ধর্মের মাধ্যমে কর্ম হয় সৌন্দর্যময়

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫১
ধর্মের সাথে কর্মের আর কর্মের সাথে ধর্মের সাজুয্য ও সমন্বয় সাধন হওয়া প্রয়োজন সকল জীবনসাধনার বৈশিষ্ট্য। শুধু ধর্মে কিংবা শুধু কর্মে ব্যাপৃত থাকা নয় -ধর্মের মূল্যবোধ ও চেতনা কর্মে প্রবিষ্ট হওয়া আর কর্মের ধ্যানধারনায় ধর্মের অনুপ্রেরণা বা প্রয়াসে হতে হবে নিবেদিত চিত্ত। মানুষ আধাত্ম সাধনায় পরম সত্তায় লীন হতে চায়, নির্বাণ লাভ করতে চায়, কিন্তু সেই সম্মিলন শর্তহীন হয়না, বাস্তব জগতে বিচরণ ও কার্যে প্রবৃত্ত হওয়ার মাধ্যমে সেই বিশ্বাস ও বোধের প্রতিফলন থেকেই সম্মিলনের যথার্থতা প্রতিভাত হয়, অনুপ্রাণিত হয়। সৃষ্টিকর্তার একত্বের ওপর বিশ্বাস অকাট্য হয় না, এর উপলদ্ধির পূর্নতা প্রাপ্তিলাভ ঘটে না কর্মে সেই বিশ্বাসের বাস্তব পরীক্ষা ও প্রয়োগ ছাড়া। সৃষ্টিকর্তার কাছে যাঞ্ঝা করা হল সত্পথে থাকার কিন্তু সত্পথে থাকার ব্যাপারে বাস্তব অর্জন অভিজ্ঞতা যদি হয় ভিন্ন, ভিন্ন পদক্ষেপ যদি হয় গতি প্রকৃতি তাহলে সত্পথে থাকার প্রার্থনা ও প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠে অভিনয়তুল্য, অসার। রাসূলে পাক (স.) এবং তাঁর প্রাণ প্রিয় সাহাবিগণ খোদ বিধর্মীদের মধ্যে ইসলাম গ্রহনের আহবান জানানোয় যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, ইসলাম প্রচারের যে পথ পন্থা তাঁরা অবলম্বন করেছিলেন বর্তমান সময়ে নিজ সম্প্রদায় অর্থাত্ মুসলিমদেরকেই বিপথগামীতা কিংবা ইবাদত বন্দেগীতে আহবান জানানোর প্রয়াস প্রচেষ্টার মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনাযোগ্য বিষয় আছে। ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি নিজের আত্মশুদ্ধি, সন্তান সন্ততি ও পরিবার পরিজনের প্রতি দায়িত্ব পালনকে যারা গুরুত্ব দিতেন। কর্মও যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ন বিবেচিত হতো, তাদের অনুসারী অনুগামীরা এখন কর্মহীন ধর্ম পালন ঘর সংসার তথা জাগতিক দায়িত্বপালনকে পাশ কাটিয়ে নিজের কিংবা অন্যের শুধু ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করতে প্রাণপাত করছেন। তাদের কর্মতত্পরতা দেখে মনে হবে সংসারযাত্রার যন্ত্রনা ভুলতে অলসতায় কর্মহীন ধর্মব্যস্ততায় কাটাতে চাইছে। আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্কের বিষয়টি সুক্ষভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। তিনি রাহমানুর রাহিম। এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় আমার জন্ম, শৈশব, কৈশোর, যৌবন কাল পেরিয়ে বর্তমান পর্যায়ে আমি উপনীত। কত অসম্ভব ভাব কল্পনার বাস্তবতায় আমি আজ। কত পশ্চাত্পদ অবস্থা থেকে আমি আজ এখানে। আমি যা হয়েছি তা অন্যেরা একই সমতলে থেকে হতে পারেননি। আবার আমিও অন্যের মত অনেক পর্যায়ে যেতে পারিনি। আমি যা তাইই হয়েছি, হব এবং আমার নিয়তি মত আমি শেষ হয়ে যাব। এখন প্রশ্ন হল আল্লাহর সৃষ্টি আমি - তার প্রতি আমার আচরণ, কর্তব্য, দায়িত্ব কেমন হওয়া উচিত। তিনি আমার রব (প্রভু) আমার হাবিব (বন্ধু) তিনি আমাকে ভুল শুদ্ধ উভয় পরিবেশ পরিস্থিতিতেও পালন করেন - রক্ষা করেন। আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে, সংসারে