আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩৩
বর্তমান সরকার ২০১৩ সালে তাদের মেয়াদ পূর্ণ করবে। আর আগামী বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই এ বছরটি এদেশের সরকার, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন ছিল তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব সক্ষমতা প্রতিবেদনে ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের চেয়ে ১০ ধাপ অবনমন ঘটে। যে ৩টি উপ-সূচকের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে অর্থাত্ (১) মৌলিক প্রয়োজন (২) প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও (৩) উদ্ভাবনী ক্ষমতা, বাংলাদেশে এ তিনটি সূচকেই চরম অবনতি হয়েছে। দুঃখজনক হলো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সূচকে ৭ ধাপ, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি সূচকে ৮ ধাপ এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা সূচকে ৯ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিশ্ব আর্থিক উন্নয়ন সূচকে গত বছর এক ধাপ পিছিয়ে গেছে। ২০১১ সালে বিশ্বের মোট ৬০টি দেশের মধ্যে ৫৬তম অবস্থানে থাকলেও ২০১২ সালে এক ধাপ নিচে নেমে ৫৭তম স্থানে অবস্থান করে। গত অক্টোবর ২০১২-তে বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা আইএফসি (ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন) সহজে ব্যবসা করার সূচক-২০১২ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক সূচকে পূর্বের বছরের চেয়ে ৭ ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের ১৮৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম। বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। এ দেশে ব্যবসা- বাণিজ্যের অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামোগত সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, দুর্নীতি, পরিবহন ও যোগাযোগ সমস্যা, শ্রমিক অসন্তোষ, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচক ছাড়া সামাজিক খাতেও অবনতির তথ্য পাওয়া যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট প্রকাশিত “আইনের শাসন সূচক ২০১২” শিরোনামের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থাসহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রভাব রাখতে পারে এমন ৮টি ক্ষেত্রের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ। সংস্থাটি মনে করে, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগা ও বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতিই দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকার জন্য দায়ী। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সরকারের জবাবদিহিতার অবস্থা খুবই খারাপ, বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থা ও আদালত চরম অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। তাছাড়া, মানবাধিকর লঙ্ঘন ও পুলিশি হয়রানিও বাংলাদেশের একটি সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। দুর্নীতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের নাজুক চিত্র পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ‘দুর্নীতির ধারণাসূচকে’ বাংলাদেশের অবস্থান বিগত বছরের তুলনায় ২০১২ সালে ২৪ ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের কাজ না করা, পদ্মা সেতু ও রেলওয়ের ঘুষ কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্কের ব্যাংক কেলেঙ্কারি, ডেসিটিনির মতো বহুল আলোচিত দুর্নীতির ‘বহর’ এ কারণে বাংলাদেশের এ অবনতি ঘটেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উচ্চ পর্যায় ও ক্ষমতাশালীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়াও এর কারণ বলে টিআই মনে করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৯৭ শতাংশ সদস্য বিভিন্ন নেতিবাচক কার্যক্রমে জড়িত। এদের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৫ ভাগ সদস্যই বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম, যেমন-হত্যা, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত। গত ডিসেম্বর ২০১২ টিআইবির আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়, যেখানে বলা হয়, সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা উদ্বেগজনক। সেবা খাতে দুর্নীতির হার কমলেও ঘুষ আদায়ের হার বেড়েছে। দেশের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শ্রম অভিবাসন। খানা জরিপে এ খাতে দুর্নীতির পরিমাণ হলো ৭৭ শতাংশ, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা (৭৫.৮ শতাংশ), তৃতীয় ভূমি প্রশাসন (৫৯ শতাংশ) এবং চতুর্থ বিচারিক সেবা (৫৭.১ শতাংশ)। অন্যান্য ক্ষেত্রে একই সময়ের তুলনায় দুর্নীতি ৩৪.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। টিআইবি বলছে, গত ২০১১-১২ অর্থবছরে সেবা খাতে ২১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা ওই অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২.৪ শতাংশ। দেশের ৬৩.৭ শতাংশ সেবা গ্রহীতা কোন না কোনভাবে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও সম্ভাবনাও অফুরন্ত। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি হবে। সে সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ছাড়িয়ে যাওয়া এবং ২০৫০ সালের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বব্যাংক মনে করে, মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হলে বাংলাদশের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৩- এ বলা হয় বিশ্বে যে গুটিকয়েক দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন উভয় ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অগ্রগণ্য। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্যেও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সংস্থা। সংস্থাটি সমপ্রতি ’গ্লোবাল ট্রেন্ডস ২০৩০: অলটারনেটিভ ওয়ার্ল্ডস’ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ২০২২ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্ অর্থনীতির দেশ হবে চীন। বড় অর্থনীতির দেশ হবে ভারতও। ইউরোপ, জাপান ও রাশিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর শ্লথগতি অব্যাহত থাকবে। চারটি দেশ অর্থাত্ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন সমন্বয়ে গঠিত ব্রিকস এর মধ্যে একটি ছাড়া সবাই অর্থনীতিতে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিবেদনে এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। ২০০৫ সালে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নেইল ব্রিকসের ধারণা দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ব্রিকস ছাড়া সম্ভাবনাময় আরও ১১টি দেশের কথা বলিছিলেন যাদের নাম দেয়া হয় ‘নেক্সট ইলেভেন’। এ দেশগুলো হচ্ছে-বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ নেক্সট ইলেভেন সম্মিলিতভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। সমপ্রতি যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বিশ্ব বিখ্যাত ’দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার ’নিউ ওয়েভ ইকোনমিজ গোয়িং ফর গ্রোথ’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। রেমিট্যান্সই বাংলাদশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার টেকসই ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্দা ও খুঁড়িয়ে চলা পশ্চিমা বিশ্বের হিংসায় পরিণত হয়েছে। পত্রিকায় আরো বলা হয়েছে, একটা সময় বৈশ্বিক অর্থনীতির ৮০ শতাংশই ছিল ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও জাপানের দখলে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির চেহারা এখন বদলে যাচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ পেছন থেকে সামনের কাতারে উঠে এসেছে। একসময় দেশগুলোকে ’তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা হয়েছিল, সে দেশগুলোই এখন উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসাবে আত্ম প্রকাশ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদুত ড্যান ডব্লিউ মজীনা সমপ্রতি বলেছেন, অর্থনীতিতে এক সময় বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভুত হতে পারে। হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার। অনেক সম্ভাবনা থাকলেও নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বাংলাদশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে তৈরি পোশাক রফতানি। বাংলাদশের তৈরি পোশাক রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে। আফ্রিকার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ায় ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হ্রাস পেয়েছে। অন্যান্য দেশে রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাই এ মুহূর্তে নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান ও ব্যাপক তৈরি পোশাক ও অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী রফতানি বৃদ্ধি করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বৈদিশেক রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি থাকলেও ক্রমেই জনশক্তি রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির নতুন চাহিদা সৃষ্টি করতে না পারলে মেয়াদ পূর্তির পর শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসলে রেমিট্যান্সও কমতে শুরু করবে। দেশে ব্যাপক কর্মহীন জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে না পারলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যাবে। তাই নতুন জনশক্তি বাজার খুঁজে বের করা এবং চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করে রফতানি বৃদ্ধি করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত খাতে উন্নতি না হওয়ায় দেশে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছে। অথচ উত্পাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ খুবই প্রয়োজন।