মার্কিন ড্রোন ঘাঁটি আরবে!

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:০৯
অন্যদেশে ড্রোন হামলা নিয়ে হোয়াইট হাউসের মনোভাব কী? বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ওপর ড্রোন হামলার? এ ভাবনার গোপন নথি প্রকাশ পায় গত সপ্তাহে। এদিকে সৌদি আরবে সন্ধান মিলেছে এক গোপন মার্কিন ড্রোন ঘাঁটির। আরবে মরুভূমির গভীরে ২০০৯ সালে সৌদি প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই আমেরিকা তৈরি করেছিল একটি ড্রোন ঘাঁটি। এখান থেকেই গোটা আরব উপদ্বীপে নজরদারি চালাত তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ গত সপ্তাহে এসব তথ্য প্রকাশ করে। সৌদি আরবে মার্কিন গোপন ঘাঁটি থাকার বিষয়ে জানার পরও মার্কিন গণমাধ্যম এতদিন তা প্রকাশ করেনি। ইয়েমেনে আল-কায়েদা বিরোধী অভিযান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে— এ আশংকায় তা গোপন রেখেছিল মার্কিন গণমাধ্যম। এর আগে লন্ডনের টাইমস পত্রিকা খবর দিয়েছিল, ইয়েমেনে যে মার্কিন ড্রোন হামলা চলছে প্রকৃতপক্ষে তাতে বেশ কয়েকবার সৌদি জঙ্গিবিমান অংশ নিয়েছে। তবে সে সময় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদ আল ফয়সাল ওই খবর নাকচ করেছিল। ‘যদি তুমি আমার বন্ধু না হও, তাহলে তুমি আমার শত্রু’, এমন মন্তব্যে দুনিয়ার নিন্দা আর সমালোচনা কুড়িয়েছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। রাজনৈতিক মতাদর্শ বিচার করলে হোয়াইট হাউসের বর্তমান বাসিন্দা বারাক ওবামা তার একেবারে বিপরীত মেরুতে। বুশ রিপাবলিকান, ওবামা ডেমোক্র্যাট। তবে রাজনীতিগতভাবে আলাদা হলেও মানসিকতার তেমন রদবদল দেখা যায় না দুই রাজনীতিবিদের মধ্যে। আমেরিকার ‘শত্রু’দের চিহ্নিত করে তাদের প্রতিহত করার মধ্যে কোনও অন্যায় দেখেননি ওবামাও। যদি সেই শত্রুরা খোদ আমেরিকার নাগরিক হন তাহলেও তাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা করাই যায়। প্রেসিডেন্টের এমনই মতামত প্রকাশ পেয়েছে সদ্য বেরিয়ে পড়া ‘গোপন নথি’র পাতায়। ওবামা ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রত্যন্ত প্রান্তে অন্তত তিনশ’ বার ড্রোন হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। আল-কায়েদা ও তালেবান শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে ঠিকই কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন তার চেয়েও অনেক বেশি। এবার ওবামা ও তার উপদেষ্টামণ্ডলীর আরো ‘গোপন’ কর্মের সন্ধান মিলেছে সৌদি আরবের মাটিতে। একা ওবামা প্রশাসন নয়, সদ্য আবিষ্কার হওয়া এ ড্রোন ঘাঁটি অস্বস্তি বাড়িয়েছে সৌদি রাজ পরিবারেরও। আরব মরুভূমির গভীরে চার বছর আগে সৌদি প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই আমেরিকা তৈরি করেছিল ড্রোন ঘাঁটি। আর এখান থেকেই গোটা আরব উপদ্বীপে নজরদারি চালাত তারা। সৌদি আরবের একেবারে দক্ষিণে, ইয়েমেনই ছিল প্রধানত এ নজরের লক্ষ্য। আরবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর ইয়েমেনই হয়ে উঠেছিল আরব উপদ্বীপে আল-কায়েদার সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। আমেরিকার নাগরিক ও মুসলমানদের এক ধর্মীয় নেতা আনওয়ার আল-আওলাকি মার্কিন প্রশাসনের নজর এড়িয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এখানেই। এখান থেকেই আওলাকি সৌদি রাজপরিবার ও আমেরিকার বিরুদ্ধে জেহাদ চালাতে ক্রমশ শক্তিশালী করে তুলছিলেন আল-কায়েদা সংগঠন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, আওলাকির ঘাঁটির নিখুঁত সন্ধান পেতেই আরবে গোপনে ড্রোন ঘাঁটি গড়ে তোলে আমেরিকা। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ২০০৩ সালে সৌদি আরব থেকে বেশিরভাগ সেনাই সরিয়ে নিয়ে যায় আমেরিকা। মুসলিম দুনিয়ার পবিত্র সৌধগুলোর বেশির ভাগই আরবে, তাই সেখানে মার্কিন ড্রোন ঘাঁটির নির্মাণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা হয়তো ভালো চোখে দেখবেন না। তাই গোপনীয়তা। তবে আরবের এ ঘাঁটির ‘উদ্বোধন’ সফল হয়নি একেবারেই। প্রথম উড়ান ও হামলায় ইয়েমেনের অন্তত কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়। এরা সবাই ছিলেন একেবারেই নিরীহ। এদের মধ্যে সামিল ছিল অন্তত দশ স্কুল পড়ুয়াও। জানা গেছে, এ হামলা হয়েছিল স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ওবামার নির্দেশেই। তবে সাফল্য বেশিদিন দূরে থাকেনি। আরবের এ ঘাঁটি থেকেই ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে উড়েছিল ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ড্রোন। ২০১১’র সেপ্টেম্বরে ১৬ বছরের ছেলে ও তিন আল-কায়েদা শীর্ষ নেতাসহ নিহত হন মার্কিন প্রশাসনের লাল তালিকায় থাকা আনওয়ার আল-আওলাকি। তবে সাফল্যের বুলি ঝরিয়েও এখন আর সমালোচনার মুখ বন্ধ রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে খবর ফাঁস হয়ে গেছে, সব সময় যে ড্রোন হামলা মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়ে হয়েছে তেমনও নয়। ইয়েমেনে আল-কায়েদার উপস্থিতি ও শক্তিবৃদ্ধিতে বেশ শঙ্কিত হতে শুরু করেছিল আরবের রাজ পরিবার। তাই অনেকবারই তাঁদের অনুরোধেও হামলা চলেছে বলে জানা গিয়েছে। আরবে মার্কিন ড্রোন ঘাঁটি তৈরি ও ব্যবহার নিয়ে একজন মন্ত্রী প্রিন্স মুহাম্মদ বিন নায়েফ সংবাদ মাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে সব তথ্য গোপন করে আরবের মাটিতে ড্রোন ঘাঁটি গড়তে দিয়ে বেশ চাপে পড়ল আরব। মার্কিন প্রশাসনের মতো এবার ড্রোন বিতর্কে নাম জড়াল তাদেরও। বেশ অস্বস্তিতে রাজ পরিবার।