১৯৭১ সালে কলকাতায় পুঁথিঘরের মালিক শ্রীচিত্তরঞ্জন সাহা ‘মুক্তধারা’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠা করেন। শরণার্থী হয়ে কলকাতায় আশ্রয়গ্রহণকারী বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের বেশকিছু বই তখন মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে গেলে মুক্তধারার বেশকিছু বই অবিক্রিত থেকে যায়। চিত্তদা ঐসব বই নিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন। প্রকাশনা খাতে তিনি ১৯৭১ সালে বেশকিছু পুজি লগ্নি করেছিলেন। ঐ টাকা তুলবার জন্য সঙ্গত কারণেই তাঁর বিশেষ তাড়া ছিল। তাই স্বাধীন দেশে ফিরে মুক্তধারার বই বিক্রির জন্য তিনি শহীদ মিনার চত্বরে চট বিছিয়ে বই নিয়ে বসেন। পরে তা বর্ধমান হাউসের সামনের বটগাছের নিচে স্থানান্তরিত হয়। বইগুলো বিক্রি করা ছাড়া লগ্নিকৃত অর্থ ওঠাতে চিত্তরঞ্জন সাহার সামনে কোনো গত্যন্তর ছিল না। এভাবেই ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শ্রীচিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বইমেলার সূত্রপাত ঘটে।
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কলকাতায় মুক্তধারা থেকে পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। এই বইটির মূল প্রকাশক ছিল ঢাকার খান ব্রাদার্স। তারা ঢাকায় এই বই বিক্রির ব্যাপারে আপত্তি জানালে আমি মহাবিপদে পড়ি। কারণ আমি দু-জনের কাছ থেকেই টাকা নিয়েছি। দুই প্রকাশকের মধ্যকার বিরোধ মেটানোর জন্য আমিও তখন আমার কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে বটতলায় পত্রিকা বিছিয়ে আমার বইটি বিক্রি করতে শুরু করি। এবং বেশকিছু বই বিক্রি করতে সমর্থ হই। ফলে বাংলা একডেমীতে শুরু হওয়া প্রথম বইমেলাটিতে আমারও একটি বাধ্যতামূলক ভূমিকা ছিল বটে। অনেকেই আমার বই কিনল, অনেকে চাইল অটোগ্রাফ। স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে বই বিক্রির রেওয়াজটি এভাইে চালু হয়ে যায়।
১৯৭০ সালের নভেম্বরে খান ব্রাদার্স থেকে বের হওয়া আমার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ বইটি আমি নিউমার্কেটেও ফেরি করে বিক্রি করেছিলাম; কখনো কখনো পুশ সেলও করেছিলাম। হুমায়ুন আজাদ বুক স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে বই বিক্রি করার সমালোচনা করেছিলেন; যদিও পরে তিনি নিজেই অটোগ্রাফ দিয়ে বই বিক্রি করতেন। হিসাব করলে দেখা যাবে যে, বই লেখা, বই প্রকাশ করা ও বই বিক্রি করা— প্রকাশনাশিল্পের এই তিনটি ধাপের সব কটিতেই আমার ভূমিকা ছিল।
পরের বছর, ১৯৭৩ সালে আরও কয়েকজন প্রকাশক, যেমন নওরোজ কিতাবিস্তান, প্রগতি, মাওলা ব্রাদার্স, স্টুডেন্ট ওয়েজ তাদের বই নিয়ে বাংলা একাডেমীর লিটলম্যাগ চত্বরে স্টল দেয়। কবিতার বইয়ের ভালো কাটতি হওয়ার ফলে ১৯৭৩ সালে আমার প্রকাশনী খান ব্রাদার্স থেকে আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন কবির, হুমাযুন আজাদ, আবু কায়সার ও রফিক আজাদের কবিতার বই বের হয়। তখন মেলায় উপন্যাসের বই না থাকায় পাঠকেরা বিপুল উত্সাহ নিয়ে কবিতার বই কিনতেন। হুমায়ূন আহমেদের আত্মপ্রকাশ ঘটে এরও অনেক পরে। বলা যায়, উপন্যাসের পাঠকেরাই তখন কবিতার বই কিনতেন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা অমীমাংসিত রমণী’; ১৯৭৪ সালে ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’। ১৯৭৪ সালেও বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে টেবিলের ওপর আমার নিজের বই সাজিয়ে আমি ঐসব বই বিক্রি করেছি। তখন বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বই বিক্রি করার জন্য একাডেমীর অনুমতি গ্রহণ করার প্রশ্ন উঠেনি।
কবে থেকে বাংলা একাডেমী একুশের বইমেলার ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা আমার সঠিক স্মরণ নেই।
১৯৮৩ সালে বইমেলায় ‘পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশনীর নামে একটি স্টল নেওয়া হয়। ঐ বুকস্টলের নামটি বোর্ডের এক-কোনায় ছোটো হরফে লিখে খুব বড় হরফে লেখা হয়—এখানে কবি নির্মলেন্দু গুণকে পাওয়া যায়।
সেবার লাইন দিয়ে পাঠকরা আমার বই কিনেছিল। এরকম কাজ বইমেলায় আর কেউ করেনি, এমনকি আমিও না। এই ঘটনাটি তখনকার প্রায় সব মিডিয়া যেমন বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং পত্র-পত্রিকায় মুখরোচক খবর হিসেবে বেশ আলোচিত হয়েছিল।
নির্মলেন্দু গুণ, জন্ম :২১ জুন ১৯৪৫
