উত্তেজনা বাড়ছে চীন জাপানের

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৮
এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে দুই পরাশক্তি চীন ও জাপান। দেশ দুইটির মধ্যে দ্বীপ নিয়ে বিরোধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। গত ৬০ বছর ধরে জাপানের সঙ্গে দ্বীপ নিয়ে বিরোধ রয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার। জাপান ও চীনের সঙ্গে কোরিয়া উপদ্বীপ নিয়েও বিরোধটা কম নয়। সমস্যা সমাধানের আলো দেখা গেছে বহুবার। কিন্তু মুহূর্তেই মীমাংসার আলো রেখা অন্ধকারে ঢেকে গেছে। বিরোধের মূলে রয়েছে দ্বীপগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা। বিশ্লেষকদের মতে, দেশ তিনটির মধ্যে দ্বীপ সমস্যার সমাধান হয়তো হবে না। আর হলেও কবে হবে সেটা বলা মুশকিল। দেশ তিনটির মধ্যে দ্বীপ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয় যখন এদের সীমানায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা, এক দেশের বিমানের আরেক দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন কিংবা রাডার তাক করার ঘটনা ঘটে। জাপান অভিযোগ করেছে, গত ৩০ জানুয়ারি পূর্ব চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ দ্বীপের কাছে দেশটির নৌবাহিনীর জাহাজের দিকে চীনের একটি জাহাজ থেকে রাডার তাক করা হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে এটাকে ভয়ংকর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে চীন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জাপান ও চীনের মধ্যে বিরোধ পূর্ব চীন সাগরের দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে। বিরোধপূর্ণ দ্বীপপুঞ্জ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে আছে। সেখানে প্রচুর তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পাওয়া যায় প্রচুর মাছ। দ্বীপপুঞ্জটি জাপানের কাছে সেনকাকু এবং চীনের কাছে দিয়াউ নামে পরিচিত। চীন ও জাপানের বৈরিতা দীর্ঘদিনের। চীনের সংস্কৃতির কিছু অংশ দ্বারা জাপানের জনগণ প্রভাবিত। ১৮৯৪-১৮৯৫ সালের যুদ্ধে চীন-জাপান যুদ্ধে জাপানের জয় চীনকে পেছনে ফেলে দেয়। জাপান চীনের কাছ থেকে তাইওয়ান (পূর্বের ফরমোজা) দখলে নেয়। ১৯১০ সালের দিকে কোরিয়া উপদ্বীপেও দখলদারিত্ব গড়ে তোলে জাপান। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া চীনের এবং দক্ষিণ কোরিয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। পরে দেশ দুইটি স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হলেও দুই পরাশক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ১৯৩১ সালে উত্তর-পূর্ব চীন এবং ১৯৩৭ সালে চীনের দক্ষিণাঞ্চলে জাপানের অভিযানে সেনা হত্যা, ধর্ষণ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পতন হয় চীনের নানজিং শহরের। এতে দেশ দুইটির মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। জাপানের দখলদারিত্বের অবসান হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ২০১০ সালে জাপানকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানায় চীন। জাপান ও রাশিয়ার বিরোধ: রাশিয়ার কাছে দক্ষিণাঞ্চলীয় কুরিল এবং জাপানের কাছে উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা হিসাবে পরিচিত। চারটি দ্বীপ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৬০ বছর ধরে বিরোধ চলছে। চারটি দ্বীপ হলো কুনাশির, এতোরোফু, শিকোতান এবং হাবোমাই। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়া ফেডারেশনের সামরিক জঙ্গি বিমান হোক্কাইডো দ্বীপের রিশিরিতে জাপানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। আঠার থেকে উনিবংশ শতাব্দীতে জাপান এই দ্বীপগুলোতে বসতি স্থাপন করে। ১৮৫৫ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে জাপানকে চারটি দ্বীপের মালিকানা এবং রাশিয়াকে উত্তরাঞ্চলের সবকিছুর অধিকার দেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেখানে জাপানের সতের হাজার বাসিন্দা বসতি স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া জাপানের কাছ থেকে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ১৯৪৯ সালের মধ্যে জাপানিদের বিতাড়িত করে। এরপর দেশ দুইটি কূটনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন সময় চুক্তি সম্পাদন করলেও দ্বীপ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বর্তমানে সেখানে ত্রিশ হাজার বাসিন্দা রয়েছে। এই দ্বীপপুঞ্জে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, রিনিআম নামের ধাতব পদার্থ রয়েছে বলে মনে করা হয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয় তখন ইউনিয়নের নেতা মিখাইল গর্বাচেভ জাপানকে অর্থের বিনিময়ে দুইটি দ্বীপ কিনে নেয়ার আহ্বান জানালেও তারা তা অগ্রাহ্য করে। জাপানের দাবি, ঐতিহ্যগতভাবে দ্বীপপুঞ্জের মালিক তারা। যুক্তরাষ্ট্রও জাপানের দাবিকে সমর্থন করে। রাশিয়ার