‘আমার শিল্পের প্রেরণা হলো দেশ। আর কিবরিয়া স্যার আমার গুরু। তার কাজের ধারা থেকে কী আমার উত্তরণ ঘটেছে? পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় কোন কাজ কী আমি করতে পেরেছি? এ প্রশ্ন আমাকে সবসময় ভাবায়। সেই ভাবনায় তাড়িত হয়ে আমি এঁকে চলি। শিল্পের স্বরূপ অন্বেষণ করে চলি।’ কথাগুলো বলছিলেন দেশের সমকালীন বিমূর্ত শিল্পকলার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি শিল্পী মাহমুদুল হক। পেইন্টিং ও ছাপচিত্রে তিনি সমানভাবে বিমূর্ত ধারার শিল্পের পথে হাঁটছেন। মোহাম্মদ কিবরিয়ার পর এমন নিবিড়ভাবে বিমূর্ত ধারার শিল্প সাধনায় নিমগ্ন আর কাউকে দেখা যায়নি। বেঙ্গল শিল্পালয়ে আজ শুক্রবার শুরু হচ্ছে শিল্পী মাহমুদুল হকের ৪০তম একক চিত্র প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাককে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি দেশের শিল্পকলা ও নিজের কাজসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে নিজের অভিমত প্রকাশ করেন।
শিল্পী মাহমুদুল হক ষাট দশকের শেষার্ধে আত্মপ্রকাশ করেন। তার অধিকাংশ তেল রঙের ছবিতে প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছেন নিপুণভাবে। জল রঙ, রেখা এবং কিছু কিছু ফর্ম তুলে এনেছেন বাংলার নিসর্গ থেকে। নিসর্গকে ব্যবহার করেছেন রূপকল্প তৈরিতে।
মাহমুদুল হকের আরেকটি বড় পরিচয় তিনি সফল ছাপচিত্রকর। জাপানে ছাপচিত্রে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সময় তিনি ছাপচিত্রের মৃতপ্রায় ধারা ‘মেজটিন’কে পুনরুজ্জীবিত করেন। তার সেই উদ্যোগ তাকে জাপানে নতুন করে পরিচিত করে তোলে। ফলে সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে তিনি সেখানকার শিক্ষক হয়ে যান। শুধু জাপানেই নয় জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ‘ভিজিটিং অধ্যাপক’ হিসাবে কাজ করেছেন। আর দেশে চারুকলা ইনস্টিটিউটেও তিনি ৪২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। শুধু বিমূর্ত ধারাতেই কেন ছবি আঁকেন? শিল্পী বললেন, ‘মূর্ত-বিমূর্ত বলে কিছু নেই। শিল্পীর কাছে সবই মূর্ত। সাধারণভাবে সবাই যা দেখছে একজন শিল্পী সেই ফর্মে বিষয়টিকে দেখেন না। শিল্পী দেখেন ভিন্ন দ্যোতনায়। একটি ফুলের রং, সৌন্দর্যকে তুলে ধরা সম্ভব কিন্তু তার গন্ধকে প্রকাশ করা যায় না। সেই গন্ধের যে অনুভূতি তাকে ক্যানভাসে প্রকাশ করতে হলে বিমূর্ত ধারার আশ্রয় নেয়া ছাড়া শিল্পীর উপায় নেই।’
মাহমুদুল হকের ক্যানভাসে শিল্পের নানা মাধ্যমের প্রভাব দেখা যায়। ছাপচিত্রের প্রভাব তার ক্যানভাসে নিয়ে এসেছে ভিন্ন আমেজ। তেমনি ভাস্কর্যের ফর্ম ব্যবহার করেও নিরীক্ষাধর্মী কাজ করেছেন তিনি। শিল্পী মাহমুদুল হক ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে তত্কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা কলেজ (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) থেকে বিএফএ এবং ১৯৮৪ সালে জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএফএ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৮১-৮২ দুই বছর জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাপচিত্রের উপর গবেষণা করেন। এ পর্যন্ত তার ৩৯টি একক প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে এবং বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।
তিনি ১৯৯২ সালে ১০ম জাতীয় শিল্পকলা প্রদর্শনীতে ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার’, ১৯৯৬ সালে ১২তম কুয়েত আন্তর্জাতিক বিয়েনালে ‘২য় পুরস্কার’ এবং ২০০৬ সালে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন প্রদত্ত ‘সুলতান পদক’সহ দেশে-বিদেশে বহু পুরস্কার লাভ করেছেন। তিনি ৪২ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে অধ্যাপনা করার পর ২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি বর্তমানে ‘সফিউদ্দীন বেঙ্গল প্রিন্টমেকিং স্টুডিও’ তে উপদেষ্টা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শুক্রবার বিকালে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে শিল্পীর দুই সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশে প্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি ইউন-ইয়ং এবং ইয়ংওয়ান কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ও সিইও কিহাক সাং। এ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বেঙ্গল শিল্পালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন ও প্রেস প্রিভিউ অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে শিল্পী মাহমুদুল হক, শিল্প সমালোচক স্থপতি রবিউল হুসাইন এবং বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসের পরিচালক সুবীর চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক সারোয়ার জাহান। প্রদর্শনীতে শিল্পীর ৪৪টি চিত্রকর্ম থাকছে। প্রদর্শনী আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
