গুণিন কথা

গুণবিচারী আলাপন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:২২
সাক্ষাত্কার সাহিত্যের একটি অন্যতম ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পারস্পরিক কথোপকথনের মাধ্যমে একটি কঠিন কথাকে যত সহজে বলা যায়, সাহিত্যের অন্য কোনো মাধ্যমে তা হয়তো বলা যায় না। প্রবন্ধে, স্মৃতিকথায়, গল্পে কিংবা উপন্যাসে বক্তব্যকে আড়াল করা যায়। মনের যে গোপন কথাটি ভেতরে ঘুরপাক খায়, তা হঠাত্ বেরিয়ে গেলেও আপত্তি নেই, পরে তা কাটছাঁট করা যায়, অথবা বাদও দেওয়া যায়। কিন্তু সাক্ষাত্কারে সে সুযোগ নেই। এর বড় সুবিধে হলো, এতে শিল্পীর ব্যাক্তিজীবন যেভাবে বাঙ্ময় হয়, সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমে তা সেভাবে হয় না, সুযোগও নেই। সে অর্থে শিল্পীকে গভীরভাবে জানার অন্যতম মাধ্যম হলো সাক্ষাত্কার। এ জন্যেই হয়তো সাক্ষাত্কার এখন শুধু পত্র-পত্রিকার পাতা কিংবা লিটিল ম্যাগাজিনে সীমাবদ্ধ থাকছে না, গ্রন্থবদ্ধও হচ্ছে মাঝে মাঝে। সমপ্রতি এমনই একটি সাক্ষাত্কারের বই প্রকাশিত হয়েছে মধ্যমা পাবলিকেশন্স থেকে। ‘গুণিন কথা’ নামে প্রকাশিত বইটির সাক্ষাত্কারগুলো সংগ্রহ করেছেন রাহেল রাজিব। দুই বাংলার পঁচিশজন গুণী শিল্পীর সাক্ষাত্কার সংকলিত হয়েছে বইটিতে। বইটির বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে সংকলিত সাক্ষাত্কারগুলো গতানুগতিক ধারার নয়, তাতে রয়েছে নতুনত্বের পরিচর্যা। মোটামুটিভাবে বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের শিল্পীদের নির্বাচন করা হয়েছে সাক্ষাত্কারগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে। সে ধারার ব্যতয়ও ঘটেছে কোথাও কোথাও। তবে মূল ঝোঁক ষাটের শিল্পীদের ওপর। ‘গুণিন কথা’য় প্রথমে স্থান দেওয়া হয়েছে ওপার বাংলার বিশিষ্ট কথাকার অভিজিত্ সেনের দেওয়া সাক্ষাত্কার। বাংলা সাহিত্যের এ স্রষ্টা দেশভাগের চরম পরিণতি হিসেবে দেশান্তরিত হন পঞ্চাশের দশকে। এরপর সেখানে বসেই নিরন্তর লিখে চলেছেন। ‘রহু চণ্ডালের হাড়’, ‘ছায়ার পাখি’, ‘আঁধার মহিষ’ ‘রাজপাঠ ধর্মপাঠ’, ‘নগ্ন নির্জন হাত’ ছাড়াও অসংখ্য গল্প-উপন্যাস লিখেছেন অভিজিত্ সেন। সাক্ষাত্কারে সাহিত্যসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় উঠে এলেও দেশভাগের ক্ষতটি চোখে পড়ার মতো। তাঁর কথার সুরটিও ছিল দেশভাগ কেন্দ্রিক। তাঁর মুখেই শোনা যাক, ‘আমার আকুলতা বাংলার জন্যই। আর তো কোন দেশ দেখিনি। ...আমি সত্যিই একেবারে “ভেতো বাঙালি”। মরার আগে আরো অন্তত একবার বাংলাদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে আমার।’ ‘প্রদোষে প্রাকৃতজনে’র স্রষ্টা শওকত আলীর সাক্ষাত্কার সংকলিত হয়েছে এরপর। সাক্ষাত্কারটি বেশ দীর্ঘ। এতে তাঁর সাহিত্য ও সাহিত্যভাবনার বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। ‘ভাত দে নইলে মানচিত্র খামু’- এই বিষাদ-নৈরাশ্য-ক্ষোভ-ক্রোধ নিয়েই ষাটে আর্বিভূত হন কবি রফিক আজাদ। সাক্ষাত্কারটি হালকা মেজাজের। এতে সাহিত্য নিয়ে গভীর কথার কোনো আয়োজন লক্ষ করা যায় না। মিহির সেগুপ্তের সাক্ষাত্কারটি দেশভাগের বোধ থেকে উত্সারিত। কথায় কথায় নস্টালজিয়া এসেছে, এসেছে দেশভাগের যন্ত্রণা। হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাত্কারটি চমত্কার। ষাটের সক্রিয় এই কথাকারের ভাষা আন্দোলন নিয়ে ভাবনা, জীবনবোধ, রাজনৈতিক চেতনা ছাড়াও সাহিত্য নিয়ে রয়েছে বিষদ আলোচনা-সমালোচনা। এর পরে আবদুল মান্নান সৈয়দের আলাপচারিতাটি তাঁরই সাহিত্যজীবনের একটি খণ্ড চিত্র। ডাকঘরের ভূমিকা কারও অবিদিত নয়। দু-পক্ষের সংযোগ ঘটানোই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। বেলাল চৌধুরীকেও তেমনি দুই বাংলার ডাকঘর বলা হয়। বাড়ি-পালাতে গিয়ে কলকাতা গমন। আড্ডাবাজ এই মানুষটি দিনের পর দিন সুনীল, শক্তি, কমলকুমারদের সঙ্গে আড্ডা মেরে সময় পার করেছেন। ভ্রমণসূত্রে দুই বাংলার অসংখ্য কীর্তিমান লেখকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তাঁর। বেলাল চৌধুরীরর সে অভিজ্ঞতার বর্ণনা উঠে এসেছে সাক্ষাত্কারটিতে। পরিশ্রমি গবেষক হিসেবে হায়াত্ মামুদের নাম সর্বজনবিদিত। সেই সঙ্গে নান্দনিক অনুবাদশিল্পী হিসেবেও তিনি সুখ্যাত। ‘হায়াত্ মামুদ:ঐশ্বর্যশালী গদ্যশিল্পী’ শিরোনামে ‘গুণিন কথা’য় সংকলিত হয়েছে হায়াত্ মামুদের সাক্ষাত্কার। মাহবুব সাদিকের সাক্ষাত্কারটি মোটামুটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। কবি মাহবুব সাদিক একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় এতে তাঁর সেই সময়কার স্মৃতিচারণা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধসাহিত্য নিয়েও তথ্যপূর্ণ ও খোলামেলা আলোচনা আছে। সেলিনা হোসেনের সাক্ষাত্কারে উঠে এসেছে তাঁর বাল্যকালের না বলা অনেক কথা। অপকটে বলেছেন জীবনের অনেক উত্থান-পতনের গল্প, প্রপ্তি-হতাশার ছিটেফোঁটাও আছে তাতে। ‘শামসুজ্জামান খান:নিরন্তর গবেষক’ শিরোনামে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সাক্ষাত্কার। ছোট্ট সাক্ষাত্কারটিতে শামসুজ্জামান খানের সাহিত্যভাবনার চেয়ে তাঁর স্মৃতিচারণা বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে কথোপথনটি আবার ভিন্নধাঁচের। যুদ্ধসাহিত্য নিয়ে লেখিকার মূল্যায়নটি আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। আবুবকর সিদ্দিকের সঙ্গে আলাপচারিতাটি বেশ দীর্ঘ। নানা বিষয়ে গালগল্প হলেও সাক্ষাত্কারটিতে নস্টালজিয়া প্রতিফলিত হয়েছে। সবশেষে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে মৃণাল বসুচৌধুরীর নাতিদীর্ঘ একটি সাক্ষাত্কার। ওপারবাংলার গুণি এই কবির সাক্ষাত্কারটিতে উঠে এসেছে তাঁর কবিতা, সমসাময়িক সাহিত্যসহ তাঁর জীবনের নানা দিক। তবে কথাকার রশীদ করিম ও আব্দুল মান্নান সৈয়দ পরলোকগত হলেও বইটিতে সে তথ্য নেই। বানানের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার ছিল। শিল্পী বিপ্লব সরকারের অসাধারণ প্রচ্ছদশোভিত বইটি ষাটের দশকের কথাশিল্পস্রষ্টাদের সৃষ্টি ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে সাহায্য করবে নিঃসন্দেহে। গুণিন কথা রাহেল রাজিব মধ্যমা পাবলিকেশন্স প্রচ্ছদ: বিপ্লব সরকার প্রকাশকাল: স্বাধীনতা দিবস ২০১২ মূল্য: ৩৭৫ টাকা