জাগতিক নিয়মে আমাদের নিয়ন্ত্রককে ভয় পাই। মান্য গণ্য করি, হুকুম তামিলে তত্পর থাকি, তাকে খুশী করতে সমীহ করতে সচেষ্ট থাকি। কদাচিত্ তার অবাধ্য হই, তিনি মাইন্ড করতে পারেন এই চিন্তায় বা বোধ বিশ্বাসে চিন্তাভাবনায় সব সময় সতর্ক থাকি। তাহলে আমার সৃষ্টিকর্তার প্রতি, আমার সকল নিযন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণ কর্তার প্রতি, তার হুকুম আহকাম পালনের প্রতি, তাকে সম্মান সমীহ করার ক্ষেত্রে তাকে ভক্তি করার ক্ষেত্রে এত অমনোযোগি এত অভিনয় অবহেলা কেন? তিনি সামনে নেই বলে? তিনি সরাসরি আমাকে তিরস্কার করছেন না বলে? তার প্রতি আমার আস্থা বিশ্বাস বা ঈমান এরকম ভাসা ভাসা কেন? তিনি ভুল ধরছেন না ভুল ধরার জন্য, তিরস্কার করার জন্য স্বশরীরে সামনে নেই বলে? বয়স বাড়লে অভিজ্ঞতা বাড়ে এবং সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন সহজতর হয়, কম সময় ও শ্রমে বেশী কাজ করার ফলাফলও পাওয়া যায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধৈর্য, কর্ম উদ্যম, শক্তি ও সাহসেও ভাটা পড়ে। শ্রান্তি আসে ক্লান্তি বাড়ে। অবসাদের আত্মীয়রা এসে দেহে ও মনে বাসা বাধে, দৃষ্টি, শ্রবন ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়- হর্মন নিঃস্বরণ নিয়ন্ত্রণ ক্রিয়া প্রক্রিয়ায়, ক্যালরী কোলেস্ট্রলে বাদানুবাদে নানান রোগ বালাই শরীরকে কর্ম-অক্ষম করে তোলে। ফলে অভিজ্ঞতার দ্বারা একদিকে যে বাড়তি লাভ হয় এসব অনিবার্য অতিথির আগমনে ক্ষতি বাড়তেই থাকে। ফলে ফলাফল প্রায় পূর্ববতই থাকে। তাও আবার অর্থনীতির সেই অনিবার্য শর্ত- ‘আর সব যদি ঠিক থাকে’ অর্থাত্ পরিবেশ, অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, অন্যের সাহায্য সহযোগিতা এবং নিজের মনোবল বুদ্ধি বিবেক ও চিন্তাশক্তির ন্যূনতম সজাগ পরিস্থিতি ঠিক ঠাক থাকলেই না উপরে যা বল্লাম তা সাধিত হতে পারে। এসব বাস্তব বিষয় বিবেচনায় এনেই বলি-’মনরে! মনরে চল নিজের নিকেতনে। সময় থাকতে হও সাবধান। শরীরের যত্ন নাও, মনকে ভাল খাবার দাও, পরিবেশকে বান্ধব করে তোলার পদক্ষেপ নাও অহেতুক ঝামেলা ঝক্কি ঝামেলায় বকাঝকায় নিজের বল, বুদ্ধি, মন ও মনোযোগকে অপচয় ও অপব্যবহার না করে পজিটিভ চশমা পরো, নেগেটিভ ভাবনা ছাড়, নিয়মতান্ত্রিকতায় ঘাটি গাড়। উদার উন্মুক্ত প্রকৃতির কাছে ফিরে যাও, তার থেকে শক্তি সাহস ও শান্তির প্রেরণা নাও, বৃষ্টির রিম ঝিম শব্দে, শ্রাবণের জোয়ারে নদীর পথ চলায়, পাখির কুজনে, কুহেলী কুয়াশায় ঢাকা শীতের ভোর, শরতের নির্মেঘ আকাশ, কৃষ্ণ চূড়া, বাগান বিলাস আর আজালিয়ার সৌন্দর্যে মুখ লুকাও শ্বাস প্রশ্বাস নাও। শান্ত সকালের মেধাবী প্রহরে সৃজনশীলতায় হও সমর্পিত চিত্ত। পশু, পাখালীর নিত্য দিনের সাংগিতীক জীবনযাত্রায় কান পেতে শোন তাদের সাথে সকলের সাথে একাত্ম হও। এরা সবাই বিধাতার, বিধাতাও এদের সবারই। মনের সব জড়তা, কুপমন্ডুকতা, দীনতা, হীনতা ঝেড়ে মুছে ফেল। নির্ভর করে তোল তাকে। হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, রাগ, ক্ষোভ, ভয়, আশংকা, সংকোচ, শঙ্কা, সংক্ষুব্ধতা সবই কর পরিত্যাগ। নিত্য নতুন উদ্যমে গৌরব প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। Enjoy the life