দাবি, ওখোতস্ক সমুদ্রে প্রবেশের পথ এই দ্বীপগুলো। তাই এর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রাখতে হয়। দ্বীপগুলো বসবাসের তেমন উপযোগী নয়। এটি নোংরা এবং ঠাণ্ডা। সেখানে বাস করে জেলে এবং রাশিয়ার সীমান্ত বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে এই বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার আহ্বান জানান। তার এই আপোষমূলক মন্তব্য বিরোধপূর্ণ ভিন্ন দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চীনের সঙ্গে বিরোধে তার কঠোর অবস্থানের বিপরীত। তবে গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার দুইটি জঙ্গি বিমান জাপানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করায় পরিস্থিতি এখন ভিন্নদিকে মোড় নিচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশেষজ্ঞ রাফ কোসা বলেন, এই বিরোধের সমস্যা সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই। জাপানের দাবি: চীনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ দ্বীপগুলো ১৮৯৫ সালে জাপানের অন্তর্ভুক্ত হয়। দেশটি জানিয়েছে, তারা দশ বছর ধরে জরিপ চালিয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে, এই দ্বীপগুলো তাদের মালিকানায়। সেনকাকু নানসেই সোতো দ্বীপের অংশে পরিণত হয় যা রিয়োকু দ্বীপ নামে পরিচিত এবং এটা বতর্মানে ওকিনওয়া প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৫১ সালের সানফ্রান্সিকো চুক্তি অনুযায়ী জাপান তাইওয়ানসহ কিছু এলাকার দাবি পরিত্যাগ করে। তবে নানসেই সোতো দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের অধীনে আসে। ১৯৭১ সালে এই দ্বীপকে ফেরত দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জাপান জানায়, চীন সানফ্রান্সিসকো চুক্তির সময় কোনো আপত্তি জানায়নি। ১৯৭০ সালে যখন এখানে তেল এবং গ্যাস আছে বলে জানা যায়, তখন থেকেই চীন এবং তাইওয়ান এই দ্বীপপুঞ্জের দাবি করে আসছে। চীনের দাবি: চীন দাবি করে, প্রাচীনকাল থেকে দিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ ভৌগলিকভাবে তাদের দেশের অংশ। তাদের অন্যতম প্রদেশ তাইওয়ান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এটি। চীনের নাগরিকরা অনেকবার দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করে এবং একবার হংকংয়ের একজন নাগরিক সমুদ্রে ঝাঁপ দেয় এবং ডুবে যায়। এরপর থেকে চীন এবং তাইওয়ানের অনেকে সেদিকে যাত্রা করে। ২০০৪ সালে জাপান চীনের সাতজন কর্মীকে আটক করে। এরপর অনেকবার জাপান, চীন এবং তাইওয়ানের ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার নৌকার মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ২০০৫ সালে তাইওয়ানের ৫০ টি মাছ ধরার নৌকা প্রতিবাদ জানায় যে, জাপানের কর্মীদের দ্বারা তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ২০১০ সালে জাপানের ট্রলারের সঙ্গে চীনের ট্রলারের সংঘর্ষ হয়। এর ফলে দেশ দুইটির মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ২০১২ সালে যখন জাপান বেসরকারি মালিকানা থেকে তিনটি দ্বীপ কিনে নেয় তখন থেকে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পায় যা এখনো চলছে। গত মাসে বেইজিং ঘোষণা দেয়, সমুদ্রসীমা রক্ষায় তারা ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ চালাবে। সামপ্রতিক মাসগুলোতে উভয় দেশ দ্বীপপুঞ্জের কর্তৃত্ব দাবি করছে এবং চীন পূর্ব এবং দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের দাবি আরো জোরালো করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের উত্তেজনা দেশ দুইটিকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাডার তাক করা বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। জাপান এটাকে সামরিক খেলা বলে উল্লেখ করেছে। দেশটি বিমান থেকে আগুনের বুলেট নিক্ষেপ করার হুমকি দিয়েছে। চীন জাপানকে এধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী শিনজু অ্যাবে বলেন, চীনের সঙ্গে পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে। যে কোনো সময় অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, সংলাপ নিয়ে আলোচনার সময় চীনের এই উস্কানি গ্রহণযোগ্য নয়। গত মাসে জাপান চীনকে মোকাবিলায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। চীনের গ্লোবাল টাইমস জাপানের প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তিনি এই মাসে যুক্তরাষ্ট্র সফর করতে পারেন। এসময় তিনি রাডারের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন কিছু বুঝিয়ে সমর্থন আদায় করতে পারেন। তবে এটা পরিষ্কার নয় যে, তিনি কী বলতে পারেন। বিশ্লেষক মার্ক তাইয়েন বলেন, এশিয়া আবার যুদ্ধের দিকে যাবে না। কারণ দেশ দুইটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানে। তারা আবার সেই ভয়াবহ ক্ষতির দিকে যাবে না। যুদ্ধ শুরু হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশ দুইটি।