মু খো মু খি
শহীদুজ্জামান সেলিম। এ দেশের ছোটপর্দার অন্যতম জনপ্রিয় ও গুণী এক অভিনেতা। নিজের অভিনয়গুণে বোদ্ধামহলে সমাদৃত হয়েছেন অনেক আগেই। অনেকের কাছে তিনি অভিনয়ের আদর্শব্যক্তিও। সম্প্রতি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বেশ আলোচিতও হয়েছেন তিনি। নিজের বর্তমান ব্যস্ততা, চলচ্চিত্রসহ মিডিয়ার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সাথে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান
আপনার এখনকার ব্যস্ততা কী নিয়ে?
এখন তো আমাদের সবারই মন খারাপ, শাহবাগের বিষয়টি নিয়ে। কাজটাজের দিকে কোনো মনোযোগ নেই, এই রকম অবস্থাই চলছে। তার ভেতরেও সেলিম আলদীনের একটি নাটক এবার টেলিভিশনে যাচ্ছে। মঞ্চে ওই নাটকের যেই চরিত্রে অভিনয় করেছি টিভিতেও ঠিক সেই চরিত্রেই অভিনয় করছি।
আপনিতো চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ার গড়ছেন, এ বিষয়ে বলুন।
চলচ্চিত্র আমি আগেও করেছি, সেগুলো হয়তো এতটা আলোচনায় আসেনি। ‘চেরাবালি’টা অনেক আলোচিত হয়েছে। অনেক প্রশংসাও কুড়িয়েছে। আর ‘দেবদাস’টা আমি এখনও দেখিনি, এতে আমাকে অভিনয়ের তেমন কোনো জায়গাও দেওয়া হয়নি। কী হয়েছে না হয়েছে তার কিছুই জানি না। তারা আমাকে গুরুত্ব দেয়নি, আমাকে সেইভাবে প্রেজেন্টও করেনি। আসলে এই ছবিতে আমি অভিনয় করে ভুল করেছি। এতে অভিনয় করাটাই উচিত হয়নি।
আপনি এখন যেসব চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন তার সবকটিইতো খল চরিত্র, এ বিষয়ে বলুন।
আমার কাছে সব চরিত্রই এক। সেই চরিত্রটা খলই হোক আর পজেটিভ চরিত্রই হোক। অভিনয়টা ঠিকমতো করতে পারলেই মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করে। আমি আমার কাজটা ঠিকমতো করার চেষ্টা করেছিলাম। ফলে আমি দর্শকদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। চরিত্র নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, আমি শুধু দেখতে চাই সেই চরিত্রে অভিনয় দেখানোর জায়গা কতটুকু।
আপনিতো এক ঘণ্টার নাটক ও ধারাবাহিক নাটকও পরিচালনা করছেন দীর্ঘ দিন। চলচ্চিত্রও কি পরিচালনার সম্ভাবনা আছে?
আমি যদি চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসি তাহলে আমাকে সেখানে একেবারেই নতুন একজন পরিচালক হিসেবে আসতে হবে। তাহলে একজন প্রডিউসারের প্রয়োজন হবে। আর আমি এই বিষয়টি নিয়ে চেষ্টাও করিনি, কারও পক্ষ থেকে সাড়াও পাইনি। যেসব নাটক পরিচালনা করেছি বা করছি তার অধিকাংশই আমার প্রযোজিত। শুধুমাত্র ‘ডিবি’ নাটকটি অন্যের প্রযোজিত, আমি পরিচালনা করছি আর আমার পুরো টিম নিয়ে সেই নাটকটির কাজ করছি।
কিছুদিন আগে এফডিসিতে এক সভায় আলোচনা হয় বাংলাদেশ ও ভারতের নির্মাতা-শিল্পীদের যৌথভাবে কাজ করার। যদি এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তাহলে কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়?
