গতকাল অমর একুশে গ্রন্থমেলার চেহারা ছিল ভিন্ন। বিকালে মেলার দ্বার খুললেও শুরু হয় হঠাত্ বৃষ্টি। তবুও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে মেলায় পাঠক সমাগম ঘটতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বৃষ্টি থাকায় বই কেনা-বেচায় কিছুটা ভাটা পড়ে। বৃষ্টি আর শীতল বাতাসে মেলার চিরচেনা চেহারা কিছুটা অন্যরকম হয়ে যায়। মেলায় আসা পাঠকরা তড়িঘড়ি বই কিনে মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও বাংলা একাডেমীর বই মেলায় লোক সমাগম খুব একটা কম ছিল না। আকস্মিক বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকরা বাংলা একাডেমীর নতুন ও পুরাতন বিল্ডিং এর নিচে আশ্রয় নেন। বৃষ্টির কারণে কাঁদা পানিতে একাকার হয়ে যায় মেলা প্রাঙ্গণ। স্টলগুলোতে জমে যায় পানি। মেলা ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত শ’খানেক স্টলের নাজুক অবস্থা। নিরাপত্তাজনিত কারণে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়নি। পাঠক-ক্রেতা যারা এসেছিলেন তারা সময় কাটিয়েছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করে। এভাবে নির্জীব ছিলো বইমেলার সপ্তদশ দিন। প্রকাশকরা জানান, ‘ত্রিপল থাকার পরও বৃষ্টিতে সব ভিজে গেছে। যদি টিন দেয়া থাকতো তাহলে হয়তো এমন অবস্থা হতো না। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমীর দৃষ্টি আর্কষণ করেন প্রকাশকরা। একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ত্রিপলে কোন ত্রুটি ছিলো না। ত্রুটি ছিলো স্টল নির্মাণে। স্টলের পার্টিশন দিয়ে পানি চুয়ে ভিতরে পড়েছে।’
বইমেলা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন : গতকাল গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বসেছিলেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। কথা ছিল এবারের মেলা বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা হবে। কিন্তু সেখানেও বৃষ্টি বাধ সাধে। এ সময় শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘এবারের মেলা আমরা আমাদের সাধ্যমত সেরা করার চেষ্টা করছি। পুরোপুরি হয়েছে বলবো না। মেলার বাইরের কলুষিত পরিবেশের ব্যাপারে বলেন, ‘সেটাও চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি নানা কারণে।’ সামনের বারের মেলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার যারা স্টল পেয়েছে তাদের মধ্যে অন্তত ২৫টি স্টল নীতিমালা মানছে না, আবার কারও বই নেই। আগামী বছর এদের স্টল দেয়া হবে না।’ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মেলা সদস্য-সচিব শাহিদা খাতুন, একাডেমীর সচিব আলতাফ হোসেন এবং বাংলা একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপ-বিভাগের উপ-পরিচালক মুর্শিদ আনোয়ার।
কবীর চৌধুরী স্মরণে আলোকচিত্র প্রদর্শনী : গতকাল বিকালে একাডেমীর নতুন ভবনের নিচতলায় বাংলা একাডেমীর সাবেক সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক প্রয়াত কবীর চৌধুরীর ছবি নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। কবীর চৌধুরীর ৯১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোকচিত্রশিল্পী এম তাহেরের ক্যামেরায় বিভিন্ন সময়ে ধারণকৃত আলোকচিত্র নিয়ে প্রদর্শনীটি সাজানো হয়েছে। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, কবি বেলাল চৌধুরী, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার প্রমুখ।
নজরুল মঞ্চের চিত্র : গতকাল মেলার নজরুল মঞ্চে ৭টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। এর মধ্যে আরিফুল ইসলামের চারটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল খালেক। বই ৪টি হল ‘কষ্টের নদী পেরিয়ে’, ‘সুখের সমুদ্রের তীরে’, ‘জীবনের গল্প’ ও ‘সাহিত্যেও প্রকৃতির প্রভাব’। এছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ, সুদীপ চক্রবর্তীর ‘নীলিমায় বালি হাস’; শাহবুদ্দিন আহমেদ, আলহাজ্ব আ. রউফ মোল্লা কমান্ডার-এর ‘আমি শহীদের স্বাক্ষর’-এর মোড়ক উন্মোচন করেন।
নতুন বই : ইত্যাদি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে স্বপন ধর সম্পাদিত ‘বিদ্যাব্রতী যতীন সরকার’, নান্দনিক প্রকাশনী এনেছে ছড়াকারদের নিয়ে ফজল এ খোদা’র লেখা বই ‘ছড়া কলাকার’। অবসর প্রকাশনী থেকে এসেছে ডক্টর হাসনা বেগম এর লেখা ‘ম্যুওরের নীতিতত্ত্ব’ বইটির অনুবাদ করেছেন ডক্টর কালী প্রসন্ন দাস, ঐতিহ্য থেকে এসেছে শেখ লুত্ফর এর ‘ভাতবউ’, সমাচার প্রকাশনী থেকে এসেছে নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী’র রোমান্টিক কাহিনীভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘ ও মেঘশ্রী’। বাংলা একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল রবিবার মেলায় ৫৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে গল্প ৭টি, উপন্যাস ১২টি, প্রবন্ধ ৪টি, কবিতা ১৯টি, গবেষণা ১টি, ছড়া ২টি, শিশুতোষ ২টি, জীবনী ১টি, মুক্তিযুদ্ধ ১, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ১টি, রাজনীতি ২টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ৪টি নতুন বই।
আজকের আয়োজন : আজ সোমবার মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রফিকউল্ল¬াহ খান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, খোন্দকার আশরাফ হোসেন এবং বিশ্বজিত্ ঘোষ।
