আমাদের প্রিয় নবী (স.) দৈনিন্দিন জীবনে কিছু দো’য়া পাঠ করতেন। যদি কোরআন ও হাদীসের আমলকারী আল্লাহর কোন বান্দা সে সমস্ত দো’য়া পাঠ করেন তাহলে তিনিও আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ লাভে ধন্য হতে পারবেন। নিম্নে রসূল (স.)-এর তেমন কিছু দো’য়া সন্নিবেশিত হলো: ঘুমানোর পূর্বের দো’য়া: “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহিহয়া”। অর্থ :হে আল্লাহ! তোমারই নামে মৃত্যুবরণ করি এবং তোমারই নামে জীনব ধারণ করি। ঘুম হতে জেগে পড়তে হয়: “আলহাম-দুলিল্লা হিল্লাজি আহিয়আনা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর । অর্থ: সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদেরকে মৃত্যুর পর জীবিত করলেন এবং তাঁরই কাছে ফিরে যেতে হবে। অযুর শেষের দোয়া: আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু। আল্লাহুম্মাজ্ আলনী মিনাত তাওয়াবীন, ওয়াজ আলনী মিনাল মুতাত্বাহিহরীন। অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি (অথবা. এই মর্মে ঘোষণা করছি) যে, আল্লাহ ব্যতিত অন্য কোন প্রভূ (উপাস্য) নেই তিনি এক তার কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসুল। হে প্রভু! যারা তওবা করে (অনুতাপ করে বা পাপ থেকে প্রত্যাবর্তন করে) আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর; এবং যারা নিজেদের (পাপ এবং শিরক্ থেকে) পবিত্র, আমাকে তাদের মধ্যে শামিল কর। ঘর থেকে বের হবার দোয়া: বিসমিল্লাহী তাওক্কালতু আলাল্লাহি লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ। অর্থ: আল্লাহর নামে রওয়ানা করছি, আল্লাহর উপর ভরসা করছি। আল্লাহ ছাড়া (আমাদের) কোন সামর্থ ও শক্তি নেই। বাড়ীতে প্রবেশের দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নী আস্আলুকা খাইরাল মাউলাজে অখাইরাল মাখরাজে বিসিমল্লাজি অলাজনা অবিসিমল্লাহি খরাজনা অআলাল্লাহি রাব্বানা তাওয়াক্কলনা। অর্থ: হে আল্লাহ! আমার (বাড়িতে) প্রবেশ ও বের হওয়া যেনো কল্যাণকর হয়। আমরা আল্লাহর নামে (বাড়ীতে) প্রবেশ করলাম ও বের হলাম এবং আমাদের প্রভু আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। যানবাহনে চড়ার দোয়া: সুবাহানাল্লাযি সাখখারা লানা হাযা ওয়ামা কুন্না লাহু মুকরিনীনা ওয়াইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন। অর্থ: পবিত্রতা ঘোষণা করছি সেই সত্ত্বার, যিনি এইসব কিছুকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছেন। অন্যথায় আমরা এসব আয়ত্বে আনতে পারতাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা সকলে মহান প্রভূর দিকে প্রত্যার্বনকারী। যানবাহন থেকে নামার দোয়া: রাব্বি আনযিলনী মুনযালাম মুবারাকাও অআনতা খাইরুম মুনযিলীন। অর্থ: প্রভূ আমার! তুমি আমাকে বরকতের স্থানে অবতীর্ণ কর। তুমিই উত্তম অবতীর্ণকারী। আনন্দের সময় দোয়া: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি বিইজ্জাতিহি ওয়া জালালিহি তাতেম্মুলিহাত। অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যার একমাত্র বিক্রম ও প্রতিপত্তিতে সকল ভালো কাজ সম্পন্ন হয়। শোক বা দুঃখের সময় দোয়া: ইয়া হাইউ ইয়া কাইউমু বিরাহমাতিকা-সতাগিছ। অর্থ: হে চিরঞ্জীব! হে চিরস্থায়ী! আমি তোমার