ভাষা মহান আল্লাহর অসীম দান

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫২
দয়াময় মেহেরবান আল্লাহ, নাজিল করেছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, শিখিয়েছেন কথা বলা (সূরা আর রাহমান)। মানব জীবনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশের জন্য যে ধ্বনি ব্যবহার করে মূলতঃ তা-ই তার ভাষা। আর মানুষ জন্মের পর যে ভাষায় কথা বলতে শিখে সেটাকেই তার মাতৃভাষা বলা হয়। মানুষ সে জন্য সব প্রাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ভাষা তার প্রমাণ বহন করে। সুদূর অতীতে প্রথম মানুষ যখন এ পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে, তখন সে ভাষা জানতো না। অন্য সব প্রাণীর মতো মানুষও বিভিন্ন ধ্বনী বা শব্দ করে নিজের সুখ-দুঃখ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রভৃতি প্রকাশ করতো। কালের প্রভাবে সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে মানুষের ভাষার আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ক্রমে ক্রমে তা উন্নত থেকে উন্নতর হয়। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে সে রকম হয়নি। যেমন, প্রাচীনকালে কাক যেমন ‘কা’ ‘কা’ করে ডাকতো, এখনো সে ঐভাবেই ডাকে; কুকুর যেমন ‘ঘেউ’ ‘ঘেউ’ করে ডাকতো, এখানো সে ঐভাবেই ডাকে। অর্থাত্ সুদূর অতীত থেকে আজ অবধি কোন প্রাণীর ডাক-এর কোন পরিবর্তন হয়নি। একমাত্র মানুষই সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে নিজের মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা তৈরি করে তা বলতে ও লিখতে শিখেছে। ভাষাকে নানাছন্দের ব্যবহার করে গান, কবিতা আরো কত কি করতে সক্ষম হয়েছে। এক কথায় ভাষাই মানুষের সভ্যতার বাহনে পরিণত হয়েছে। তাই ইসলামে মাতৃভাষার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনও মানুষের ভাষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণেই তিনি মানব জাতিকে হেদায়েত করার জন্য যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন প্রত্যেককে তাঁর জাতির ভাষা-ভাষী করে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “ওয়ামা আরসালনা মির রাসূলি ইল্লা বিলিসানি শাউমিহী লাইতাবায়্যিনা লাহুম”, অর্থ- “আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষা-ভাষী করে প্রেরণ করেছি, যেন সে আমার বাণী তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে পারে” (সূরা- ইব্রাহীম, আয়াত-৪)। অধিকন্ত মানুষের বোধগম্য হওয়ার সুবিধার্থেই আল্লাহ্ তায়ালা বিভিন্ন আসমানী কিতাবও রাসূলগণের নিজ নিজ ভাষায় নাজিল করেছেন। যেমন, পবিত্র কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, “ইন্না আনঝালনাহু কুরআনান আরবিয়্যাল লাআল্লাকুম তা’ক্কিলুন”- “আমি কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি, যেন তোমরা সহজে তা বুঝতে পার” (সূরা - ইউসুফ, আয়াত-২)। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বাঙ্গালী জাতির এক গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এই ভাষা পৃথিবীর সব ভাষার মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ ভাষা। বাংলা ভাষায় মনের ভাব যত সুনিপুনভাবে প্রকাশ করা যায় তা অন্য ভাষায় সম্ভব হয় না। যেমন, বাংলা ভাষায়- আমরা বাবা, মামা, ফুপা, খালু প্রভৃতি শব্দ দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির পরিচয় তুলে ধরি, আর ইংরেজী ভাষায় এই সবগুলো একমাত্র ‘Uncle’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। আরো অনেক বিষয়ই রয়েছে উল্লেখ করার মত। যেমন, ইংরেজী শব্দ ‘Put’-এর উচ্চারণ ‘পুট’। এইভাবে ‘But’-এর উচ্চারণ হওয়া উচিত ছিল- ‘বুট’। কিন্তু তা না হয়ে উচ্চারণ করা হয়- ‘বাট’। এমনিভাবে ইংরেজী বা অন্যসব ভাষায় এরকম বহু অসঙ্গতি দেখা যায়। অথচ বাংলা ভাষা এরকম বিভ্রাট থেকে মুক্ত। আমরা, বাঙ্গালীরা আমাদের মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছি, প্রাণ দিয়েছি। আমাদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব সভ্যতাকে অবাক করেছে- সব জাতের সব ভাষার মানুষের শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে। এ কারণেই বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এদিনে সারা পৃথিবীতে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বাঙ্গালী জাতির বীরত্বের কথা- বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের কথা। তাই এ দিনটি আমাদের জন্য পরম গৌরবের।