আজ ফাল্গুনের প্রথম দিন। গণমানুষের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক/ আজ বসন্ত’। শীতের রিক্ততা ভুলিয়ে আবহমান বাংলার প্রকৃতিতে আজ ফাগুনের ছোঁয়া, আগুনরাঙা বসন্তের সুর। গাছে গাছে ফুটবে রক্ত শিমুল-পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম; শোনা যাবে কোকিলের ডাক। কবি মনে জেগে উঠবে নতুন নতুন সব পঙক্তি। বসন্ত বাতাস দোলা দিবে সবার মনে; সাজবে বাসন্তি সাজে। বসন্তরাণীর আগমনে মাতাল হবে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ। বসবে বাসন্তি মেলা; হবে হই হুল্লুর,আরো কত কি!
আগুন রাঙা এ ফাগুনে প্রকৃতিতেই শুধু উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়ায় না, রঙ ছড়ায় প্রতিটি তরুণ প্রাণে। প্রাণের টানে, আর প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মন হয়ে ওঠে উত্তাল, বাঁধনহারা। বসন্ত নিয়ে যেন তরুণদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বুশরা হক জানালেন, বসন্ত নিয়ে তার মনের কথা। ‘ফাগুনের ঝিরিঝিরি হাওয়া, রক্তিম পলাশ, শিমুল, কাঞ্চন পারিজাত, মাধবী, গামারী আর মৃদু গাঁদার ছোট ছোট ফুলের বর্ণিল রূপ, বসন্তের কথা আসলেই এগুলোই চোখে ভাসে।
আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তাসনিম জাহানের কাছে ১ ফাল্গুন, আর বসন্ত ঋতু একটু অন্য রকম। তিনি বলেন, ‘১ ফাল্গুন মানে বসন্তের প্রথম সকালে বাসন্তি রঙা শাড়ি, কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, পায়ে নূপুর, খোঁপায় গাঁদা ফুল জড়িয়ে বেরিয়ে পড়া। কিন্তু বসন্ত একটু বেশি রঙ্গিন। কারণ, আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের শহীদ ভাইদের রক্ত রঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতি বসন্তকে করে তোলে মহিমান্বিত।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নবীন শিক্ষার্থী কুমকুম বৃষ্টি বলেন, ১ ফাল্গুনের একদিন পর ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই উত্সবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বইমেলার প্রাণের উচ্ছ্বাস আর শাহবাগের তারুণ্যের বিস্ফোরণ। এ উচ্ছ্বাস শুধু তরুণ-তরুণী নয়, সবার মনেই সমান রঙ ছড়াচ্ছে।
সিটি কলেজের সিঙ্গাপুরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থী টিউলিপ খান জানান, ‘এই ফালগুনে দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু ঢোলের তালে তালে শোভাযাত্রার মাঝে চিরচেনা সেই আনন্দটা খুব বেশি মিস করবো।
আমাদের একুশ শতকের তারণ্যের ভাষা আর হাজার বছরের সংস্কৃতির অপূর্ব এক সেতুবন্ধন রচনা করেছে বসন্ত। একই শব্দ, একই ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়েছে বাঙালীর মুখে, যুগে যুগে একই সুরে। এই যেমন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ভাষায় বসন্ত ‘বসন্ত বাতাসে গো/ বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ/ আমার বাড়ি আসে...।’ রবি ঠাকুর গেয়েছেন, ‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে/ এত বাঁশি বাজে/ এত পাখি গায়...।’ আর কবি নজরুলের চোখে বসন্তের রূপ- এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে/ খুনেরা ফাগুন...।
বিশ্বকবি, বাউলকবি, বিদ্রোহী কবি কিংবা আজকের তরুণ সমাজ। সর্বকালের সকল মানুষের সুরকে এক এবং অভিন্ন করেছে এই ঋতুরাজ বসন্ত। তাইতো অনেক হতাশার মাঝেও সারাদেশ জেগে ওঠে নতুন আনন্দে। চারুকলা থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। অশুভ শক্তিকে মোকাবেলা করার নতুন শক্তি সঞ্চালন করে বাঙালীর রক্তে।