রহমতের প্রত্যাশী। ভয়ের সময় দোয়া: হাছবিইয়াল্লাহু ওয়ানি’মাল ওয়াকিল ওয়ানি’মাল মাওলা ওয়ানী’মান নাছির। অর্থ: আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনি উত্তমভাবে কার্যসম্পাদনকারী। আর তিনিই উত্তম অভিভাবক ও উত্তম সাহায্যকারী। পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দোয়া: রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বাইয়ানী সাগিরা। অর্থ: হে আমার রব। আমার পিতা-মাতার ওপর তেমনি রহম কর যেমন তারা শিশু বেলায় আমাকে লালন পালন করেছেন। মৃত্যু যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার দোয়া: আল্লাহুম্মা আয়ি’ন্নী আল-গামারা-তিল মাউতি ওয়াসাকারাতিল মাউতি। অর্থ: হে আমার আল্লাহ! মৃত্যুর কাঠিন্য ও তার মারাত্মক কষ্টের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর। কবর জিয়ারতের দোয়া: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবূরি মিনাল মুসলিমীনা ওয়াল মুসলিমাতি আনতুম লানা সালাফা ওয়া নাহনু লাকুম তিবয়ুন। অর্থ: হে কবরবাসী পুরুষ ও মহিলাগণ। তোমাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমরা আমাদের অগ্রবর্তী এবং আমরা তোমাদের অনুসরণকারী। প্রসাব-পায়খানায় প্রবেশের দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নী আয়ুযুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবা-ইস। অর্থ: হে আল্লাহ! স্ত্রী পুরুষ জ্বিনের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। প্রস্রাব-পায়খানা থেকে বের হওয়ার দোয়া: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আযহাবা আন্নীল আযা ওয়াআ-ফানী। অর্থ: সেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, যিনি আমার কাছ থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূর করে দিলেন এবং প্রশান্তি দান করেছেন (ইবনে মাজা)। দুশ্চিন্তা হতে বাঁচার দোয়া: আল্লাহুম্মা ইন্নী আয়ুযুবিকা মিনাল হাম্মি অল হুযনি অল আজযি ওয়াল কাসলি ওয়াল জুবনি ওয়াল বুখলি ওয়াযালায়িদ দাইনি ওয়াগালাবাতির রিজাল। অর্থ:হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি ভাবনা, দুশ্চিন্তা, অক্ষমতা, অলসতা, ভীরুতা, কৃপণতা, ঋণের বোঝা এবং লোকদের প্রতিপত্তি হতে (বুখারী)। ঋণ থেকে মুক্তি এবং হালাল উপার্জনের দোয়া: আল্লাহুম্মাক ফিনী বিহালালিকা অ-হারা-মিকা, ওয়াআগনানা-ফিকাযলিকা আস্মান সিওয়াক। অর্থ: হে আল্লাহ! হারাম ছাড়া হালালকেই আমার জন্য যথেষ্ট করে দাও এবং তোমার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে সব কিছু থেকে অভাবমুক্ত করে দাও (তিরমিযী)। স্মরণশক্তি বৃদ্ধির দোয়া: রাব্বি যিদনী ইলমা। রাব্বিশ রাহলী ছাদরী ওয়াইয়াসিসরলি আমরী ওয়াহলুল উক্বদাতাম মিল্লিসানী ইয়াফ ক্বাহুকাওলী। অর্থ: হে আমার রব, আমার ইলম বাড়িয়ে দাও। হে আমার রব্ব! আমার বক্ষ (হূদয়) খুলে
