প্রাগৈতিহাসিক যুগেই মানুষ হয়তো গুহার গায়ে খোদাই করে, পাথরে আঁচড় কেটে, মাটিতে হাত-পায়ের ছাপ রেখে অজান্তেই ছাপাই ছবির করণকৌশল ও ভাষা তৈরি করে ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে ডায়াসপোরা, এক্সেডাস, এক্সাইল মনের মানুষ ‘হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোন খানে’ ছড়াতে ছড়াতে ছাপাই ছবির করণকৌশলেও নতুন নতুন মাত্রায় হলো সংযোজন-বিয়োজন; হলো ধর্ম রক্ষা, ভাষার অধিকার, অস্তিত্বের টিকে থাকার লড়াইয়ে সামিল, শেষতক ছাপাই ছবি হলো গণমানুষের চিত্র। কোথায় নেই এই ছাপচিত্র? নিত্যসামগ্রী থেকে শিল্পসামগ্রী হয়ে মিছিল-মিটিং—সবটাতেই বিরাজমান; হলো গলি থেকে রাজপথ হয়ে ড্রইংরুমের শোভাবর্ধনের শিল্প। চিত্রকলা থেকে ছাপচিত্রের একটি বিশেষ সুবিধা হলো, এর মূল প্লেট থেকে অতিরিক্ত অনেক ছবির ছাপ নেওয়া যায়। সম্প্রতি ১৪ জন নবীন-প্রবীণ শিল্পীর ‘ছাপাই ছবি-২’ শীর্ষক যৌথ প্রদর্শনী উপস্থাপন করল ‘গ্যালারি কায়া’। প্রদর্শনীতে রয়েছেন মোহাম্মদ কিবরিয়া, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, নিতুন কুণ্ডু, মাহমুদুল হক, আবুল বারক্ আলভী, রতন মজুমদার, রোকেয়া সুলতানা, ওয়াকিলুর রহমান, রফি হক, রশিদ আমিন, আনিসুজ্জামান, নগরবাসী বর্মণ, শেখ মো. রোকনুজ্জামান প্রমুখ। প্রদর্শনীতে আছে ধ্রুপদি উডকাট, লিনোকাট, এচিং অ্যাকোয়াটিন্ট থেকে হাল আমলের কলোগ্রাফ, সেরিগ্রাফ পর্যন্ত।
প্রথমেই বলতে হয় মোহাম্মদ কিবরিয়ার কথা, বিমূর্ত শিল্পের পুরোধা এই শিল্পী। তিনি ছাপাই ছবি রচনা করেছেন শিরোনামহীন-১ এচিংয়ে, মেমোরিয়েল-৫ ইন্ট্যাগ্লিওতে। চিত্রের মতোই তাঁর ছাপাই ছবিও উচ্চকিত। ছবিগুলো সাদাকালোর দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বস্তুকে বহু ফর্মে ভেঙে উপস্থাপন করেন। রং তাঁর প্রকাশভঙ্গির একমাত্র বাহন। এখানে কালো রংয়ের পরত তৈরি করেছেন। দর্শকদের তিনি নিয়ে যান শৈশবের অচেনা দেশে। মুর্তজা বশীর ছাপাই ছবি রচনা করেছেন:বিড়িওয়ালা লিনেকাটে, ইমেজ-২৫ এচিং অ্যাকোয়াটিন্টে, রক্তাক্ত-২১ লিনোকাটে, বালিকা ও পাখি এচিং একোয়াটিন্টে। সদা সৃষ্টিশীল এই শিল্পী নানান নিরীক্ষায় নিজেকে উপস্থাপন করেন। ছাপাই ছবিতেও তাঁর স্বকীয়তা বিদ্যমান। তাঁর ছাপচিত্র বেঙ্গল স্কুলের কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। বেঙ্গল স্কুলের মতোই তিনি প্রকৃতি ও নিম্নবর্গের মানুষের কথা বলেন। বিড়িওয়ালা তেমনি একটি অনবদ্য ছাপাই ছবি। রক্তাক্ত ২১-এর কথা না বললেই নয়। ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে এই ছবি রচনা করেছেন শিল্পী। গুলিবিদ্ধ ভাষা আন্দোলনরত যুবক, পাশেই ‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ লিখিত পোস্টার ছড়ানো-ছিটানো। আন্দোলন স্তব্ধ করতে ধেয়ে আসা সামরিয়ক জান্তা। ছবিটি দর্শকদের রাজনীতি সচেতন করে তোলে। কাইয়ুম চৌধুরী ছাপাই ছবি করেছেন শিরোনামহীন ১, ২, ৩, ৪ উডকাট প্রিন্ট ও এচিং অ্যাকোয়াটিন্টে। নিতুন কুণ্ডুর উডকাট প্রিন্টগুলো দেখে চমত্কৃত হতে হয়। সাধারণত রঙিন ছাপাই ছবি আলাদা আলাদা প্লেটে ছাপ নিতে হয়। রঙের হারমনি, ফর্মের রিদম কোনো রকম তারতম্য হলে চলে