আরবি ‘ইলাহ’ শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট বোধক হরফ আলিফ ও লাম অক্ষর দুইটি যোগ হয়ে ‘আল্লাহ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। পৃথিবীর সকল ধর্ম সাহিত্যের পরিভাষায় ‘আল্লাহ’ শব্দটি অনুপম। কারণ, তা অন্য কোন শব্দ হতে গঠিত হয়নি। এর বচন বা লিঙ্গভেদ নেই। এর একমাত্র অর্থ মা‘বুদ বা উপাস্য। তা অন্য কোন অর্থেও ব্যবহূত হয় না। আল্লাহ ইসমে আজম বা সর্বোচ্চ উপাস্য বোধক সর্বশ্রেষ্ট নাম। এ নাম মানব হূদয়ের যত গভীর তলদেশ হতে যত সহজে সমস্ত অনুভূতি ছাপিয়ে উত্থিত হয়, এমন আর কোন শব্দ দ্বারা হয় না। সুতরাং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের প্রভূ বা উপাস্য অর্থে ‘আল্লাহ’শব্দটি ব্যবহূত হওয়াই উচিত ছিল। আল্লাহ যে এক,অদ্বিতীয় তা শুধু সংখ্যার হিসেবে নয়, তিনি লা-শরীক, এ হিসেবেও এক। তাঁর স্বরূপ সকল কল্পনামুক্ত। কেউ তাঁর সমসাময়ীক বা সম-মর্যাদাভুক্ত নয়, এ অর্থেও তিনি এক। তাঁর একত্ববাদের পরিচয় তিনি সূরা ইখলাসে দিয়েছেন। যেমন,বলেছেন- “হে নবী, আপনি বলুন, আল্লাহ এক। আল্লাহ অভাবমুক্ত। তিনি কাউকেও জন্মদান করেন নি। তাঁকেও কেউ জন্মদান করে নি। কেউই তাঁর সমকক্ষ নয়”। সূরাটি অবর্তীর্ণের কারণ হিসেবে তাফসিরে কুরতুবীতে উল্লেখ করা হয়েছে, মক্কার মুশরিকরা হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর কাছে আল্লাহর গুণাবলী ও বংশ পরিচয় জিজ্ঞাসিত হয়েছিল। আল্লাহ পাক এ সূরা অবতীর্ণ করে এর জবাবদান করেন। কুরতুবীতে মতান্তরে তাও বলা হয়েছে, মদিনার ইহুদিরা এ প্রশ্ন করেছিল। যে কারণে তফসিরবিদদের কারো কারো মতে সূরাটি মদিনায় নাজিল হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় আল্লাহ সৃষ্টির উপকরণ- সোনা-রূপা নাকি অন্য কিছু এ বিষয়ে মক্কার কাফিররা হজরত রাসুলে পাক (স.) কে প্রশ্ন করেছিল। এর কারণ হিসেবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়। সূরা ইখলাসের প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘বলুন’ কথাটির মধ্যে প্রিয় নবীজি (স.)-এর রিসালাত ও নবুয়্যতের প্রতি ইঙ্গিত বুঝান হয়েছে। তাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষকে পথ প্রদর্শনের নির্দেশ করা হয়েছে। আল্লাহ শব্দটি এমন এক সত্তার নাম যিনি চিরকাল থেকে রয়েছেন এবং চিরকালই থাকবেন। তিনি সর্বগুণের অধিকারী এবং সর্বদোষমুক্ত ও পবিত্র। ‘আহাদ’ এবং ‘ওয়াহিদ’ উভয়ের অর্থ এক ও অভিন্ন। ইখলাসের এ সংক্ষিপ্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কিত সকল আলোচনা রয়েছে। আর ‘সামাদ’শব্দের অর্থ সম্পর্কে বহু কথা রয়েছে এবং কথাগুলো নির্ভুল। এতে আমাদের প্রতিপালকের গুণাবলীই আলোচিত হয়েছে। সার কথা হলো, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী, তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। পরের তৃতীয় আয়াতের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সন্তান প্রজনন করা মাখলুকের বৈশিষ্ট্য-সৃষ্টিকর্তার গুণ নয়। সুতরাং তিনি কারও সন্তান নন এবং তাঁরও কোন সন্তান নেই। আল্লাহ পাকের স্ত্রী ও সন্তানাদি থাকা অসম্ভব। সর্বশেষ আয়াতের ব্যাখ্যায় রয়েছে, কেউ তাঁর সমতুল্য নয় এবং আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সঙ্গে সঙ্গতি রাখে না। মহিমাময় আল্লাহ পাকের কোন বিশেষ আকৃতি, রূপ বা সুরত নেই। কারণ, আকৃতি বিশিষ্ট প্রত্যেক জিনিস বা বস্তুরই একজন নির্মাতা থাকে। আকৃতির পরিকল্পনা তিনিই করে থাকেন। সুতরাং যার বা যে বস্তুর কোন রূপদানকারী ও নির্মাতা থাকে তা নবসৃষ্ট। অতএব, অনাদি, অনন্তময় আল্লাহ পাকের সঙ্গে নবসৃষ্ট-গুণ মিলিত হওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ পাক একটি সত্তা,কিন্তু তিনি অন্য কোন সত্তার মত নন। তিনি রং, গন্ধ, স্বাদ, উত্তাপ এবং শৈত্যপ্রবাহ এসব সকল পরিবর্তনশীল গুণাবলী হতে চির-পবিত্র। মানবীয় গুণাবলীর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা এসবের কোনটিই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। তাঁর অস্তিত্ব হচ্ছে, নিরাকার, রূপহীন, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-গভীরতাহীন, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, লা-শরীক, তুলনাবিহীন, অন্যের সাহায্যের প্রতি নির্ভরহীন,অনাদি, অনন্ত, অব্যয, অক্ষয়, অজয়, অমর, অতন্দ্র, অনিদ্র। তাঁর কুদরতি হাত থাকলেও সে হাতের স্বরূপ বর্ণনা করা কারো পক্ষে দুঃসাধ্য ব্যাপার। হাত থাকলেও সে হাতের রহস্য বুঝা কারো পক্ষে সম্বব নয়। তাঁর এসব গুণই শাশ্বত। দুনিযাতে আল্লাহর একেশ্বর বা একত্ববাদের উপর অস্বীকারকারী মুশরিকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার বিদ্যমান রযেছে। সূরা ইখলাসে এসব রকমারি মুশরিকদের ভ্রান্ত ধারণা খন্ডন করে পূর্ণ একত্ববাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। আল্লাহর তওহীদ বা একেত্ববাদের ওপর বিরোধীতাকারী একদল খোদ আল্লাহর অস্তিত্বই স্বীকার করে না এবং কেউ অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তাকে চিরস্থায়ী ও চিরন্তন মানেনা। আর কেউ কেউ এ উভয় বিষয় মানলেও তাঁর পূর্ণ গুণাবলী অস্বীকার করে। কেউ কেউ সবই মানে কিন্তু ইবাদত-বন্দেগিতে অন্যকে শরীক সাব্যস্ত করে। কিছু সংখ্যক লোক ইবাদতেও শরীক করে না, কিন্তু অন্যকে অভাব পূরণকারী ও কার্যনির্বাহী মনে করে থাকে। অথচ আল্লাহ পাকের ব্যক্তিবাচক ও কর্মবাচক উভয় গুণই রয়েছে। যেমন,তাঁর ব্যক্তিবাচক গুণ যথা-শক্তি, জীবন, জ্ঞান, বচন, শ্রবন, দর্শন, ইচ্ছা এবং কর্মবাচক গুণ হলো-সৃষ্টি করা, রিজিক দান করা, উত্পন্ন বা উত্পত্তি করা, সম্পন্ন করা ইত্যাদি। এসব গুণ চিরস্থায়ীভাবে বিরাজিত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বিরাজমান থাকবে। তাওহীদের ব্যাখ্যায় রয়েছে, স্থান ও কাল আল্লাহরই সৃষ্টি। সুতরাং তিনি স্থান ও কালের উর্ধ্বে। স্থান-কাল সৃষ্টির আগেও তিনি যেমন ছিলেন এবং পরেও তেমনি রয়েছেন। তাঁর নিজস্ব স্থায়ী গুণের কোন পরিবর্তন হতে পারে না। যেসব জিনিস বা বস্তু স্থান-কাল এবং পরিবর্তনের অধীন, তা গন্ডিসীমার ভেতরে ও সীমাবদ্ধ। তাঁকে সঠিকভাবে জানতে এবং বুঝতে হবে। তাঁর পরিচয় জানা না থাকলে নির্দেশাবলিও মানা সম্ভব হবে না। ইসলাম শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য তো আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহকে চেনা ও জানার বিষয়টিই। আল্লাহকে জানতে হলে এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস করতে হলে আল্লাহর জাত ও সিফাত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা একান্ত জরুরি। আত্মপরিচয় ও সৃষ্টি জগতকে পর্যালোচনার মাধ্যমে আল্লাহকে জানা যায়। আল্লাহর পরিচয় যখন জানা হবে তখন তাঁর আদেশ-নির্দেশও মানা সহজতর হবে। মানুষের অন্তঃকরন ছাড়া সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গই তাঁর হুকুম তামিল করে। যেমন, হাত, পা,জবান, চোখ, কান, নাক,গলা, মাথা-মস্তিস্ক এবং দৈহিক অন্যান্য অঙ্গ সবই আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হচ্ছে। এসবের কার্যকারিতা বিকল হওয়া আল্লাহর সদিচ্ছার উপরই নির্ভর করে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে কারো এগুলো বা এগুলোর কোন একটি অঙ্গ বিকল বা নষ্ট করে দিতে পারেন। (চলবে)
