খারাপ দাঁত ক্ষতিকর

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৩৭
অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বিভাগীয় প্রধান, ডেন্টেষ্ট্রি বিভাগ বারডেম, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজ চেম্বার:১৫/এ গ্রীন স্কয়ার গ্রীন রোড, ঢাকা দাঁতের ক্ষয়জনিত কারণ, গোড়া ফোলা এবং পেকে যাওয়া ইত্যাদির ফলে খাদ্য-দ্রব্যাদির সংঙ্গে নানা ধরণের মারাত্মক রোগের জীবাণু পাকস্থলীতে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং এই জীবাণুই পরবর্তীকালে দেহের অভ্যন্তরে কঠিন ও সংক্রামক রোগের সৃষ্টি করে। দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে দেহকে সুস্থ রাখা যায় একথা নি:সন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। মুখের রোগের কারণে দেহে এই সমস্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে বলেই মুখ ও দাঁতের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে মাড়ির রোগ বেড়েই চলেছে, তবে শহর এলাকার লোকদের মধ্যে এর তীব্রতা কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলে প্রচুর লোকের মধ্যে এই রোগ রয়েছে। যেহেতু হঠাত্ মারাত্মক কোন অসুবিধা দেখা দেয় না তাই মাড়ির রোগের অভিযোগও কম। যেহেতু রোগটি ধীর গতির ধ্বংসকারী তাই প্রদাহের গতি দিনের পর দিন বাড়তে থাকে এবং এক পর্যায়ে এসে মূল্যবান দাঁতটিকে হারাতে হয়। পোকা লাগা দাঁতের রোগের নাম “ডেন্টাল ক্যারিজ”। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরীপে দেখা গেছে যে বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে অর্থাত্ আমাদের মত দেশে এই রোগ ক্রমাগত বাড়ছে, অপর দিকে উন্নত দেশে এই রোগ ক্রামগত কমে যাচ্ছে। কারণ, সেখানে মানুষ দাঁতের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার হচ্ছে। তবে যাদের মুখে জিনজিভাইটিস বা মাড়ির রোগ থাকা অবস্থাতেই অন্যান্য সাধারণ রোগ যেমন বাতজনিত সন্ধি প্রদাহ, হূদরোগ, বহুমুত্র রোগ ইত্যাদি থাকে তাদের ঐ সময়ে মুখের খুব নগণ্য পরিচর্যা এবং দেহের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বা অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যাঘাত হওয়ার কারণে এর প্রভাব মুখের উপর পড়ে। তাই তখন মাড়ির রোগটি ঐ সময়ে বাড়তে থাকে। বহুমূত্র রোগীদের দেহের রক্তের শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে মাড়ির রোগের উপর প্রভাব পড়তে পারে। যেমনটি দেখা দিতে পারে গর্ভাবস্থায়। গর্ভবতী মায়েদের হরমোন পরিবর্তনে মাড়ির রোগ যাকে বলা হয় প্রেগনেন্সী জিনজিভাইটিস বা “গর্ভাবস্থায় মাড়ির প্রদাহ”। যেহেতু দাঁত ও মাড়ির সংঙ্গে দেহের রক্ত চলাচলের সম্পর্ক আছে, তাই ইনফেকশন রক্তের সংঙ্গে গিয়ে হূদপিন্ড, মস্তিষ্ক, হাড়, সন্ধি, বৃক্ক, যকৃত ও চর্মের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মুখের সংক্রমণ জাতীয় এই ধরণের রোগের কারণে যে সমস্ত রোগ সৃষ্টি হতে পারে বা রোগটিকে আরও ত্বরান্বিত ও দির্ঘায়ীত করতে পারে সেগুলো হলো- ১. হূদরোগ, ২. বাত রোগের সন্ধি প্রদাহ, ৩. কিডনি রোগ, ৪. চর্ম রোগ ৫. মস্তিষ্কের রোগ, ৬. নাক, কান, কলার রোগ, ৭. উচ্চ রক্তচাপ ৮. বৃক্ক প্রদাহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাদের দেহে অন্যান্য রোগের উপস্থিতি আছে তাদের করণীয়- ১. নিয়মিত দু’বেলা সকালে ও রাতে আহারের পর দাঁত ও মাড়ি পরিস্কার করা প্রয়োজন তবে যাদের নিজের করতে অসুবিধা হয় তাদের অন্যের সাহায্য নিয়ে হলেও তা করানো প্রয়োজন। ২. দাঁতের অথবা মাড়ির প্রদাহ থাকলে তা চিকিত্সার মাধ্যমে সুস্থ করা প্রয়োজন। কারণ প্রদাহ দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ৩. নিয়মিত একটি জীবনুনাশক ওষুধ দিয়ে মুখ কুলিকুচি করা প্রয়োজন (বিশেষতঃ রাতের আহারের পর, ঘুমানোর আগে) ৪. কোন অনুপস্থিত দাঁত থাকলে তা কৃত্রিম দাঁতের মাধ্যমে স্থান পূরণ করা প্রয়োজন। ৫. দন্ত চিকিত্সকের নিকট মুখ ও দাঁতের রোগের চিকিত্সার পূর্বে দেহের অন্যান্য রোগের উপস্থিতি অবহিত করা প্রয়োজন, কারণ দন্ত শৈল্য চিকিত্সার পূর্বে এন্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ যেমন জরুরী তেমনি দেহের স্বাভাবিক অবস্থা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করাটাও অত্যাবশ্যক। ৬. বছরে অন্ততঃ দু’বার (ছয়মাস অন্তর) একজন দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্যে মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। ৭. চিকিত্সার পূর্বে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি, একবার ব্যবহার যোগ্য সূঁচ, (ইনজেকশানের প্রয়োজন) ইত্যাদির ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ৮. বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞের পারস্পরিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চিকিত্সার ব্যবস্থাপত্র কার্যকর করাটাই নিরাপদ। মাড়ির রোগ দীর্ঘদিন পুষে রাখলে যেমন মাড়িতে প্রদাহ বা ইনফেকশন হয় তেমনি দন্তক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজ রোগ দীর্ঘদিন বিনা চিকিত্সায় থাকলে দাঁতের গোড়ায় পূঁজ জমা হয়। মুখের এ ধরনের রোগের কারণে যেমন মুখে স্থানীয়ভাবে অসুবিধার সৃষ্টি হতে পারে তেমনি দেহের জন্য বিপদ নিয়ে আসতে পারে। তাই বছরে অন্তত: দু’বার মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।