খুবই ভালো হয়। যদি সত্যি সত্যি মনে-প্রাণে এটা করা হয় তাহলে অবশ্যই বেশ ভালো হবে। ভারতীয়রা যদি তাদের ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশকে ব্যবসার অংশীদার বানাতে চায়, বাংলাদেশের ছবিগুলোকে সেইভাবে মূল্যায়ন না করে তাহলে সেটা অসম বাণিজ্য হবে। এতে আমাদের দেশের কোনো লাভ হবে না, আমাদের নির্মাতা-শিল্পীদের কারও কোনো লাভ হবে না। যারা বাংলাদেশ থেকে এই বিষয়টির জন্য দায়িত্ব পালন করছেন তারা যেন অত্যন্ত সতর্কভাবে নিজের দেশের স্বার্থ চিন্তা করে এই চুক্তিতে যায়। স্বাধীনতার ৪১ বছর পার হলেও এখনও আমরা তেমন কিছুই পাইনি, শুধু ধোঁকাবাজি ছাড়া। এখনও আমাদেরকে নিয়মিত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
ওই সভায় আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তা হলো কলকাতার ছবি বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের ছবি কলকাতায় প্রদর্শন নিয়ে। যদি এটি হয় তাহলে কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়?
কলকাতার ছবি বাংলাদেশে চলবে না, একেবারেই চলবে না, কখনোই চলবে না। খামাখা এটা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। আমাদের ছবিও ওই দেশে চলবে বলে মনে হয় না। আর এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হলেও এটা মূল বিষয় না। আমার মনে হয় তাদের ভেতর অন্য কোনো প্ল্যানিং আছে। মনে হয় হিন্দি ছবি এ দেশে মার্কেটিং করার চিন্তাভাবনা নিয়েই তারা এগোচ্ছে। আমাদের দেশে যতগুলো বড় অ্যাজেন্সি আছে সবগুলোই ভারতীয়দের দখলে। কিছু কিছু চ্যানেলও বলা যায় এখন ভারতের দখলে। মাঝে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প, গুণী নির্মাতা, ভালো কাহিনীকার, গুণী অভিনয়শিল্পীর অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এখন নতুনদের হাতে চলচ্চিত্র এসে পড়েছে। নতুনরাই হয়তো এই চলচ্চিত্র শিল্পকে উঠিয়ে নিয়ে আসবে। আর যারা এসব সভায় বসেন তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমাদের দেশের মহিলারা ঘরে বসে বসে পরকীয়ার নাটক দেখছে, শাশুড়ির সঙ্গে কীভাবে ঝগড়া বাঁধতে পারে, কীভাবে সংসারে প্যাঁচ সৃষ্টি করা যায় এগুলো দেখছে শিখছে এই বিষয়তো কেউ কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্তে আসছে না। এত বড় বড় আলোচনা তারা করতে পারে, কই আমাদের দেশে এত ভালো ভালো নাটক হচ্ছে সেগুলোতো ওই দেশে চালানোর বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না। তারা যতই বলুক না কেন, এসব তাদের চাল। ভারতীয়রা সব সময় সেবা পেতে ভালোবাসে, সেবা দিতে চায় না। আর আমাদের মিডিয়াও, কোয়েল মল্লিক কী এমন শিল্পী, তাকে নিয়ে প্রতিদিন নিউজ করতে হবে। আজ কোয়েল মল্লিকের গায়ে হলুদ, আজ বিয়ে, আজ সাত পাকে বাঁধা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। কোয়েল মল্লিককে চেনে ক’জন। সে কি সুচিত্রা, নাকি রেখা, না শ্রীদেবি। একজন অপর্ণা সেনও তো না। তাকে নিয়ে এত লাফালাফির কী মানে হয়। আবার দেখা যায় সিদ্দিকের নিউজ, সোহেল খানের নিউজ, হাবিজাবি। যদি বলে তাদের অভিনয় গুণে, পাবলিকের চাহিদার কথা ভেবে। তাহলে এটিএমকে কী মানুষ পছন্দ করে না, আফজালকে কী মানুষ পছন্দ করেন না, পছন্দ করার মতো শিল্পী আর নেই আমাদের মিডিয়ায়!
আমাদের তো এখন অনেক কমার্শিয়াল ছবি নির্মাণ হচ্ছে, মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু দেখা যায় বছরে হাতেগোনা দুই কি একটা ছবি ব্যবসা সফল না হলেও আলোচনায় আসে। বাকিগুলো আলোচনায় আসতে না পারার কারণ কী বলে মনে হয়?
