‘দ্য ট্রান্সপারেন্ট ক্যারট’ ইত্যাদি উপন্যাস কিংবা ‘ড্রাই রিভার’ গল্প—এসবই তাঁর সেই গল্পকথনের অন্তর্গত। তিনি গল্প লেখার যে উদ্যম লাভ করেন, লোকের কাছে গল্প বলার উদ্যম তারচেয়ে বেশি পান। উপন্যাসের দিন এখন কেমন চলছে বাংলা ভাষায়? কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘বাংলা ছোটগল্প মরে যাচ্ছে কি না?’ গল্পের দিন কী তাহলে সত্যিই ফুরিয়েছে? আমাদের মনে পাঠগত আনন্দ বা অনেকদিন পর্যন্ত মনে রাখার মতো একটি অনুভূতি কী থাকছে এখনকার গল্প পাঠ করার পর? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব সহজ নয়। কিন্তু সম্ভাবনা তো থাকেই। মো ইয়ান তাঁর বাস্তবজীবনের যে গল্প বলেন, তাতে থাকে মায়ের গল্প, ‘ফ্রগস’-এ খালার গল্প কিংবা না খেয়ে দিন পার করার গল্প। আমাদের ব্যক্তিক বা সামাজিক জীবনে এ রকম গল্পের তো অভাব নেই। মো ইয়ান নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে যখন বলছেন ‘তিনি একজন গল্পকথক’ তাঁর মতো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চারপাশের মানুষগুলোও কোনো না কোনো দিক থেকে জীবনসংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া একজন বলিষ্ঠ গল্পকথক। যিনি হকার, প্রতিদিন অন্তত একটি কাপড় বিক্রির জন্য কাপড় হাতে ফুটপাতে দাঁড়ান, তাঁর কাছেও জীবনের গল্প থাকে। মো ইয়ান চেতনাকে নাড়িয়ে গেলেন আর বললেন—তিনি গল্পকথক। আমাদের গল্প এখন বাড়ছে। আমাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামগুলো বিবর্তনের মধ্যে পড়ে কি আমাদের মধ্যে নতুন গল্পের জন্ম দেয় না! গল্প-উপন্যাসের জন্য এসবও নতুন গল্প হতে পারে। বেরিয়ে আসতে পারেন আমাদের নতুন গল্পকথক। সে গল্পকথক হয়তো আরও সামপ্রতিক গল্প বলতে পারবেন। মো ইয়ান এই নতুন সম্ভাবনা দেখাতে পারেন উদ্দীপকরূপে। তিনি জানান, কুিসত হলেও তিনি জানতেন তাঁর কী করা উচিত। কবরে তাঁর মায়ের মৃতদেহ মাটিতে মিশে গেলে তাঁকে ‘পৃথিবীর অংশ’ বলেছেন; গ্রামে এক গল্পকথক এসেছিলেন—তিনি যেদিন গল্প বলতেন, সেদিন তাঁর গৃহস্থালীর কাজ বন্ধ থাকত, গরু ও ভেড়াপালক হবার সময় স্কুলের মাঠে বন্ধুদের খেলার দৃশ্য তাঁকে বেদনা দিত—এগুলো সপর্শকাতর এবং প্রায়োগিক শিক্ষা। প্রায়োগিক এ জন্য যে, তিনি জীবনের গোপনতম শ্রেষ্ঠ প্রেরণা হিসেবে তা গ্রহণ করেছেন; শিল্পে তা প্রতিষ্ঠিতও করেছেন। এভাবে তাঁর গল্প ও উপন্যাসের গল্পেরা জীবনের প্রতিনিধিত্বশীল সত্তা হয়ে ওঠে। মহত্ শিল্পীর এটাই লক্ষণ। কী আশ্চর্যভাবেই এই গল্পগুলো আমাদের চার-পাঁচজনের স্বাভাবিক জীবনগল্প মনে হয়! নিজের নাম অর্থাত্ মো ইয়ান নামের শাব্দিক অর্থ ‘কথা বোলো না’ বা নীরবতা পালন করো—এটি দেখে তিনি বিস্মিত হতেন। তিনি বলেছেন, একজন মানুষের অভিজ্ঞতা সীমিত হতে পারে, এ জন্য তাঁর নিজের গল্প ফুরাবার পর অন্যদের গল্প তাঁকে বলতে হবে। বক্তৃতার শেষে বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে আমি আমার গল্প বলা অব্যাহত রাখব। কথাটি হতে পারত ‘গল্প লেখা অব্যাহত থাকবে’। কিন্তু তা না বলে তিনি বলার বিষয়কেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর এই আত্মবিশ্বাস আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হলে আমরাও বাংলা গল্প-উপন্যাসের নবজাগৃতিতে আত্মবিশ্বাসী হতে পারব।