হিন্দি সিনেমায় প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্স থাকবে না—এটা সহজে মেনে নিতে পারবে না অনেকেই। বলিউডি সিনেমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে নায়ক-নায়িকার প্রেমকে বিচিত্রভাবে ব্যবহার করে আসছেন নির্মাতারা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের হিন্দি সিনেমায় নায়ক-নায়িকার প্রেমকে যেভাবে দেখানো হতো এখনকার বলিউডি সিনেমায় সেই সময়ের মতো দেখানো হয় না। নর-নারীর সম্পর্কে ভিন্নমাত্রা এসেছে সমকালীন হিন্দি ছবিতে। এ ক্ষেত্রে আগের সনাতন মূল্যবোধ ঝেড়ে অনেকটা সাহসী ভঙ্গিতে নর-নারীর সম্পর্ক, প্রেম-ভালোবাসার বিষয়গুলো পর্দায় তুলে ধরা হচ্ছে। অতীতে হিন্দি সিনেমার নায়ক-নায়িকারা যে ধরনের রক্ষণশীলতার অনুসারী ছিলেন আজকাল তাদের মধ্যে রক্ষণশীলতার বদলে সংস্কারমুক্ত উদার সাহসী মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে পর্দায় প্রেমের বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলার ব্যাপারে। সমকালীন বলিউডি সিনেমায় নর-নারীর সেই সাহসী প্রেমের কথা নিয়ে লিখেছেন রেজাউল করিম খোকন
‘মার্ডার থ্রি’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে এবারের ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে। এ ছবির পোস্টারে ট্যাগলাইনে লেখা রয়েছে ‘এবারের ভ্যালেন্টাইনে ভালোবাসা খুন হবে’ কথাগুলো। রোমান্টিকতার বদলে ভালোবাসার মৃত্যুর ইঙ্গিত রয়েছে কথাগুলোতে। ‘মার্ডার’ সিক্যুয়েলের তৃতীয় ছবিটির গল্পে রয়েছে ভালোবাসার দুর্নিবার আকর্ষণ। কিন্তু এর বিপরীতে ঘৃণা, হিংসা, ঈর্ষা, জিঘাংসার ভয়াবহরূপও তুলে ধরা হয়েছে। সিক্যুয়েলের আগের দুই ছবিতে প্রেমের সহিংস রূপটাকে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রেম মানে নায়ক-নায়িকার নিষ্কাম রোমান্স নয়, এখানে প্রেম মানে শারীরিকও। তিনটি ছবিতেই পাত্র-পাত্রীদেরকে এ ব্যাপারে অনেকটা দুঃসাহসী মনে হয়েছে। হিন্দি সিনেমার প্রেমিক-প্রেমিকা চরিত্রগুলো আগের মতো নেই, ‘মার্ডার’ সিক্যুয়েলের ছবিগুলো দেখলেই এটা বেশ উপলব্ধি করা যায়। এখন বলিউডের সিনেমায় রোমান্সের ধারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো নায়ক-নায়িকার নিষ্পাপ ভালোবাসার গল্প নিয়ে আজকাল তেমন ছবি হচ্ছে না বলিউডে। এ প্রসঙ্গে ‘জিসম টু’, ‘জান্নাত টু’, ‘রাজ থ্রি’, ‘ককটেল’, ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’, ‘বরফি’ প্রভৃতির কথা বলা যায়। এ ছবিগুলোতে নায়ক-নায়িকার পর্দাপ্রেম, রোমান্টিক সম্পর্ক, আচরণ ইত্যাদিতে অনেক পরিবর্তন লক্ষ করেছেন দর্শক। সম্পর্কের বিচিত্র টানাপোড়েনের সাথে সাথে শরীরী বিষয়গুলো আজকাল অনেকটা সরাসরি পর্দায় উঠে আসছে। অতীতে যা হিন্দি সিনেমায় কোনোভাবেই ভাবা যায়নি। গত বছরের একটি অন্যতম আলোচিত ব্যবসা সফল ছবি ‘ইশকজাদে’র কথা বলা যায় এখানে। এ ছবিতে নায়ক-নায়িকার তেমন কিছু সাহসী দৃশ্য রয়েছে, যা দেখতে বসে দর্শক স্বাভাবিকভাবেই চমকে উঠেছেন মনে মনে হোঁচটও খেয়েছেন। এর আগে ‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ ছবিতে নায়ক রণবির সিং এবং আনুশকা শর্মার কিছু সাহসী দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছিল। সাধারণ একটি রোমান্টিক ছবি দেখতে বসে হঠাত্ নায়ক-নায়িকার এ ধরনের প্রণয় দৃশ্য দেখে অনেক দর্শকই বিব্রত হয়েছেন। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বলিউডের ছবিতে প্রেমের বিভিন্নরূপ দর্শকদের বারবার আলোড়িত করেছে। বিভিন্ন নির্মাতা তাদের ছবিতে গতানুগতিক ধারার বাইরে ভিন্নভাবে প্রেমকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। পঞ্চাশের দশকে রাজকাপুর, কে আসিফ, কামাল আমরোহী; ষাটের দশকে গুরু দত্ত, বিমল রায়; সত্তরের দশকে ঋষিকেশ মুখার্জ্জি, শক্তি সামন্ত; আশির দশকে সুভাষ ঘাই, যশ চোপড়া; নব্বইয়ের দশকে মনসুর খান, সুরুজ বরজাতিয়া এবং নতুন শতাব্দীতে করন জোহর, আদিত্য চোপড়া, রাকেশ রোশন প্রমুখ ছবি নির্মাণে সাফল্যের চমক দেখিয়েছেন। নায়ক-নায়িকার ইনোসেন্ট লাভকে একসময় হিন্দি সিনেমায় যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এখনকার হিন্দি সিনেমাগুলোতে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম ঠিক সে ভাবে আসছে না। নায়ক-নায়িকার সহজ সরল প্রেমের বদলে এখন পরকীয়ায় ব্যাপারগুলোকে কেন্দ্র করে হিন্দি সিনেমার গল্পে নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বক্স অফিসে বেশ সাড়া জাগিয়েছে ‘রেস টু’ ছবিটি। এ ছবিটি মূলত অ্যাকশনপ্রধান হলেও এখানে নর-নারীর মধ্যকার সম্পর্কের জটিল সমীকরণ দর্শকদের অবাক করেছে। সবাই অবাক হয়ে দেখেছেন পাত্র-পাত্রীদের আচরণ। এখানে আসলে কে কার সঙ্গে প্রেম করছেন তা দর্শক খুব সহজে চট করে ধরতে পারেননি। অনেকটা চাপা উত্তেজনায় অপেক্ষা করেছেন চরিত্রগুলোর সম্পর্কের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াচ্ছে তা দেখতে। এর আগে ‘রেস’ ছবিতেও পাত্র-পাত্রীদের রোমান্সের চেয়ে তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে গল্পে সাসপেন্স সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবারে ‘রেস টু’ ছবিতে সেটা আরও অনেক বেশি নাটকীয়তাপূর্ণ মনে হয়েছে দর্শকদের কাছে। সাধারণত গতানুগতিক হিন্দি সিনেমায় পুরুষ ও নারী চরিত্রের সম্পর্কের সমীকরণ খুব সহজ সরলভাবে দেখালেও এখন ‘রেস টু’-র মতো ছবিতে সেটা জটিল এবং সাহসী হয়ে উঠেছে। যা এতদিন দর্শক হলিউডের সিনেমায় দেখে এসেছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মুক্তি পাবে ‘আই মি আউর ম্যায়’ ছবিটি। এ ছবির গল্পে জন আব্রাহামকে কেন্দ্র করে দুই নারী চিত্রাঙ্গদা সিং ও প্রাচী দেশাইয়ের সম্পর্কের বিচিত্র টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে। বলিউডের সিনেমায় নর-নারীর প্রেমকে আজকের সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অতীতের সংস্কার, মূল্যবোধ, নীতিবোধ ইত্যাদিকে ঝেড়ে ফেলে নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছেন নির্মাতারা। মুক্তি প্রতীক্ষিত ‘আই মি আউর ম্যায়’ ছবিটি তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ। এ ধরনের পর্দা প্রেম দর্শকদের চমকে দিচ্ছে প্রায়ই। যার মধ্যে নতুন স্বাদ লাভ করছেন তারা। এ কারণে এ ধরনের ব্যতিক্রমধর্মী বলিউডি প্রেমের ছবিগুলো বক্স অফিসেও বেশ সাড়া তুলছে। প্রেমে-অপ্রেমে আজকাল হিন্দি সিনেমার স্বরূপ বদলে যাচ্ছে। দর্শক মনে নতুন উপলব্ধির জন্ম দিচ্ছে ইদানীংকার বলিউডি সিনেমার সাহসী প্রেম। আর তেমন প্রেমের বিষয়গুলো পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনেকটাই দুঃসাহসী ও উদার মনের পরিচয় দিচ্ছেন আজকের জনপ্রিয় তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী।