and help to make it long. জীবনের প্রতিটি দিন নতুন নতুন অবয়বে হাজীর হয়। সে কারনে সফলতা ব্যর্থতার খতিয়ান টেনে আনন্দ কিংবা বিষাদে নতুন দিনের আলিঙ্গণকে দায়িত্বহীন করা সমীচিন নয়। ইবাদত উপাসনায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণে এবং কর্মে নিবেদিত নিষ্ঠার মানসিকতা জাগ্রত থাকা উচিত। জীবনে ভুলভ্রান্তি অন্যায় ভালমন্দ থাকবেই। নিত্য এটি যেহেতু প্রশিক্ষণ ও অর্জনের পালা সেহেতু ভালমন্দের মাঝেও অব্যাহত থাকবে প্রয়াস। অজানা আশংকা উদ্বিগ্নে ভোগার কোন দরকার নেই। প্রতিদিনের জীবনকে নতুন অর্থে অর্থবহ করে তোলা দরকার। হিসেবের খতিয়ান মিলবে জীবনের শেষ দিন, এভাবে একদিন সকল সঙ্গীতের সুর থেমে যাবে, কেটে যাবে। উদ্বেগ উত্কণ্ঠারহিত, দুশ্চিন্তাহীন জীবন যাপনে নিষ্ঠা আত্ম প্রত্যয়ী জীবন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থাকবে সর্বদা। সে লক্ষ্যে উদ্বেগ উত্কণ্ঠা আর আশংকা দুর্ভাবনায় আকর্ণ হয়ে নয়, হতে হবে আশাবাদী, বাঁচতে হবে সৃজনশীল হয়ে। প্রচেষ্টা ঠিক ও অব্যাহত থাকলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় হয়েছে কি কোনদিন? তবে? মানুষের জীবনের স্থিতিপত্রের দর্শন শুধু মোদ্দা কথায় বক বক করে বলার বিষয় নয়। এটা উপলব্ধির ব্যাপার। ভাল মন্দ, আনন্দ, সর্বনাশ, উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ঘর কন্যা করে যে জীবন যাপন তার সমাপন স্থিতি কেমন হবে তাই বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত। একে দর্শন হিসেবে শিল্পকলার মাধ্যমে শক্তিশালী করে সব শাখায় ফুটিয়ে তোলা বাঞ্ছনীয় হবে। ছোটখাট কাজে, আলাপ আলাপনে, ব্যবহার বক্তব্যে, উক্তি উপলব্ধিতে, সামাজিক অর্থনৈতিক জীবন যাপনে সর্বত্র তার প্রকাশ চাই। প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চাই সে ভাবনার কায়িক ও অবয়বগত প্রকাশে। আর এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় দর্শন। সময় ও সুযোগের অপব্যয়ের অবকাশ নেই সত্য, আবার একে মনের বোঝা ভেবে রেখে হতাশায় আকির্ণ হওয়ার কারণ দেখিনা। মুক্ত হতে হবে সংকোচ ও বিহ্বলতা থেকে। আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বোধের সজিব সতেজ প্রকাশ প্রযোজন। সকল কাজে আগ্রহ ও সুচিন্তা, সযত্নের ছাপ রাখতে হবে। মনকে বিশ্রাম দিতে হবে সবল চিন্তার দোসর হবার জন্য। বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। নামাজের মধ্যে তার সন্দর্শন সাক্ষাত (মিরাজ) হয়ে থাকে এটা জানি কিন্তু সেটা কি প্রকৃত অর্থে মানি? তাহলে নামাজে অমনোযোগিতা আসে কিভাবে? কেন নামাজে যা পড়ছি তার প্রতি মনোযোগ থাকছেনা। কেন মনে মনে ভাবনায় কামনায় বাসনায় বার বার তার নির্দেশনার বরখেলাপ করি ? সব দেখে শুনে মনে হয় যেন অভিনয় করে চলেছি। হায় দুভাগ্য! কোরআনে আল্লাহ বলছেন, ’তোমরা একই অপকর্ম বার বার কর অথচ তোমরা কেতাব পড়, অর্থাত্ জেনে শুনেও তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কর। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর। [অসমাপ্ত] লেখক :সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান। বর্তমানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চীফ কো অর্ডিনেটর