কেমিস্ট্রি অব লাভ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:০১
’আমি হূদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইল না কেহ’- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমর উক্তিমালা আগামী সহস্রাব্দ ধরে বারে বারে প্রেমপিয়াসী নর-নারীর মনের মণিকোঠায় জাগ্রত হবে, আবেদিত হবে কোন নতুন মনের সন্ধানে। হূদয়ের গভীর থেকে উত্সারিত হবে ভালবাসার স্পন্দন। শুধু কবিগুরু নন, শুধু আবহমান বাংলার প্রেমপ্রবণ কাব্যসাহিত্য জগতের শিরমণিগণ নন, বিশ্বের সকল প্রেমপিয়াসী নর-নারীর বিশ্বাস হূদয় থেকেই ভালবাসার ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়ে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞান বড় বেরসিক। এখানে আবেগ, রাগ-বিরাগ, ভাবনার কোন স্থান নেই। তাইতো বিজ্ঞান বলছে, ভালবাসা হার্ট বা হূদয় থেকে উত্সারিত হয় না। ভালবাসার উত্পত্তি হয় মনে, মস্তিষ্ক হতে। আর এটা হচ্ছে কেমেস্ট্রি অব লাভ, ভালবাসার রসায়ন। আর দুটি মনের সেতুবন্ধন রচনায় হার্ট শুধু নীরব সাক্ষী হতে পারে, সম্পর্ক রচনার দায়িত্ব ব্রেন বা মস্তিষ্ক কোষের বিভিন্ন কেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদানের। দুটি মন যখন একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় তখন মস্তিষ্ক কোষের এন্ড্রিনালিন তত্পর হয়ে ওঠে। নিঃসরিত হয় ফিনাইল ইথাইলামিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, যা মস্তিষ্ক কোষের মধ্যে তথ্যের আদান প্রদান ত্বরান্বিত করে। অ্যাম্পিটামিন গ্রুপের দুই সহোদর ডোপামিন ও নরত্রপিনেফরিনের ভূমিকাও কম নয়। ডোপামিন আমাদের মধ্যে রোমান্স তৈরি করে। আমাদের অনুভূতিকে জাগ্রত করে। আর নরএপিনেফরিন এডরিনালিন তৈরিকে ত্বরান্বিত করে। আর এই এডরিনালিনই আমাদের হার্ট বা হূদয়কে প্রভাবিত করে। ফলশ্রুতিতে তেরি হতে পারে দুটি মনের সম্পর্কের নতুন মেলবন্ধন। আর উপরে বর্ণিত তিনটি কেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি হয় লাভ কেমেস্ট্রি বা ভালবাসার রসায়ন, যা দুটি মনকে আল্পুত করতে পারে, রোমাঞ্চিত করতে পারে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন। আর এই কেমিস্ট্রি যদি যথাযথভাবে কাজ না করে তখন শুরু হয় বিপত্তি। হূদয়ের গভীর থেকে উত্সারিত হাজারও পংক্তিমালা তখন আর আবেদন তৈরি করতে পারে না। এটাও এক ধরনের কেমেস্ট্রি। শুধু দু-একটি কেমিক্যাল নয়, মানুষের ভালবাসা নিয়ন্ত্রিত হয় অনেকগুলো রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোনের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে টেসটেসটেরণ ও এস্ট্রোজেন হরমোনেরও রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো প্রথম ভাললাগায়, প্রথম দিনের দেখায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কপাল, হাত ঘেমে যায়, হার্টবিট বেড়ে যায়। এটা যদি ঘটে তবে বুঝতে হবে সত্যিকারভাবে লাভ কেমিস্ট্রি শুরু হয়ে গেছে। এটা ঘটে ডোপাপিন, ননএপিনেফফিনের কারণে। বিশিষ্ট এনথ্রোপোলজিস্ট বা নৃতত্ত্ব বিজ্ঞানী এবং প্রখ্যাত লাভ গবেষক হেলেন ফিলারের মতে দুটি মনের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা পর্বে যখন তথ্য, দৃষ্টি ও মনের বিনিময় ঘটে তখন নানা কিছু ঘটে। যেমন ঘুমের সমস্যা, উদাসীনতা, নাওয়া-খাওয়ার সমস্যা ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞদের মত তরুণদের লাভ ক্যামিকেল যত দ্রুত কাজ করে তরুণীদের তার চেয়ে খানিকটা ধীর গতিতে। তাই অনেকে বলে থাকেন নারী হূদয় বোঝা মুশকিল। এ ব্যাপারে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞগণ দেখেছেন দু’টি মন যখন একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয় তখন তাদের মস্তিষ্কের সেরোটিনিন-এর মাত্রা কমে যায়। আর সাধারণত: সেরোটিনিন কম থাকলে এক ধরনের অবসেটিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার হতে পার। তাই প্রথম প্রথম সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে অনেক আবেগ স্থান পায়। তবে লাভ গবেষকগণ এটাও বলছেন, সবকিছু কেমিক্যাল, হরমোন, আর থিওরি অনুযায়ী হবে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। তাই সুন্দর সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও উপাত্তের পাশাপাশি, সুন্দর মন, ব্যক্তিত্ব, সদাচরণসহ নানা মানবিক গুণাবলীও প্রাধান্য পায়।