বর্তমান বিশ্বের সংখ্যাগুরু মানুষের জীবনের দিকে সামান্য দৃষ্টি দিলেই আমরা বুঝতে পারি, কালিক যাত্রার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো অপরিহার্য যোগসূত্র নেই। এ শতাব্দীতেই বরং আমরা দেখি নতুন নতুন সংকট ও পুরোনো সংকটের নতুন মাত্রা। ভাষার বিপন্নতা তাই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নজরে আসে অপেক্ষাকৃত কম। অন্যান্য সংকটের মতো ভাষার বিপন্নতা কোনো স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন সংকট নয়, বরং তা বিশ্বের ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন উপসর্গের অন্যতম একটি।
আমরা ঠিক কী রকম ভাষা-বিপন্নতার সম্মুখীন, তা স্পষ্ট করার জন্য দু-একটা প্রাক্কলনই যথেষ্ট। বর্তমান বিশ্বে গণনাকৃত মোট ভাষার সংখ্যা ছয় হাজার নয়শ বারোটি। বিশ্বব্যবস্থা একইভাবে চললে এর অর্ধেকই হারিয়ে যাবে এ শতাব্দীতে। সিল নামক ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে এই মুহূর্তে বিলুপ্তপ্রায় ভাষার সংখ্যা পাঁচ শ ষোলোটি। ভাষা পরিস্থিতির নাজুকতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখি, বেশিরভাগ ভাষার ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা মাত্র কয়েক শ থেকে কয়েক হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ভাষা হারানোর এ বেদনা শুধু সংখ্যার জন্য তাত্পর্যপূর্ণ নয়। একটি ভাষার মৃত্যুও আমরা মেনে নিতে পারি না। কেন পারি না, সে প্রশ্নে গেলে এ প্রবন্ধের ডালপালা বাড়বে। নিজেদের দু-একটা প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিলে বরং আমরা তা উপলব্ধি করতে পারব। যেমন, বাঙালি বাংলা বর্জন করে ভাষা গ্রহণ করলে কেমন হয়? কেমন হয়ে ওঠে তখন বাঙালির ইতিহাস ও পরিচয়? একইভাবে আমেরিকানরা ইংরেজি ত্যাগ করে একটি ন্যাটিভ আমেরিকান ভাষা গ্রহণ করলে কেমন হয়? ইংরেজির মৃত্যু তখন কেমন লাগে নির্বিচারে অসংখ্য ন্যাটিভ আমেরিকান ভাষা হত্যাকারী আমেরিকানদের?
কেন এত ভাষা হারাতে বসেছি আমরা? এবং এত দ্রুত? মোটাদাগে তার দুটো কারণ চিহ্নিত করেছি এ প্রবন্ধে। সাম্রাজ্যবাদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু পূর্বের সাম্রাজ্যবাদের (রোমান, পারসীয় ইত্যাদি) সঙ্গে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের গুণগত ও কৌশলগত বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। পূর্বের সাম্রাজ্যবাদ যেখানে প্রধানত কর আদায়ের মধ্যে নিজের স্বার্থ সীমিত রাখতে বাধ্য হতো, আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ ও শক্তি সেখানে মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সাম্রাজ্যবাদের সময়ে তাই ভাষার মৃত্যু হয়েছে সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব সম্ভব করার জন্য সাম্রাজ্যবাদের একটি ভাষার প্রয়োজন হয়। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদের ভাষা হলো ইংরেজি। ইংরেজি একদিকে যেমন পণ্যের ভাষা, অন্যদিকে তেমন প্রচারের ভাষা। ইংরেজির এই বিপুল শক্তির কাছে শুধু যে ছোট ছোট ভাষাগুলোই মার খাচ্ছে তা নয়, বড় বড় রাষ্ট্রভাষাও কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, বাংলা যার ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বের ভাষাবৈচিত্র্যের জন্য দ্রোহরূপী ইংরেজিকে বৈধতা দানের জন্য সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে নানারকম জিগির তোলা হয়, যেগুলোকে ‘কমনসেন্স’ বলে চালিয়ে দেবার প্রবণতা দেখা যায়। বলা হয়—নানা ভাষাভাষী মানুষের যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজন, সেই ভাষা হলো ইংরেজি। উহ্য থাকে যে, সেই যোগাযোগে কর্তার ভূমিকায় থাকে মুনাফালোভী, হাতেগোনা অল্প কিছু মানুষ, যারা একতরফাভাবে পণ্য ও জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করে ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজির মালিকানা নিয়ে আবার বলা হয়, ইংরেজি আর শুধু ইংল্যান্ড বা আমেরিকার ভাষা নয়, ইংরেজি এখন সবার ভাষা। পরিহাস এই যে, ইংরেজি