উপমহাদেশে জনপ্রিয় নেতা অনেকেই, কিন্তু মহান নেতার সংখ্যা অতি অল্প। মওলানা ভাসানী সেই অল্পসংখ্যক মহান নেতার একজন। বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল তাঁর দীর্ঘ জীবন। তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন অগণিত মানুষ। তাঁদের অনেকের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে তাঁর জীবনের অনেক অজানা দিক। এই বইয়ের টুকরো টুকরো কাহিনিগুলো শুধু আকর্ষণীয় নয়, মওলানা ভাসানীর রাজনীতি বোঝার পক্ষেও তার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তি ভাসানী ও রাজনীতিবিদ ভাসানীকে জানতে আজও-অজানা এই ঘটনাগুলোর আর কোনো বিকল্প নেই।
একরাতে ৬ মাইল সড়ক নির্মাণ
১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে মওলানা ভাসানীর ইচ্ছায় আসামে অসাধ্য সাধন হতে পারত। যে কোন কাজে তাঁর ডাকে মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাড়া দিত। লাখ লাখ টাকা খরচ করে যে কাজ করতে সরকারের লাগত তিন মাস, তিনি তা শুধু মুখের কথায় করতে পারতেন দু’তিন দিনে। মাহমুদাবাদের নবাবের আসাম সফরের সময় তেমন একটি ঘটনার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। মওলানার এক পরিচিত মুহম্মদ কোরবান আলীর ভাষায়:‘১৯৪১-৪২ সালের কথা। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সেক্রেটারি মাহমুদাবাদের নবাব আসবেন আসামের হামিদাবাদ। [মুসলিম লীগের] জনসভার পূর্বদিন আসরের নামাজের পর মওলানা তাঁর তত্কালীন সেক্রেটারি মানিক সরকারকে ডেকে বললেন, “নবাব সাহেব ধুবড়ী থেকে আসবেন কীভাবে? ধুবড়ী থেকে তো কোনো রাস্তা নেই। ধুবড়ী থেকে হামিদাবাদ প্রায় ৬-৭ মাইল পথ। কী করা যায়?”
মওলানার দুশ্চিন্তা দেখে শিষ্যরা নেমে গেল রাস্তা তৈরির কাজে। পরদিন বেলা ১০-১১টার মধ্যে তৈরি হয়ে গেল রাস্তা। নবনির্মিত এই রাস্তা দিয়েই হামিদাবাদে এলেন নবাব। হামিদাবাদের এই সভাতেই তত্কালীন পাকিস্তানি পতাকা আসামে প্রথম উত্তোলন করেন মওলানা ভাসানী। [হাসান কাইয়ুম সম্পাদিত, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, পৃ.১৭৪]’
প্রজাদের শোষণ করা ও ক্ষমতা-লিপ্সার কারণে এই সামন্ত রাজা-নবাবদের কঠোর সমালোচনা করতেন ভাসানী। স্বাধীনতার পর তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাদের চেয়ে ভাসানীর অবদান বেশি।
অবশ্য সেই ঔপনিবেশিক আমলে সামন্ত-ভূস্বামীদের বাদ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন সফল করাও কঠিন ছিল। ভাসানীর সাফল্য এখানে যে, তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে সামন্ত রাজা ও প্রজা এই দু’পক্ষের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে পারতেন।
আমি সেইন্ট হতে চাইনি
১৯৬৯ সালের আইয়ুব সরকারবিরোধী উত্তাল আন্দোলনের সময় অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার মি. ফ্লাড (Flood) সন্তোষ যান মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে। তাঁর আলোচনার উদ্দেশ্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে কথা বলা। দোভাষী ছিল, কিন্তু ফ্লাডের কথা ভাসানী নিজেও মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
মূল রাজনৈতিক আলোচনা শেষ করে এক পর্যায়ের হাই-কমিশনার মওলানাকে প্রীত করার জন্য বলেন, Mr. Maulana, you are a saint মওলানা সাহেব আপনি একজন সাধু পুরুষ।
ইংরেজি তিনি বলতেন না, কিন্তু খুব ভালো বুঝতেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দোভাষীর তর্জমা শোনার আগেই বলেন, আমি saint নই। সেইন্ট আমি হতে চাইনি। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সমস্যা লইয়াই আমার কারবার।
Then you tell what is your philosophy of life, তাহলে বলুন আপনার জীবন দর্শন কি?
এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে ভাসানী উপমহাদেশের মানুষের শোষিত হওয়ার ইতিহাস বর্ণনা করতে থাকেন। তিনি বলেন, শোষিতের পক্ষে এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আমি সংগ্রাম করি। আমি অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করি। যে সাধুতা ও স্পিরিটুয়ালিট নিয়ে ব্যস্ত থাকলে কেউ মানুষ ছেড়ে আকাশে বিচরণ করে সে আধ্যাত্মিকতা আমার নয়।
মওলানার মুখে স্পিরিচুয়ালিটি শব্দটি শুনে রাষ্ট্রদূত অবাক হন। তিনি দোভাষীর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমি যা বলতে চেয়েছি মওলানা তা বুঝতে পেরেছেন, আমি তাঁর রাজনীতির দর্শনও বুঝতে পারছি।
কূটনীতিককে তিনি টাঙ্গাইল থেকে আনা মিষ্টি ও ফলমূল দিয়ে আপ্যায়িত করেন।
