মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মরণে
তপন বাগচী
বেড়ে ওঠা শিশু তুমি কপোতাক্ষ তীরে
কবিতার ডাকে একা ছেড়েছিলে ঘর
দেখেছ নিজের চোখে ক্ষুব্ধ পৃথিবীরে
মহাকবি, অবশেষে পেলে নিজ স্বর।
তোমার হাতেই প্রাণ পায় রামায়ণ
পদ্মাবতী শর্মিষ্ঠার নেচে ওঠে বুক
ব্রজাঙ্গনা স্থির করে তোমার আসন
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ দেখার সুখ।
বাংলাভাষা ধন্য আজ তোমার আদরে
তোমার শাসন মানে নাটক-কবিতা
ঘরের ছেলেই তুমি ফিরে এলে ঘরে
তোমার সৃজন আজ সাহিত্য-সংহিতা।
যশের মন্দিরে তুমি কাটিয়েছ কাল
তোমাকে চিনেছে তাই, কাল-মহাকাল।
---
পৌরুষের অভিষেক
আরিফ মঈনুদ্দীন
আমিও এসেছিলাম
বিলম্বিত এক অভাজন তীর্থযাত্রীর মতন
দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপাতে হাঁপাতে
দরগামুখী জনস্রোতের
শেষ প্রতিযোগীটি যেমন পাওয়া না-পাওয়ার
আশঙ্কায় জপমালা হাতে ডাকতে থাকেন
প্রভুর সঙ্গে তার নিকটতম প্রতিনিধিকে
আমিও তেমনি ইহজাগতিক
একজন মান্যবরকে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাতে
ছুটে এসেছি লৌকিক অন্ধকার ঠেলে
হাতের মুঠোয় ভয়ডর চেপে রেখে
অধরোষ্ঠে ধারণ করেছি সম্বোধনের সাবলীল উচ্চারণ
সহাস্য বদনে ডেকে বললেন তিনি,
সাহসী পুরুষ তুমি ধরে রাখো বীর্যবান এই ধারা
তোমাকে দেখে প্রাণিত হবে
জয়ের মশাল নিয়ে পেছনে আসছেন যাঁরা
----
শিমুলে দুধেল শিশির
রাহমান ওয়াহিদ
পুরো আকাশটাই নেমে এসেছিল শোকার্ত নদী হয়ে। যূথবদ্ধ আকাশ-নদী একই সমতল ছুঁয়ে দেখেছিল উচ্ছলিত মাছেদের চোখের কার্নিশে অসম্ভবের ঝিনুকি চাঁদ। তালুবন্দী হয় না তো কোনো জোছনা সুখদ। শুধু অযাচিত টান পড়ে প্রাচীন সংসারে। তখন এক বোতাম-ছেঁড়া কিশোরীর বুকের তলে যে ছন্নছাড়াটি ডাংগুলি খেলেছিল, তাকে আর ঘুম-গানে জাগাতে পারেনি কেউ মাঘী পূর্ণিমায়। হয়তো বা সেই শূন্যতায়—আসছে শীত কিংবা বসন্তে শিমুলে শিমুলে নেমে আসবে ভালোবাসার দুধেল শিশির। ফিরে যাবে নমিত আকাশও তার নীলাভ আকাশেই।
---
আয়না
সুমী সিকানদার
নিজের দিকে ভালো করে তাকাতে পারি না ইদানীং
নিজেকে দেখা মাত্রই তুমি ভেসে ওঠো
মদ্যপী আয়নায়।
যেন আমার মুখ কেটে কেটে তোমার মুখ
আমার শরীর কেটে কেটে তোমার শরীর
দু-ফোঁটা তীব্র কালকূটের কালাতিপাত।
যেন এমনটাই হবার কথা
আমার সর্বস্ব সম্বিত্কাল তোমারই হবার কথা
ক্রমশ; স্থিরতার মধ্যস্থতায়।
---
অতিরিক্ত আঙুল
জাহিদ সোহাগ
উহ্ হাড় ফুটো হয়ে ঢুকছে ঘোড়া, বাঘের কম্বলও যেন বিলাপ আজ। শ্বেতপাথরের মতো যে স্তনের ঢল, তাকে বলছি চোখের নিচে যে কালো জমেছে বরং তাকেই সারাও।
ভেবেছিলাম আমিও বুঝি ব্যাঙের রক্ত ছেনে ছেনে ডুব দিতে পারি কিন্তু দ্যাখো তোমার দেয়ালে রেডিয়ামের নক্ষত্রের মতো ফুটে আছি অজস্র চোখে।
আর সূর্যমুখী ক্ষেতে অন্তর্বাস খুলে বেছে নেবে চামড়ার উকুন—কোথাও দূর্বা ঘসে ঘসে নিতে পারি নিদান। কিন্তু সবটুকু কুয়াশা টেনেছি নস্যি ভেবে তাই টুপটুপ করে প্যারাসিটামল নামছে ডুমুর-জলে।
তুমি গায়ের লেপ টেনে বলো, গ্রীষ্মেও দেখেছি হাঁসফাঁস আর জিভ এ-গলি ও-গলি করেছে বরফের লোভে—আমি তাই ভাবি, অসহ্য আমি শুধু ঋতুতেই নয়, মাঝে মাঝে হাতেও গজাতে থাকে অতিরিক্তি আঙুল।
---
মেঘের রাখাল
মিছিল খন্দকার
রাশভারী মেঘের পাল
তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছ
ও বাতাস—
তুমি কি মেঘের রাখাল?
কৃষ্ণের অন্যরূপে
এসেছ কি আজ এই গাঁয়
রাধিকা উঠোনে দাঁড়িয়ে
তুমি তাকে ভেজাও বরষায়...