খুব ভালো একটি প্রসঙ্গ। যেমন রিসেন্ট যেই চলচ্চিত্রটি আলোচিত হয়েছে তা হলো ‘চোরাবালি’। কিন্তু ওই অর্থে ব্যবসা করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। সুষ্ঠু প্রচারণার অভাবে এটা হয়েছে, পরিকল্পনার অভাব, সুষ্ঠু হলের অভাব। সব মিলিয়ে একটি আলোচিত ছবিও কিন্তু ব্যবসা সফল হতে পারেনি। দেখা যায় পুরো ঢাকা শহরে ভালো সিনেমা হল আছে দুই তিনটা। উত্তরা, গুলশান, বনানীতে ভালো কোনো সিনেমা হল নেই। প্রতিটি মার্কেটে প্রতিটি এলাকায় একটি মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হল বাধ্যতামূলক করা উচিত। যেমন কেউ যদি সিনেপ্লেক্সে ছবি দেখতে আসে উত্তরা থেকে, সে যদি সাড়ে ৭টার শো দেখতে আসে তাহলে তাকে রওনা হতে হবে সাড়ে তিনটায়। কেউ যদি গুলশান থেকে আসে তাকে রওয়ানা হতে হবে ৫টায়। ঢাকার যে কোনো প্রান্ত থেকে যদি বলা হয় তাহলে দেখা যায় ঢোকার আগে গড়ে দেড় ঘণ্টা এবং পড়ে দেড় ঘণ্টা সময় অতিরিক্ত তাকে হাতে নিয়ে রওয়ানা হতে হচ্ছে। মানুষের তো সময়েরও মূল্য আছে। এতটা ঝক্কি নিয়ে, আড়াই ঘণ্টা সিনেমা দেখার জন্য অতিরিক্ত ৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করার মানুষ এ দেশে ক’জন। এটা একটা প্রধান কারণ। আর আমাদের কোনো ছবিই তেমন প্রচারণার কাজটি করে না। যদি প্রচারণা ভালো হতো তাহলে ছবিটি আরও ব্যবসা করতে পারত।
ধরুন একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য মুম্বাইকে ঘিরে। কিন্তু মুম্বাইয়ের ওই আউটডোরের শুটিংটি করা হচ্ছে এফডিসিতেই স্বল্প খরচে সেট বানিয়ে। বিষয়টি কেমন বলে আপনার কাছে মনে হয়?
এটা সারা পৃথিবীতেই হয়। অ্যানিমেটেড ফিল্ম হোক আর হলিউডের ওয়েস্টার্ন ছবি যদি দেখা হয় সেখানেও সেট বানিয়ে কাজ করছে। দেখা যায় চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে যেই সেট তারা ভাবছে সেটি বাস্তবে নেই। আবার দেখা যায় অন্য এক দেশে গিয়ে অনেকদিন পুরো ইউনিট নিয়ে থাকতে অনেক বেশি ব্যয়। সেক্ষেত্রে চিত্রনাট্যের অবধারিত কিছু অংশ সেট বানিয়ে কাজ করা হয়। এখানে তারা একেবারে নিখুঁতভাবে প্লটের ইঞ্চি ইঞ্চি ধরে, কম্পিউটারে অ্যানিমেটেড গ্রাফিক্স তৈরি করে অনেক হিসাব-নিকাশ করে এই সেট নির্মাণ করে তারা। এবং শুটিংয়েও অনেক সতর্ক থাকেন। সেই সেট নির্মাণে অনেক খরচও করতে হয়। যদি এ রকম কাজ হয় তাহলে বিষয়টি ঠিক আছে। এখনকার মিডিয়ায় দর্শকদের চোখকে ধোকা দেওয়া এত সহজ না। যেমন ‘দেবদাস’-এর সেট, অত্যন্ত বাজে একটা সেট হয়েছে। কোনোরকম সেট বানিয়েছে তারা, কাঠের উপর রং দিয়ে কেমন জানি অসম্পূর্ণ কাজ। যে কেউ দেখলে বুঝতে পারবে।
সবশেষে একটা কথা বলতে চাই, তা হলো—যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই।