না। নিতুন কুণ্ডুর উডকাট প্রিন্ট শিক্ষানবিশদের অনুসরণযোগ্য। মাহমুদুল হক ছাপাচিত্রের একজন সিদ্ধহস্ত শিল্পী। তিনি একাধারে ছাপচিত্রের পথপ্রদর্শক, শিল্প সংগঠক, বাংলাদেশের ছাপাই ছবির উত্কর্ষের পেছনে যে কয়জন শিল্পীর আন্তরিকতা আছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছাপাই ছবি করেছন হ্যাপেনিং ১, ২, হরাইজন, ওয়াটারফল—এচিং মাধ্যমে। বিমূর্তধারার ছবিগুলোতে সাদাকালোর ইমেজ তৈরি করেছেন। কিবরিয়ার মতোই ফর্মের নস্টালজিক ইমেজ স্মৃতিতে খুঁজে ফেরার আনন্দ আছে। আবুল বারক্ আলভী ছাপাই ছবি করেছেন গ্রিন অ্যান্ড গ্রে ও কম্পোজিশান—এচিং মাধ্যমে। গ্রিন অ্যান্ড গ্রে বিমূর্ত ধারার অত্যন্ত সুন্দর একটি ছবি। ওপর থেকে দেখা ভূ-দৃশ্যের চমত্কার প্রতিস্থাপন। রংয়ের পরিমিতিবোধ দৃষ্টিকে প্রশান্তি দেয়। রতন মজুমদার উডকাট প্রিন্টের একজন দক্ষ শিল্পী। তাঁর ছবির শিরোনাম হলো ‘হু অ্যান্ড হোয়াইএভার ইউ সে’ ‘সাবকনসিয়াস ৪’—উডকাটে করেছেন। তাঁর ছবিতে অলংকার ও রেখার বলিষ্ঠতা আছে। রোকেয়া সুলতানা ছাপচিত্র নিয়ে অনরবত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তিনি ছাপাই ছবি করেছেন, ‘এ টেল অফ ফিল ১, ২, ৩, ৪’ শিরোনামে, এচিং মাধ্যমে। ছবিতে তিনি গাছের পাতা প্রতীকী ব্যাঞ্জ্যানায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি জীবনচক্রের মতো পাতাকে দার্শনিক ব্যাখায় দাঁড় করিয়েছেন। ওয়াকিলুর রহমান ছাপাই ছবি রচনা করেছেন শিরোনামহীন ১, ২, ৩, ৪। সবই এচিং মাধ্যমে। তাঁর ছবিতে ক্যালিগ্রাফিক ইমেজ পাওয়া যায়। শূন্য সংখ্যার নানা রূপ নানা দার্শনিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন তিনি।
রশিদ আমিন ‘ইন সার্চ অফ ইনফিনিটি ৪, ৬, ৮, ৯, ১৩’ শিরোনামে এচিং অ্যাকোয়াটিন্টে ছাপাই ছবির সিরিজ তৈরি করেছেন। তিনি রেখার বাঁধনে প্রকৃতির অসীমতার কথা বলেছেন। রফি হকের ছাপাই ছবির শিরোনাম ‘আমি বৃত্ত আঁকি’, মাধ্যম উড ব্লক ইইথ চাইন কোল। কোলাজ টেকনিকের ছাপাই ছবিতে বিভিন্ন ইমেজ সেটে ছবি রচনা করেছেন তিনি। আনিসুজ্জামান ‘কোলোডেস্কোপ কমপ্লেক্সিটি ৩৩, ৩৪’ শিরোনামে উডকাটে ছাপাই ছবি রচনা করেছেন। ছবিতে শহরবাসীর যান্ত্রিক সভ্যতার ইতিকথার বর্ণনা করেছেন। নগরবাসী বর্মণ ‘মাই নেটিভ ভিলেজ’, ‘বোট’, ‘ফিস’ প্রভৃতি শিরোনামে কোলোগ্রাফ মাধ্যমে ছাপাই ছবি রচনা করেছেন। জমিতে নানান টেক্সচার তৈরি করে মাছ, নৌকা, ঘরের মোটিফ ফুটিয়ে তুলেছেন। শেখ মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান ‘জার্নি বাই বোট-১’ ‘ল্যান্ডস্কেপ’ লিথোগ্রাফ মাধ্যমে ছাপাই ছবি করেছেন। ল্যান্ডস্কেপ ছবিটি সাদাকালো তুলির টানে তৈরি করা ভূ-দৃশ্যের চমত্কার একটি ছবি।
ছাপাই ছবির কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর পরিমিতিবোধ, যা দেখার আনন্দ দেয়। রংয়ের উচ্ছ্বাসে টেকনিকের ভারে ন্যূব্জ হয়ে যাওয়ার ভয় কম থাকে। যদিও আজকাল নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ছাপাই ছবি পেইন্টিংয়ের সমগোত্রীয় হয়ে উঠেছে। এ প্রদর্শনীর একটি বাড়তি পাওনা হচ্ছে কিছু ধ্রুপদি ছবি দেখার আনন্দ। এ জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ দিতেই হয়।
