তিন বছরেও বিচার হলো না ঢাবি ছাত্র আবু বকর হত্যার

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:২৭
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিকের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে নিহত আবু বকরের মৃত্যুর তিন বছর পার হলেও বিচার হয়নি অপরাধীদের। জামিনে রয়েছেন কয়েকজন আসামি। মামলার আসামি ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন জামিনে থাকা কয়েকজন। সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তরা কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশুনা। গত বছরের ২৬ নভেম্বর আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলায় ছাত্রলীগের ১০ নেতা-কর্মীকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর আগে শাহবাগ থানার দেয়া অভিযোগপত্রে আটজনকে আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ অভিযোগ গঠন করা হয়নি। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রয়ারি এ দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তখনকার তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক নিহত হন। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের তখনকার হল শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান মোল্লা গ্রুপের সংঘর্ষের সময় তিনি আহত হন। মৃত্যুর দু’ মাস পর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী আবু বকরের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। তাতে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। আবু বকর হত্যাকাণ্ডের ১ মাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার প্রো-ভিসি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের নেতৃত্বে গঠিত একটি তদন্ত কমিটি একটি রিপোর্ট দিলেও সেখানে হত্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। দীর্ঘ ১৪ মাস কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ২০১১ সালের ২৯ এপ্রিল মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এতে ছাত্রলীগের এফ রহমান হল শাখার সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুকসহ আট নেতা-কর্মীকে আসামি করা হলেও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়নি। মামলায় অভিযুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- এনামুল হক, মনসুর আহমেদ রনি, আবু জাফর মো. সালাম, মফিদুল ইসলাম খান, রকিব উদ্দিন, মেহেদী হাসান ও তৌহিদুল খান তুষার। ঘটনার পরপরই আসামিদের মধ্যে দু’জন ফারুক ও রকিবকে গ্রেফতার করা হলেও পরে জামিনে মুক্তি পায়। কিন্তু বাকি ছয়জন আসামিদের তালিকা পুলিশের খাতায় পড়ে আছে। সর্বশেষ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসামিদের অধিকাংশই মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে হল ও ক্যাম্পাস ছেড়েছে। এছাড়া কয়েকজন এখনও হলের বিভিন্ন রুমে অবস্থান করছেন। উল্লেখ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ১০ ছাত্রকে নামমাত্র সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। বিচার দাবি পরিবারের আবু বকরের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। কোনো দলের রাজনীতির সাথে জড়াননি তিনি। তারপরও রাজনীতির বলি তাকে হতে হয়েছে। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে চেয়েছিলেন আবু বকর। আবু বকরের বড় ভাই আব্বাস আলী বলেন, এখন আর কি বলার আছে? ভাই তো গেলো। শত কথা বলেও তো তাকে ফেরত পাওয়া যাবে না। ভাইকে পড়তে পাঠিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের আশা-ভরসার প্রধান স্তম্ভ ছিল সে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতির কলুষতা তাকে চিরতরে শেষ করে দিলো। আবু বকরের বাবা রুস্তম আলী এখনও সহজ হয়ে কথা বলতে পারেন না। শুধু বলেন, কোনভাবে বেঁচে আছি। মা রাবেয়া বেগমের সঙ্গে কথা বলতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তবে সবারই দাবি আবু বকরকে যারা হত্যা করেছে তারা এখনও ক্যাম্পাসে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ঘুরে বেড়াচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই একাডেমিক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনার কোনো পুনরাবৃত্তি আমরা আশা করি না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। যারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছে। হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আজিজুর রহমান বলেন, হলে যদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কেউ থেকে থাকে তাহলে সে গোপনে থাকছে। আমাদের পক্ষ থেকে তাদেরকে হলে না থাকতে বলা হয়েছে। আমরা আবারও অভিযুক্তদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। কোনো অভিযুক্ত হলে থাকতে পারবে না।