অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩৪
বাংলাদেশের অর্থনীতির সুদৃঢ় অবস্থান এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা গত কিছুদিন ধরে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে প্রকাশিত জাতিসংঘের “বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা ২০১৩” রিপোর্টে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরই দ্বিতীয় অবস্থানে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ অন্যান্য দেশের অবস্থান বাংলাদেশের পিছনে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১২ সালে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতি শ্রীলঙ্কা এ অঞ্চলে সর্বাধিক ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে রিপোর্টে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। যদিও সরকারের লক্ষ্য ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। বিশ্বমন্দার নেতিবাচক প্রভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উত্থান, হরতাল-অবরোধ-সংঘর্ষ, দুর্বল যোগাযোগ অবকাঠামো ও যানবাহন ব্যবস্থা, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি ঘাটতি ইত্যাদি সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এর বড় কারণ জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ে অব্যাহত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা। বাংলাদেশ পণ্য রফতানিতে গত দেড় দশক ধরে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই ভালো অবস্থাও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারেনি। রফতানি আয় দিয়ে গড়ে ৬৫ শতাংশ আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়েছে। এমন অবস্থা হলে বিশ্বের অনেক দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধস নেমে আসতো। কিন্তু বাংলাদেশে এর বিপরীতটাই হয়েছে। বরং রেমিটেন্স প্রাপ্তিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি মিটিয়েও প্রতি বছর উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়ছে। তাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। ২০১৩ সালের শুরুতে রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন (১,৩০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিগত চার বছরে প্রবাসী আয়ে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রায় তিন দশক ধরেই জনশক্তি রফতানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। আশির দশকে ৫০ থেকে ৬০ কোটি ডলার রেমিটেন্স আসতো। নব্বইয়ের দশকে তা প্রায় ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। ২০০৬ সালে এ আয় ছিল ৫৪৮ কোটি ডলার। তারপর থেকে রেমিটেন্স আসা দ্রুত বাড়তে থাকে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যদিও আরব বিশ্বের নবজাগরণের কারণে দেশগুলোতে অশান্ত পরিস্থিতি চার বছর ধরেই চলছে। বিশ্বমন্দার কারণে ভোক্তাচাহিদা কমে গেছে। শিল্প উত্পাদন হ্রাস পেয়েছে। সেবাখাত তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। পূর্বের কিছু অনিয়মের কারণে জনশক্তি আমদানিকারক কয়েকটি দেশের সাথে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এসব বাধা উপেক্ষা করে জনশক্তি রফতানি খাত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নিচের সারণীতে তা-ই স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭০’র দশক থেকেই জনশক্তি রফতানি করছে। শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান বাজার। ১৯৮০’র দশক থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। লিবিয়া, সুদানসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও তখন থেকেই জনশক্তি রফতানি শুরু হয়। ১৯৯০’র দশক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রুনাই, মিসর, মরিসাসসহ কয়েকটি নতুন বাজার সৃষ্টি হয়। নতুন সহস্রাব্দে ব্রিটেন, ইটালী, জাপানসহ এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে জনশক্তির চাহিদা সৃষ্টি হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের জনশক্তির বাজার উন্মুক্ত হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, থাইল্যান্ড, স্পেন, তিউনেসিয়া, চিলি, পেরুসহ শতাধিক দেশে বাংলাদেশ বর্তমানে জনশক্তি রফতানি করছে। এর মধ্যে ২০-২২টিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনশক্তি যাচ্ছে। তবে অধিকাংশ দেশেই রফতানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। সৌদি আরবের কথাই ধরা যাক। ১৯৭০’র দশকে এক-দুই হাজার জনশক্তি রফতানি দিয়ে শুরু হলেও ১৯৯৭ সালে হঠাত্ করেই এক লাখের বেশি জনশক্তি রফতানি হয়। ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪ হাজার জনশক্তি রফতানি হয়েছে। ২০০৯ সালেই চাহিদা ১৫ হাজারে নেমে আসে। ২০১২ সালে ২১,২৩২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার চাহিদায় আরো বেশি উত্থান-পতন হয়েছে। শুরুর দিকে বছরে কয়েক হাজার জনশক্তি রফতানি হলেও ১৯৯০’র দশকের প্রথমভাগে দেশটিতে ১৫-২০ হাজার জনশক্তি রফতানি হয়েছে। এই দশকের শেষভাগে তা ৫০ হাজারে উন্নীত হয়। ২০০৬ সাল থেকে তা হঠাত্ করে বাড়তে শুরু করে। ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২০ হাজার জনশক্তি রফতানি হয় মধ্যপ্রাচ্যের এ উদারপন্থি দেশটিতে। তারপর আবার তা ২ লাখে নেমে আসে। ২০১২ সালে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার জনশক্তি রফতানি হয়েছে। চাহিদায় অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হয়েছে কুয়েত ও মালয়েশিয়ায়ও। ২০০৬ পর্যন্ত কুয়েত বাংলাদেশের একটি ভালো বাজার ছিল। প্রতি বছর ৩০-৪০ হাজার জনশক্তি রফতানি হতো। তারপর হঠাত্ করেই বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯০’র দশকের প্রথমভাগে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ১৯৯১-৯৬ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার জনশক্তি রফতানি করে। তারপর বাজারটিতে শ্রমিকের চাহিদা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ২০০৭ সালে হঠাত্ করেই ২ লাখ ৭৩ হাজার জনশক্তি মালয়েশিয়ায় রফতানি হয়। পরের বছর আরো ১ লাখ ৩২ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যায়। তারপর আবার বাজারটি বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে সিঙ্গাপুর, বাহরাইন, কোরিয়া, ইটালীসহ কয়েকটি বাজারে জনশক্তির চাহিদা বরাবরই স্থিতিশীল রয়েছে। অনেক বছর ধরেই সিঙ্গাপুরে ৪৫-৫০ হাজার জনশক্তি রফতানি হচ্ছে। ওমানে ২০-২৫ হাজার, ইটালীতে ৭-৮ হাজার, কোরিয়ায় প্রায় ২ হাজার জনশক্তি রফতানি হচ্ছে। বিপরীত চিত্র ওমানে। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশটিতে বছরে ৫-৭ হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিগত দুই বছরে ৩ লাখ ৬ হাজার জনশক্তি রফতানি হয়েছে। বিগত ৫ বছর ধরেই দেশটিতে ৪৫-৫০ হাজার জনশক্তি রফতানি হলেও ২০১১ ও ২০১২ সালে মোট ৩ লাখের বেশি জনশক্তি রফতানি হয়েছে। জনশক্তির বাজারে চাহিদা উঠা-নামার পিছনে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকে। আমদানিকারক দেশের অর্থনীতি খারাপের দিকে গেলে দেশটির উন্নয়ন, উত্পাদন ও নির্মাণ থমকে পড়ে। জনশক্তি চাহিদা কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের বাজারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারেও অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। চাহিদা উঠা-নামার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সামাজিক কারণটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সমস্যাটির কয়েকটি ধারা আছে। এক. গ্রামের বেকার যুবসমাজের একটি অন্যতম আকাঙ্ক্ষা থাকে বিদেশে গিয়ে চাকরি করার। এসএসসি পাস বা ফেল করে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তারা বেকার। নেশার মরণ ছোবল হাতের নাগালে। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের থাবাও কম শক্তিশালী নয়। কর্মহীন ছেলেটি খারাপ পথে চলে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা চায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে। এজন্য সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে দিতেও কুণ্ঠিত হন না। তাদের এই দুর্বলতার সুযোগটিই নেয় একশ্রেণির জনশক্তি ব্যবসায়ী, যারা আদম ব্যবসায়ী হিসেবে সমধিক পরিচিত। স্বচ্ছ ব্যবসা নয়, ছয়-নয় করে টাকা উপার্জনই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে। তাই তারা বেকার যুবক ও তাদের অভিভাবকদের প্রলোভন দেখিয়ে দেশভেদে দুই-তিন লাখ টাকা নেয়। তারপর শুরু হয় হতভাগ্য অভিভাবকদের তাদের পিছনে ঘুরার পালা। এই ব্যবসায়ীদের গ্রাম পর্যন্ত এজেন্ট থাকে। যারা শিকার যোগাড় করে দিয়ে কমিশন নেয়। এই দুষ্টচক্রটি এক সময় নারী পাচারেও যুক্ত ছিল। গ্রামের গরিব ও অবহেলিত নারীদের মোটা বেতনে চাকরি দেয়ার নামে পাচার করতো। সরকারের ব্যাপক তত্পরতার ফলে এখন সেটি প্রায় বন্ধ হয়েছে। কিন্তু জনশক্তি রফতানির নামে প্রতারণা বন্ধ হয়নি। তাদের মাধ্যমে অনেকে বিদেশে যেতেও পারছে। এতে জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। অবশ্য এজন্য তাদেরকে স্বাভাবিকের ৩-৪ গুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিদেশে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সাথে অধিকাংশ সময়ই শ্রমিকের কোনো চুক্তি থাকে না। ফলে শ্রমিকরা বেতন অনেক কম পায়। নিম্ন পর্যায়ের কাজ করতে হয়। এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দুই. রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছে এবং সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা ঝামেলার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে কর্তৃপক্ষ ত্যক্ত-বিরক্ত। তারা এ সমস্যা এড়ানোর জন্য অন্যান্য দেশ থেকে জনশক্তি আমদানিকেই শ্রেয়তর মনে করছে। পাসপোর্ট জালিয়াতি তো আছেই। যদিও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট চালু করার পর এটি প্রায় বন্ধ হয়েছে। তিন. রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাথে যোগসাজশে চাহিদার তুলনায় বেশি লোক নেয়া, ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই লোক পাঠানো, ভুয়া