দাও। আমার কাজকে সহজ করে দাও। আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দাও। যাতে ওরা (লোকে) আমার কথা বোঝে। জ্বর হলে পড়তে হয়: হযরত আয়শা (রা.) বলেন, “আমাদের মধ্যে যখন কোন ব্যক্তি রুগি হতো তখন রসূল (স.) তাঁর ডান হাত দিয়ে রুগিকে বুলাতেন। তারপর পড়তেন, “আযহিবিল বাস রাব্বান নাস অশফি আন্তাশ শাফী লা শিফা-আ ইল্লা শিফাউকা শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা” অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর কর এবং আরোগ্য দান কর। তুমিই আরোগ্য দানকারী। তোমার আরোগ্য দান ছাড়া আর কোন আরোগ্য নেই। তা এমনই আরোগ্য, যা কোন রোগকেই ছাড়ে না (বুখারী- মুসিলম, মেশকাত)। ফোড়া ফুস্কুড়ি বা ঘা-এর দোয়া: “বিসমিল্লাহি তুরবাতু আরযিনা বিরিকাতি বা’দিনা লিউশফা সাকিমুনা বিইজনি রাব্বিনা”,। অর্থ: আল্লাহর নামের বরকতে আমাদের মাটি আমাদের কারো থুথুর সাথে মেশানোর ফলে আমাদের রুগি আল্লাহর নির্দেশে আরোগ্য লাভ করুক (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত)। দাঁত ও কান ব্যথার দোয়া: হযরত আলী (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি হাঁচি শোনার সময় বল্লে আল হামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আলা কুল্লি হালিন মাকান”, অর্থ: সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জগতের প্রভুর জন্য সকল অবস্থায়। এই কথা বললে সে দাঁতের ও কানের ব্যথা কখনোই পাবে না (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা-১০ খণ্ড ৪২২ পৃ.)। চোখের রোগ দূর করার দোয়া: হযরত আনাস ইবনু মালেক (রা.) বলেন, নবী (স.)-এর কোন সাহাবী চোখের রোগে আক্রান্ত হলে এই দোয়া পড়তেন, “আল্লাহুম্মা মাত্তিনী বি-বাসারী অজ আলহুল ওয়ারিসা মিন্নী ওয়া আরিনী ফিল আদুওয়ি সা-রী অনসুরনী আলামান যালামানী” অর্থ: হে আল্লাহ! আমার চোখ দ্বারা আমাকে উপকৃত করাও এবং ওকে আমার উত্তরাধিকারী বানাও। আর শত্রুর মধ্যে আমার মোকাবিলা দেখাও এবং আমার ওপরে যে অত্যাচার করে তার বিরুদ্ধে আমাকে সহযোগিতা দাও (ইবনে সুন্নির আমালুল ইয়াওমি অল লাইলাহ্ ১৫০ পৃ:, হাকেম ৪র্থ খণ্ড ৪১৩ পৃ:)। রাগ দূর করার দোয়া: সুলাইমান ইবনু সুরাদ (রা.) বলেন, একবার রসূল (স.)-এর সামনে দু’জন লোক গালিগালাজ করে। তাদের মধ্যে একজন রেগে মুখ লাল করে অন্যজনকে গাল দিচ্ছিল। তখন রসূল (স.) বলেন, আমি এমন একটি বাক্য অবশ্যই জানি যা ঐ ব্যক্তি যদি বলে তাহলে ওর রাগ দূর হয়ে যাবে। তা হলো: “আউযু বিল্লাহিমিনাশ শায়তনির রজিম” অর্থ: বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত)। নিরানব্বইটি রোগের ঔষধ: রসূল (স.) বলেন, “লা হাওলা অলাকুউয়াতা ইল্লাবিল্লাহ” নিরানব্বইটি রোগের ঔষধ। তন্মোধ্যে সহজতম রোগ দুশ্চিন্তা (রায়হাকী, মেশকাত)। জান্নাত ও জাহান্নামের দো’য়া: নবী (স.) এর এক সাহাবী মুসিলম তামীমীকে বলেন, যখন তুমি মাগরিব ও ফজরের নামাজের সালাম ফিরানোর পর বলবে, আল্লাহুম্মা আজিরনী মিনান নার ও আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা জান্নাতাল ফেরদাউস” অতঃপর ঐদিনও রাতে তুমি মরে যাও তাহলে তোমার জন্য জাহান্নাম হতে মুক্তির সনদ লিখে দেয়া হবে (আবু দাউদ, মেশকাত)। মুসলমান হয়ে মরার দোয়া:“ফা তিরাস সামাওয়াতি অল আরদি, আন্তাঅলিয়্যি ফিদদুন আ অল আখিরাহ তাআফফানী মোসলেমাও অআল হিকনী বিসসলেহীন” অর্থ: হে আসমান জমিনের স্রষ্টা। তুমি ইহকালে এবং পরকালেও আমার অভিভাবক অতএব আমাকে মুসলমান করে মৃত্যু দিও এবং সত্ লোকদের মধ্যে শামিল করিও (সূরা ইউসুফ-১০১)। উপরোক্ত দো’য়াগুলির ফজিলত কেবলমাত্র তারাই পাবেন যারা আল্লাহর হুকুম ও রসূল (স.) এর আদর্শমত জীবন যাপন করবেন।
