সরদার ফজলুল করিমের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই বৈচিত্র্যে ভরপুর। বৈপ্লবিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করত গিয়ে চাকরি ছেড়েছেন, জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়াকে তুচ্ছ করে আজীবন জড়িয়ে থেকেছেন আন্দোলন-সংগ্রামে। চারবারে কারবন্দী ছিলেন ১১ বছর। দীর্ঘদিন লড়াকুজীবন কাটিয়ে লেখালেখিকে নিয়েছেন লড়াই-সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে। দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন প্রচুর। এই দেশকে আপন করে নেওয়ার অমৃতকথা তাঁর রচনায় পাওয়া যায়। গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় এতই বৈচিত্র্যে ভরা, মনে হবে—এ যেন কোনো মহাজীবন-ভিত্তিক কাহিনি। মানুষের জন্য উপভোগ্য এক জীবনের সন্ধান রয়েছে এই বইয়ে।
ঢাকা শহরে প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। এর সাথে আমার সম্পর্ক বাড়তে থাকে। প্রগতি লেখক সংঘের একজন অরগানাইজারও ছিলাম আমি। লেখক তেমনভাবে ছিলাম না অবশ্য, কিন্তু আমি এর ভলান্টিয়ার, অনুগত ছিলাম। প্রগতি লেখক সংঘের ‘ক্রান্তি’ নামে একটি পত্রিকা ছিল। সোমেন চন্দের ওপর একটি সংখ্যা বের করে ‘ক্রান্তি’ পত্রিকা। এতে আমার একটি লেখা ছিল ১৯৪৫-এর তারিখে দেওয়া। কলকাতার ‘সোমেন চন্দ রচনাসমগ্র’ সঙ্কলনের সম্পাদক একটি নোট দেন আমার লেখাটির নিচে:এই লেখা থেকে প্রমাণ হয় সোমেন চন্দ মুসলামন সম্প্রদায়ের মধ্যেও অপরিচতি ছিলেন না, বিচ্ছিন্ন ছিলেন না তাদের কাছ থেকে।
এ ছাড়া যুদ্ধের সময় সোভিয়েত সাহিত্য যা আসত তার অনুবাদ করা আমার একটা হবি হয়ে দাঁড়ায়। সুন্দর সুন্দর সব গল্প। আমি নিকোলাই তিখনভের একটি গল্প অনুবাদ করেছিলাম। গল্পটির নাম ‘একটি শিশুর জন্ম’। যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে গল্প। যুদ্ধ চলছে, বোমা এসে পড়ছে। এমনি সময়ে একজন মা মারা যেতে যেতে সন্তান প্রসব করছে রাস্তায়। জীবন ও মৃত্যু যে একসঙ্গে চলে এবং সোভিয়েতরা যে জীবন দিয়ে লড়াই করছে—এটা সুন্দরভাবে প্রকাশ পায় এই গল্পটিতে।
আমার পার্সোনাল দৃষ্টিটা অন্য কোনো কিছুর দ্বারা রুদ্ধ হতে পারেনি। জওহর লাল নেহেরুর ‘গ্লিম্পসেস অব দি ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ বইটা আমি বহুবার পড়েছি। আমি ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করি এখনো, ‘আচ্ছা নেহেরু যদি প্রধানমন্ত্রী না হতেন, তা হলেও কি তার নাম থাকতো?’ মুসলমান ছেলেরা তো নেহেরুকে চিনেই না। যারা চিনে তারা বলে, ‘হ্যাঁ, থাকতো, তার “ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া” ইত্যাদি বই তাঁকে একইভাবে বিখ্যাত করে রাখতো।’ আমি বলি, আর একটি বই আছে নেহেরুর :‘কন্যার কাছে পিতার পত্র’। জেল থেকে কন্যা ইন্দিরাকে যেসব পত্র লিখেছেন নেহেরু সেগুলো সংকলিত হয়েছে এই বইয়ে। পত্রের মাধ্যমে ইন্দিরাকে রাজনীতিবিদ করে তুলেছেন নেহেরু। বইটি যে আমি কতবার কিনেছি আর কতবার হারিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।
রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, অমৃত দত্ত, সরলানন্দ সেন (মাও সে তুঙের জীবনী-লেখক) ও অন্যান্যরা নিয়মিত একটি পাক্ষিক সভায় মিলিত হতেন ঢাকা কোর্টের কাছে একটি বিল্ডং-এ। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস ছিল আবার অচ্যুত গোস্বামীর বাসাও ছিল। সেখানে আমরা মাঝে মাঝে যেতাম। আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে সৈয়দ নুরুদ্দীন, মুনীর চৌধুরী, সানাউল হক, আবদুল মতিন এদের মিটিং-এ নিয়ে যাওয়া। সবাই আমার খুব প্রশংসা করত এই বলে যে আমি খুব বাধ্য ইত্যাদি।
১৯৪৪-৪৫ সালে ক্রমান্বয়ে আমি প্রগতি লেখক সঙ্ঘের একজন স্বেচ্ছাসেবকে পরিণত হলাম। প্রগতি লেখক সংঘ থেকেই অজিত গুহের সাথে আমার আলাপ। ওয়ারীতে তিনি থাকতেন হরদের গ্লাস ফ্যাক্টরির উলটোদিকের একটা বাড়িতে। বাড়িটার নাম ছিল টয়। নীল রঙের সিরামিক দিয়ে লেখা ছিল বাড়ির নামটা। কিছুদিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে। অজিত গুহ জগন্নাথ কলেজের প্রফেসর ছিলেন। কামরুল ভাই অজিত গুহের বাড়িতে পড়ে থাকতেন। আমাদের খুব খাওয়াতেন তিনি। এই যে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, আমি তো মনে করি কবি নূরুল হুদা ইজ এ ক্রিয়েশন অব অজিত গুহ। তিনি কতখানি অজিত দা’র কথা স্মৃতিতে রেখেছেন জানি না। এই যে আলতাফ মাহমুদ, আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা মাহমুদ বা তার শালা, ওর যে নামটা ভুলে গেছি—এদের সবাইকে অজিত গুহ পালন করতেন নিজের সন্তানের মতো।
১৯৪৫ সালের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি তখন ফজলুল হক হলের ছাত্র। ছাত্ররা ঠিক করল তারা নির্বাচন করবে। হলের স্টুডেন্ট ইলেকশান। প্রত্যেক হলে হয়। আমি ছিলাম একটু গুডি গুডি টাইপের। কর্মচারীদের মধ্যে আমি আর রবি গুহের খুব জনপ্রিয়তা ছিল। তাদের ছেলেমেয়েদের সন্ধ্যায় পড়াতাম আমরা। কর্মচারীরা আমাদের খুবই ভক্তি করত, সালাম দিত। শিক্ষকরা ঠাট্টা করে বলতেন, ‘কর্মচারীরা দেখি আমাদের চেয়ে তোমাদেরই সালাম বেশি দেয়, কী ব্যাপার!’ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেয়ারার্স ইউনিয়ন হয়েছিল। পরবর্তীকালে শেখ মুজিব রহমানও এর সাথে জড়িত হয়েছিলেন।
