প্রস্তাবিত বন আইনে উপেক্ষিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩০
প্রস্তাবিত জাতীয় বন আইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার ব্যাপারে কোন কিছু বলা হয়নি। আর এ নিয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির নিকট অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। অভিযোগে বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকার আমলে নেয়া এবং আন্তরাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপন্থি যেসব ধারা রয়েছে তা বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। সংসদীয় উপ-কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানা ইত্তেফাককে বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনে যাই থাকুক না কেন, বন আইনকে যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। এক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ১৯২৭ সালের বন আইনকে সংশোধন করে ‘ফরেস্ট (অ্যামেন্ডমেন্ট) এ্যাক্ট-২০১২’ নামে একটি বিল উত্থাপন করা হয়। বিলটি নিয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও কাজ শুরু করেছে। আইনটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ যুগোপযোগী করতে কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানাকে আহ্বায়ক করে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে উপ-কমিটির নিকট প্রস্তাবিত আইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আপত্তি এবং পরামর্শ জমা পড়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে ফরেস্ট পলিসি অ্যাডভোকেসি ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন, আদিবাসী ফোরাম ও বনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট মহলের সাথে বৈঠক করেছে। পুরানো আইন সংস্কারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি প্রস্তাবিত আইনে কোন গুরুত্ব পায়নি। শুধুমাত্র আইনের উদ্দেশ্যে ‘ভূ-মন্ডলের তাপ বৃদ্ধি মরুকরণ’ এই শব্দগুলো যুক্ত করা হয়েছে। অথচ জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় বনখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রস্তাবিত আইনের ৬ নম্বর ধারায় সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রক্রিয়ায় অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এতে মানুষের ভূমির অধিকার বিলুপ্তি ঘোষণার প্রক্রিয়ায় আপত্তি দাখিলের সুযোগ বন্ধ হবে। ফলে আদিবাসী, বনবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠি তাদের প্রথাগত ও প্রচলিত ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। একই সঙ্গে তারা তাদের জুম চাষ, আবাস ভূমি, গ্রাম বন এবং শ্মশান ও পবিত্র ভূমি হারাবে। একই ভাবে প্রস্তাবিত আইনের ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী রক্ষিত বনে বিশেষ বৃক্ষের শ্রেণী সংরক্ষণের বিধান কার্যকর হলে উল্লেখিত জনগোষ্ঠি তাদের প্রথাগত অধিকার হারাবে। পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে এসকল প্রথাগত অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন সংসদীয় কমিটির নিকট লিখিতভাবে বলেছে, বন আইন সম্পর্কিত বিল উত্থাপনকালে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়নি। খসড়া আইনে আদিবাসী, বনবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠির অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইনের ৩(গ), ১২ ও ১৩ ধারায় ‘আদার ফরেস্ট’ নামে নতুন বন ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এতে ঘোষিত বনাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠির ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কমিটির নিকট দেয়া তাদের প্রস্তাবে এই আইন বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করার কথা বলা হয়েছে। তারা আরও বলেছে, খসড়া আইন সংবিধানের ১৮(ক), ২৩(ক), ২৭ ও ২৮ ছাড়াও বেশ কয়েকটি অনুচ্ছেদ, পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একাধিক আইন, জীব বৈচিত্র্য চুক্তি ও আইএলও কনভেনশনসহ একাধিক রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপন্থি। এ বিষয়ে উপ-কমিটির আহ্বায়ক সোহরাব আলী সানা ইত্তেফাককে বলেন, ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত আইনের উপর একাধিক সংশোধনীর প্রস্তাবসহ পরামর্শ পাওয়া গেছে। কমিটি তা বিবেচনায় নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের উপর পার্বত্য ও মধুপুর বন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে জনগণের মতামত গ্রহণ করার হবে। সকল মতামত একত্রিত করে সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে। সংশোধিত আইন বননির্ভর জনগোষ্ঠির স্বার্থ রক্ষা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। উপ-কমিটির নিকট লিখিত প্রস্তাবনায় ফরেস্ট পলিসি অ্যাডভোকেসি ফোরাম বন আইনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছে। ফোরামের কো-অর্ডিনেটর এস আনোয়ার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় বনখাত অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। বন বিভাগের সকল উন্নয়ন কাজে জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটি গুরুত্ব দেয়ার বিধান রাখতে হবে। বন রক্ষার পাশাপাশি বাস্তব সম্মতভাবে নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আইনে উপকূলীয় এলাকায় গ্রিন বেল্ট তৈরিসহ চর এলাকা ও পার্বত্য অঞ্চলে সরকারি ভূমিতে বনায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নকালে বনসংলগ্ন প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে স্থানীয়দের সাথে ফোকাস গ্রুপ আলোচনার বিধান যুক্ত করতে হবে। এছাড়া বননির্ভর জনগোষ্ঠির ঐতিহ্যগত অধিকার রক্ষার বিষয়টি আইনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।