কোম্পানির চাহিদাপত্রের মাধ্যমে জনশক্তি রফতানি করে। এতে প্রশাসনেরও প্রশ্রয় থাকে। মালয়েশিয়ার বাজারটি হাতছাড়া হওয়ার পিছনে এ প্রতারণাই প্রধান কারণ ছিল। প্রবাসীদের কেউ কেউ সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি তো আছেই। বর্তমান সরকার তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ই বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। রোহিঙ্গারা যাতে পাসপোর্ট না পায় সেজন্য তত্পরতা বাড়িয়েছে। তারপরও এটি নিশ্ছিদ্র করা যায়নি। এজন্য পাসপোর্ট অফিসগুলোকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনায় এবং শ্রমিক প্রেরণে সরকারের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করায় প্রতারণা কিছুটা কমেছে। এটি আরো জোরদার করতে হবে। মালয়েশিয়ার সাথে সরকারিভাবে জনশক্তি প্রেরণের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি সম্পাদনের পর এখন সরকার-টু-সরকার শ্রমিক পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই আগ্রহী শ্রমিকরা অনলাইনে নাম রেজিস্ট্রি করেছে। লটারির মাধ্যমে বিজয়ীদের সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকায় মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে। তারা বেতনও ভালো পাবে। জালিয়াতিচক্র অবশ্য সরকারের ওপর নাখোশ। এক্ষেত্রে সরকার দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে সর্বস্তরের জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তির প্রচুর চাহিদা আছে। তাই সরকার সুষ্ঠুভাবে রফতানি করতে পারলে বাজারটি আবার সক্রিয় হবে। সৌদি আরবেও রফতানি বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে বলে জানিয়েছে। প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকদের আচরণ উন্নয়নে কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশ্বে শ্রমিকের চাহিদা উত্তরোত্তর বাড়ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষ জনশক্তি রফতানিকারক দেশ। এ অবস্থান আরো উন্নত করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। তবে এ জনশক্তি রফতানি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্বে দ্রুত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক বিকাশ ঘটছে। উন্নত বিশ্ব এবং চীনসহ অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতেই শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। তাই তারা জনশক্তির বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন এক সময় ফুরিয়ে যাবে। বর্তমানে প্রবাসে কর্মরতদের প্রায় ৩৪ শতাংশ দক্ষ ও পেশাজীবী। প্রায় ৫২ শতাংশই অদক্ষ শ্রমিক। ভয় এ বড় অংশকে নিয়ে। বাংলাদেশের জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে না পারলে এক সময় দেশ বৈদেশিক শ্রমবাজার হারাবে। নিম্ন উত্পাদনশীল শ্রমশক্তিকে সময়োপযোগী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ করিয়ে উচ্চ উত্পাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে। এজন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে কর্মশক্তি হ্রাস পায়। তাই দারিদ্র্য ঘুচানোর পদক্ষেপগুলো আরো জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশে অনাদিকাল থেকেই নারী জনশক্তি প্রায় অব্যবহূত থেকেছে। ব্যাপক প্রতিযোগিতার বিশ্বে এ ধরনের অপচয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক। তবে আশার কথা, সমপ্রতি নারীরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে এসেছে। তারা বিদেশেও চাকরি নিয়ে যাচ্ছে। বিগত পাঁচ বছর ধরে নারী জনশক্তি রফতানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০০৮ সালে ২০,৮৪২ জন নারী বিদেশে গেছে। ২০১২ সালে তা বেড়ে ৩৭,৩০৪ জনে পৌঁছেছে। আগে নারীরা বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও গ্লানির শিকার হতো। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ, নারী নির্যাতন বিরোধী আইন প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন, পল্লী অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে নারীরা প্রতারণা থেকে রেহাই পেয়েছে। এখন নারীরা সুনির্দিষ্ট চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। এজন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। গন্তব্য দেশের ভাষা শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এ উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে, যাতে দক্ষ নারী জনশক্তি সৃষ্টি করা যায়। দেশের কর্মক্ষম নারী-পুরুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে রেমিটেন্সই বাংলাদেশের ভাগ্য পাল্টে দিতে পারে। সবাইকে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সারণী: বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি ও রেমিটেন্স প্রাপ্তি বছর বৈদেশিক কর্মসংস্থান রেমিটেন্স প্রাপ্তি (জন) (কোটি ডলারে) ১৯৮০ ৫৫,৭৮৭ ৩০.৫০ ১৯৯০ ১,০৩,৮১৪ ৭৮.১৫ ২০০০ ২,২২,৬৮৬ ১৯৫.৫০ ২০০৬ ৩,৮১,৫১৬ ৫৪৮.৪০ ২০০৯ ৪,৭৫,২৭৮ ১,০৭১.৭৭ ২০১০ ৩,৯০,৭০২ ১,১০০.৪৭ ২০১১ ৫,৬৮,০৬২ ১,২১৬.৮১ ২০১২ ৬,০৭,৭৯৮ ১,৪১৬.৪০