শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ ডায়রিয়া। বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্ আধুনিক ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী পরিচালিত হলেও এ দেশেই ডায়রিয়া জনিত মৃত্যু হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বেশি। ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী আবিষ্কার খাবার স্যালাইনও আবিষ্কার হয় এদেশের কলেরা রিসার্স প্রতিষ্ঠান মহাখালীস্থ আইসিডিডিআরবিতে। আর এই আইসিডিডিআরবি পরবর্তীতে উদ্ভাবন করে রাইস বেসড খাবার স্যালাইন বা ডায়রিয়া চিকিত্সা ও প্রতিরোধের মুখে খাওয়ার স্যালাইন। আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে হাজার হাজার শিশুদের এই রাইস স্যালাইনের মাধ্যমে সুস্থ করা হলেও সারা দেশে এখনও ডায়রিয়া চিকিত্সায় এই রাইস স্যালাইন জনপ্রিয়তা পায়নি। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে আইসিডিডিআরবিতে ব্যবহূত রাইস স্যালাইন অত্যন্ত কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া বা পারসিস্ট্যান্ট ডায়রিয়ায় গ্লুকোজ স্যালাইনের চেয়ে রাইস স্যালাইন অধিক কার্যকর। এতে শিশুর বার বার পাতলা পায়খানা কম হয় এবং বমি কম হয় এবং শিশু নিউট্রিশন পায়। আর শিশুর ডায়ারিয়া নিয়ে নানা কথা বলেছেন, মহাখালীস্থ কলেরা হাসপাতালের প্রধান চিকিত্সক বিশিষ্ট পেটের পীড়া বিশেষজ্ঞ ডা: প্রদীপ কুমার বর্ধন। ডা: বর্ধন সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত আছেন। ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তিনি খোলাখুলি অভিমত দেন।
ডা: বর্ধনের মতে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও চিকিত্সার ক্ষেত্রে বাবা-মা ও অভিভাবকদের যথেষ্ট দায়িত্ব আছে এবং তারা যদি যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে ডায়রিয়া জনিত মৃত্যু হার আরও হ্রাস করা সম্ভব। তিনি মনে করেন ডায়রিয়া শুরুর সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে মুখে খাবার স্যালাইন দিতে হবে। এক্ষেত্রে রাইস স্যালাইন দেয়া গেলে ভালো। তানা হলে গ্লুকোজ স্যালাইন দিতে হবে। তবে শিশুর বয়স ৬ মাসের কম হয় তাহলে রাইস স্যালাইন দেয়া যাবেনা। সেক্ষেত্রে বাজারে প্রাপ্ত গ্লুকোজ স্যালাইন দিতে হবে। তবে তিনি বলেন, তুলনামূলকভাবে গ্লুকোজ স্যালাইনের চেয়ে রাইস স্যালাইন ভালো। বিশেষ করে পারসিস্ট্যান্ট ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে। তবে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এখনও বাণিজ্যিকভাবে সর্বত্র রাইস স্যালাইন পাওয়া যায়না। তবে তিনি আশা করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাইস স্যালাইন উত্পাদনে এগিয়ে আসবে।
জেনারেল ফার্মা, স্কয়ারসহ কয়েকটি কোম্পানী রাইস স্যালাইন বিক্রয় ও বাজারজাত করে।
ডা:বর্ধনের মতে ডায়রিয়া যদি ২ সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় তবে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া ডায়রিয়ার সময় রক্ত গেলে অবশ্যই এন্টিবায়োটিক দিতে হবে। শিশুর বয়স ৫ বছরের কম হলে ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য জিংক দেয়া ভালো। পাশাপাশি সব ধরণের স্বাভাবিক ডায়েট দিতে হবে।
শিশুর ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে শুধু পানি শূন্যতা রোধ নয়, প্রয়োজন হয় পুষ্টির। এছাড়া খাবার স্যালাইন মিশ্রণে অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ নির্দেশনা মানা হয়না। এক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবির চিকিত্সক ডা: রফিক জানান, খাবার স্যালাইন মিশ্রণের ক্ষেত্রে পানি ও লবণের অনুপাত ঠিক না হলে শিশুর কিডনির সমস্যা, পানি শূন্যতার পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রদাহ হতে পারে। তাই এক প্যাকেট খাবার স্যালাইনের সঙ্গে অবশ্যই আধা লিটার পানি দিতে হবে। এছাড়া গ্লুকোজ স্যালাইনের অসমোলারিটি বেশী থাকায় কম পানিতে খাবার স্যালাইন মিশ্রিত করা ঠিক না।
এদিকে, বাজারে বিভিন্ন ধরণের অননুমোদিত খাবার স্যালাইন, টেস্টি স্যালাইন অবাধে বিক্রয় হচ্ছে। এসব স্যালাইনের রয়েছে নানা ক্ষতিকর দিক। এদের কোন অনুমোদন নেই। একটি কো-অপারেটিভ সমিতির রাইস স্যালাইনেরও কোন অনুমোদন নেই ওষুধ প্রশাসনের।তবে দু’একটি কোম্পানীর রাইস স্যালাইনের অনুমোদন দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন। এদেশে আইসিডিডিআরবির
পর প্রথম রাইস স্যালাইন উদ্ভাবন করে জেনারেল ফার্মা। পরবর্তীতে বাজারে আসে স্কয়ার ও এসকেএফ এর রাইস স্যালাইন। এছাড়া দেশের সর্বাধিক বিক্রয়কারী গ্লুকোজ
স্যালাইন বাজারজাত করছে
সোসাল মার্কেটিং কোম্পানীসহ কয়েকটি কোম্পানী।
তবে মনে রাখতে হবে এক সময় ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্রাক কর্মীরা বাড়ী বাড়ী গিয়ে লবণ-গুডের স্যালাইন বানানোর প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রসংশা অর্জন করে। জীবন রক্ষা পায় লক্ষ লক্ষ শিশুর। পরবর্তীতে গ্লুকোজ স্যালাইন বাজার নিয়ন্ত্রণ করলেও ব্রাকের সেই এক চিমটি লবণ, এক চিমটি গুড় থেকে খাবার স্যালাইন বানানোর কথা আমরা ভুলিনি। কিন্তু রাইস স্যালাইন ডায়রিয়ার নিয়ন্ত্রের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও দেশের হাতে গোনা দু’একটি বড় কোম্পানী ছাড়া কেহ স্যালাইন তৈরীতে এগিয়ে আসেনি। শুধু স্কয়ার, জেনারেল ফার্মার রাইস স্যালাইন নয়, আরও ওষুধ কোম্পানীগুলোর শিশুদের জন্য কার্যকর কম অসমোলারিটি সম্পন্ন রাইস স্যালাইন উত্পাদনে এগিয়ে আসা উচিত। এতে ডায়রিয়া চিকিত্সা ও নিয়ন্ত্রণে আরও অগ্রগতি হবে। জীবন রক্ষা পায় হাজার হাজার শিশুর।