ভাষার বিধি-বিধান ও শুদ্ধতা-অশুদ্ধতার নিয়ন্ত্রণ এখনো ইংল্যান্ড বা আমেরকাই করে। এটা করতে গিয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষণের নামে ব্যাকরণ ও নানা রকম সরঞ্জামাদি বিক্রি করে এ দেশগুলো যে মুনাফা লোটে, তা অনেক দরিদ্র দেশের মোট বাত্সরিক বাজেটের চেয়ে বেশি। ইংরেজির মালিকানা যে বদলায়নি তার আরেকটা প্রমাণ, ইংরেজি ভাষী দেশগুলো ইংরেজিতে দক্ষতা নিরূপণের কর্তৃত্ব হাতছাড়া করেনি, ফলশ্রুতিতে টোফেল ও আইইএলটিএস-এর মাধ্যমেও তারা বিপুল অংকের মুনাফা লুটছে। উল্লেখ্য, ইংরেজি ভাষার কর্তৃত্ব স্থাপনে ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু হওয়া ইংরেজি সাহিত্যের প্রতাপ পরোক্ষভাবে হলেও প্রবলভাবে সহায়তা করছে, তৃতীয় বিশ্বে যার অদ্যাবধি একচেটিয়া আধিপত্য আমাদের মনে ‘উত্তর উপনিবেশবাদ’ সম্পর্কে সংশয় জাগায়। ইতিহাসের ঘটনা-সংঘটনে সাম্রাজ্যবাদের ভাষা হয়ে ওঠা ইংরেজি পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রয়োজন-নির্বিশেষে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলে অন্যান্য ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করছে। ইংরেজির এই সাম্রাজ্যবাদী রূপের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধের কৌশল কী হবে, ইংরেজিকে তার ভাষা-সংহারী রূপ থেকে বিযুক্ত করা যাবে কি না, সে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।
সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে জাতিরাষ্ট্রও কার্যকরভাবে মাতৃভাষা নিধনের কাজ করে চলেছে। জাতিরাষ্ট্রে প্রথম যে ঘটনাটি ঘটে তা হলো, রাজনৈতিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী নৃ-গোষ্ঠী নিজের পরিচয় ও মতাদর্শ রাষ্ট্রের পরিচয় ও মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। মালেদের নামে হয় তাই মালয়েশিয়া বা বাঙালির নামে হয় বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাশালী নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা হয় রাষ্ট্র ভাষা। জাতিরাষ্ট্রের এ রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রবণতার বিপদ হলো বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে সাকুল্যে মাত্র তিনশ ভাষা (প্রায় দু-শ পঞ্চাশটি জাতিরাষ্ট্রের বিপরীতে) রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পায়, বাকি ভাষাগুলো থাকে অবহেলিত। সাম্রাজ্যবাদের আদলে জাতিরাষ্ট্রও সবার যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। তবে জাতিরাষ্ট্রের মতাদর্শ ও তার প্রচার হয় আরও প্রবল ও প্রত্যক্ষ। তার কাছে ক্ষমতাধারী নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা বা রাষ্ট্রভাষার সর্বজনীন প্রতিষ্ঠা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য পূর্বশর্ত। রাষ্ট্রভাষার প্রতি আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয় দেশপ্রেম। এ ভাষা চর্চার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রে বসবাসকারী সবার চাকরি ও উন্নয়ন। এর অর্থ হলো অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করতে রাষ্ট্রের অসম্মতি এবং ওই গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে রাষ্ট্রের অনিচ্ছা। ক্ষমতাধারী নৃ-গোষ্ঠীর বিশেষ শ্রেণী নিজের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রে তাবত্ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ওই ভাষার উন্নয়ন ও বিস্তারে ব্যবহার করে। এ কাজে রাষ্ট্র একদিকে বলবত্ করে নানা আইন-কানুন অন্যদিকে কাজে লাগায় তার আওতাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশে যেমন বাংলা একাডেমী)। রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে ক্ষমতাধারী নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্গত শ্রেণীর বৈয়াকরণ ও ভাষাবিদ। পরোক্ষভাবে সহায়তা করে ওই একই গোষ্ঠী ও শ্রেণীর সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও নৃতাত্ত্বিক। ভাষাবিদরা বিশেষ নৃ-গোষ্ঠী ও শ্রেণীর ভাষাকে ‘জাতীয়’ ও ‘প্রমিত’ ভাষা বলে বৈধতা দান করে। ‘বস্তুনিষ্ঠা গবেষণা’র নামে তারা খুঁজে বের করেন নানা অভিধা যেমন-উপভাষা, উঁচুভাষা, নিচুভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ইত্যাদি। সাহিত্যিকেরা সাধনা করেন তথাকথিত ওই ‘জাতীয় ও ‘প্রমিত’ ভাষায় সাহিত্য রচনার, যা ওই ভাষার ঐতিহ্য ও কর্তৃত্বকে সমৃদ্ধ ও সংহত করে। ইতিহাসবিদেরাও একইভাবে ওই বিশেষ গোষ্ঠী ও শ্রেণীকে মাথায় রেখে ইতিহাসচর্চায় নিমগ্ন হন। নৃতত্ত্ববিদেরা মাটি খুঁড়ে বের করেন এ গোষ্ঠীর ‘কীর্তিময়’ অতীত জীবনযাপন।
মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে যেসব জাতিরাষ্ট্রের নাম বারবার উঠে আসে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের সংবিধানে এবং তার কার্যকলাপে অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার অস্তিত্বের স্বীকৃতি মেলে না। প্রায়ই বাংলাদেশকে ‘একভাষিক দেশ’ বলে চালিয়ে দেবার প্রবণতা দেখা যায়। যে দেশের ভাষাসংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করা হয়, অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার প্রতি সে দেশের নিরন্তর অবজ্ঞা আমাদের বিস্মিত করে না। তার কারণ, জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বেলায় কেবল এক নৃ-গোষ্ঠীর বশেষ শ্রেণী অন্য নৃ-গোষ্ঠীর বিশেষ শ্রেণীকে প্রতিস্থাপিত করেছে। নাম পাল্টেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র বদলায়নি। জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার ধরন পাল্টায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করার বাংলাদেশি প্রয়াস তাই অনুপ্রাণিত হয়েছে জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে, অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রতি দরদ থেকে নয়।
বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ব হুড়মুড় করে এক ধরনের ভাষা ‘উদ্ধারের’ কাজে নেমেছে। উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যের মাধ্যমে যারা এ যাবত সবচেয়ে বেশি ভাষা হত্যা করেছে তাদের এ দরদকে মাছের মায়ের পুত্র শোকের সাথে তুলনা করা যায়। ভাষা উদ্ধারের নামে পশ্চিমা বিশ্ব মূলত যেটা করছে, তা হলো বিপন্ন ভাষার ডকুমেন্টেশন। অর্থাত্ তারা ভাষাকে জাদুঘরে রাখার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। ভাষা যার মাধ্যমে বাঁচে, সেই মানুষকে তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখছে। ভাষার বিপন্নতা যে অসুস্থ রাজনৈতিক পদ্ধতির বহিঃপ্রকাশ সেই পদ্ধতিতে তারা নিজেদের স্বার্থে হাত দিচ্ছে না।
পৃথিবীর হাজার হাজার ভাষা বিপন্ন—এর অর্থ হলো পৃথিবীর হাজার হাজার ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি বিপন্ন। সাম্রাজ্যবাদ ও জাতিরাষ্ট্রের যুগপত্ যাঁতাকলে তারা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে কোণঠাসা। এসব মানুষ এবং তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি না বাঁচলে তাদের ভাষা বাঁচবে না। এদের বাঁচানোর জন্য সাম্রাজ্যবাদের মিলিয়ন ডলারের ডকুমেন্টেশন প্রজেক্ট কোনো কাজে আসবে না। জাতিরাষ্ট্রের ‘উন্নয়ন’ কর্মসূচি (যেমন, বাংলাদেশের কাপ্তাই বাঁধ, ভারতের নর্মদা বাঁধ, ইত্যাদি) এদের জন্য আরও বিপর্যয় বয়ে আনবে। প্রকৃত সত্য হলো, ‘বাঁচানো’ শব্দটাই ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য অবমাননাকর ও অপ্রয়োজনীয়। এরা হাজার বছর ধরে নিজেদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে বেঁচে এসেছে। এখনো সে ধারা বইয়ে নিতে এরা পারঙ্গম, যদি না সাম্রাজ্যবাদ এদের অন্দরমহলে হানা না দেয়, জাতিরাষ্ট্র তার উন্নয়ন ধারণা এদের ওপর চাপিয়ে না দেয়। এর অর্থ এই নয়, ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ বিচ্ছিন্ন, কূপমণ্ডুক জীবন যাপন করবে। তারা কীভাবে জীবন যাপন করবে, সে সিদ্ধান্ত তারাই নেবে। অন্যান্যরা শুধু বন্ধুসুলভ সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে, শাসকসুলভ উদ্ধারের হাত নয়।
