কোন কাননের ফুল শিশু জুনায়েত ? তা জানে না নাদিরা বেগম। কিন্তু শিশু জুনায়েতের ভালোবাসায় পড়ে গৃহপরিচারিকার চাকরিও ছেড়ে দিয়েছে। এ এক অন্য রকম ভালোবাসা। এটা গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমার কাহিনী নয়, একটি বাস্তব ঘটনা। সে দিন ছিল ৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ সাল। সকাল ১১টা। ঢাকার আগারগাঁও তালতলা এলাকা থেকে বলাকা ট্রেনে করে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের কপালহর গ্রামের বাড়ি ফিরছিলো নাদিরা বেগম। ওই ট্রেনে রাজেন্দ্রপুর থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ এক শিশু কোলে নিয়ে বোরকা পরিহিত এক নারী উঠেন। বসেন নাদিরার সিটের পাশে। তার মুখ স্কার্ভ দিয়ে ঢাকা। পাশে বসার পর কথা হয় নাদিরার সাথে। কিছুক্ষণ পর ওই নারী টয়লেটে যাবার কথা বলে চলন্ত ট্রেনে শিশুটিকে নাদিরার কোলে দেন। সময় গড়িয়ে যায় এক এক করে প্রায় কুড়ি মিনিট। নাদিরা শিশুটিকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। অগত্যা টয়লেটে গিয়ে খোঁজ করে ওই নারীর। না, তার সন্ধান নেই। ইতোমধ্যে ট্রেনটি অতিক্রম করে কয়েকটি স্টেশন। বিষয়টি ট্রেনের যাত্রীদের জানায়। নাদিরা এসে নামে তার শেষ গন্তব্য গফরগাঁও স্টেশনে।
কে শিশুটির মা-বাবা, কি তার জাত-ধর্ম, পরিচয় তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় সবার মাঝে। অনেকের ধারণা নাদিরা কি শিশুটিকে চুরি করে এনেছে। তার ওপর মাতৃদুগ্ধ ছাড়া শিশুটি বাঁচবেই কিভাবে?
শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে আসার পর খবর পেয়ে অনেকে ছুটে এসেছিলেন দত্তক (পালক) নিতে। সাংবাদিকদের পরামর্শে ২৫ সেপ্টেম্বর নান্দাইল মডেল থানায় শিশুটিকে নিয়ে আসে নাদিরা। সেই থেকে শিশুটিকে সে মাতৃস্নেহে লালন-পালন করে আসছে। এর মধ্যে কুমারি নাদিরা পড়ে যায় এক অন্য রকম ভালোবাসায়। ঘরে খাবার নেই। আয়-উপার্জন নেই। নেই তার জীবিকা নির্বাহের সেই গৃহপরিচারিকার চাকরিটি। তারপরও নিষ্পাপ এই শিশুটিকে সে মাতৃত্বের বন্ধনে বুকে জড়িয়ে লালন পালন করছে। শিশুটির নাম রেখেছে জুনায়েত। বাড়ির সবার কাছে চোখের মণি হয়ে উঠেছে জুনায়েত। শিশুটির জন্যে কুমারি নাদিরা এখন নতুন সংসার জীবনে জড়াতে পারছে না ।
দরিদ্র পরিবারের মেয়ে নাদিরা বেগম (২৫)। বাবা আ.জব্বার মারা গেছেন প্রায় ১২ বছর আগে। জীবিকার প্রয়োজনে গৃহপরিচালিকার চাকরি নেন ঢাকার আগারগাঁও তালতলা এলাকার জনৈক দুলাল খানের বাসায়। সেখানে কাজ করছিলেন প্রায় চার বছর। নাদিরার মা নূরজাহান (৬৫) জানান, নাদিরার সব সঞ্চয় জুনায়েতের দুধসহ সকল চাহিদা পূরণে শেষ। এখন শিশুটির জন্য যদি সরকারি বেসরকারিভাবে কিছু সহযোগিতা পাওয়া যেত তাহলে আমরা কিছুটা চিন্তামুক্ত থাকতে পারতাম। নাদিরা বেগম ইত্তেফাককে জানায়, জুনায়েত এখন আমার ভালোবাসা। আমার জীবনের সব কিছু। আমিই তার মা, আমিই তারা বাবা। জন্মের পর তাকে যে আপনজনরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে এ বিষয়টি সে যেন বড় হয়ে বোঝতে না পারে সেভাবই বড় করছি।
