জালাল মাথা থেকে সব চিন্তা দূর করে পাগলের মতো ছুটতে থাকে, প্ল্যাটফর্ম শেষ হওয়ার আগে তার এই ট্রেনে উঠতে হবে, একবার প্ল্যাটফর্ম শেষ হয়ে গেলে আর সে উঠতে পারবে না। ছুটতে ছুটতে সে একটা খোলা দরজার হ্যান্ডেলের দিকে তাকাল, সে যদি হ্যান্ডেলটা একবার ধরতে পারে তাহলেই শেষ একটা সুযোগ পেয়ে যাবে। একবার চেষ্টা করল, পারল না, জালাল তবু হাল ছাড়ল না। সে শুনতে পেল ট্রেনের ভেতর থেকে মানুষজন চিত্কার করছে, ‘কী কর? কী কর? এই ছেলে? মাথা খারাপ না কি?’
জালাল শুনতে পেল মন্তাজ মিয়া একটা হুংকার দিয়ে বলল, ‘চোপ! না হলে কল্লা টেনে ছিঁড়ে ফেলমু।’
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দটা সাথে সাথে থেমে গেল।
এবারে ওস্তাদের গলার শব্দ শোনা গেল, সে সবাইকে গুনছে, গোনা শেষ করে বলল, ‘উনিশজন।’
জরিনি খালা বলল, ‘হ্যাঁ।’
ওস্তাদ বলল, ‘কুড়িজন ডেলিভারি দিবার কথা। একটা শর্ট পড়ল।’
জরিনি খালা বলল, ‘পরের বার একটা বেশি দিলই হবি।’ তারপর নিচু গলায় কী যেন বলল, সেটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর খোলা দরজা দিয়ে প্রথমে ওস্তাদ পিছু পিছু মন্তাজ মিয়া আর জরিনি খালা বের হয়ে এলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওস্তাদ বলল, ‘আমি গেলাম।’
জরিনি বলল, ‘আমিও যামু।’
‘তুই থাক। মন্তাজরে সাহায্য কর। একলা পারব না। কাল ভোরে যাবি।’
‘ঠিক আছে।’
তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে তিনজন সামনের দিকে এগিয়ে যায়। মানুষগুলো সরে যেতেই জালাল খাটের নিচ থেকে বের হয়ে এলো, সে যেটা দেখতে এসেছিল সেটা দেখে ফেলেছে। জরিনি খালা মায়ের মতো আদর করে বড় করার জন্যে মায়া আর জেবাকে আনেনি, তাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এনেছে বিক্রি করার জন্যে। বাজারে যেভাবে গরু ছাগল বিক্রি হয় তাদের ঠিক এভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।
যেভাবে পাইপ বেয়ে উপরে উঠেছিল ঠিক সেইভাবে এখন পাইপ বেয়ে তাকে নেমে যেতে হবে, তারপর বাইরে কাউকে খবর দিতে হবে। তার কথা কেউ শুনতে চাইবে না কিন্তু তাকে জোর করে কথা শোনাতে হবে। যেভাবে হোক।
পা টিপে টিপে বের হবার আগে জালাল হঠাত্ থেমে গেল। ঐ বন্ধ ঘরটাতে উনিশটা বাচ্চা নিশ্চয়ই ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। বেচারি মায়া আর জেবা নিশ্চয়ই এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার কি একবার ভেতরে ঢুকে তাদের বলা উচিত না যে—ভয় পাওয়ার কিছু নেই—সে বাইরে গিয়ে পুলিশকে খবর দিবে। পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে নেবে।
জালাল আবার পা টিপে টিপে আগের ঘরে ফিরে এলো। খুব সাবধানে ছিটকিনি খুলে সে দরজাটা একটু ফাঁক করে ভেতরে মাথা ঢোকায়। একটা বড় খাটের উপরে এবং নিচে জড়াজড়ি করে অনেকগুলো বাচ্চা বসে আছে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। জালালকে দেখে হঠাত্ সবাই চুপ করে তার দিকে তাকাল।
জেবা অবাক হয়ে চিত্কার করে উঠতে চাইছিল জালাল ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তাকে চুপ করতে বলল, সাথে সাথে জেবা চুপ করে গেল। জালাল পা টিপে টিপে কাছে এসে ফিস ফিস করে বলল, ‘ডরাইস না।’
‘তুই কোত্থেকে আইছস?’
‘আমি তোগো পিছ পিছ আইছি। কথা কওনের সময় নাই। আমি বাইরে গিয়া পুলিশরে খবর দিমু।’
সবগুলো বাচ্চা চোখ বড় বড় করে জালালের দিকে তাকিয়ে রইল। জালাল সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কুনো ভয় নাই। আমি পুলিশরে খবর দিমু।’
মায়া কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখন জালাল শুনতে পেল বাইরে মন্তাজ মিয়া বলছে, ‘এই জরিনি, দরজা খোলা কেন?’
জরিনি খালা বলল, ‘হেইডাতো জানি না।’
‘ভিতরে কে ঢুকছে?’
ধড়াম করে দরজা খুলে মন্তাজ মিয়া আর জরিনি খালা ভেতরে ঢুকল। দুইজন তীক্ষ দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকায়। মন আজ মিয়া বলল, ‘পোলা মাইয়া ছাড়া তো আর কাউরে দেখি না।’
জরিনি খালা বলল, ‘গুনে দেখ, বেশি আছে কি না।’
মন্তাজ মিয়া গুনতে শুরু করে, উনিশজন ছিল, গুনে দেখা গেল একজন বেশি। গুনতে ভুল করেছে কি না সেটা ভেবে মন্তাজ মিয়া আরেকবার গুনতে শুরু করেছিল তার আগেই জরিনি খালা জালালকে হঠাত্ চিনে ফেলল, চিত্কার করে বলল, ‘আরে! তুই জালাইল্যা না?’
জালাল কিছু বলার আগেই মন্তাজ মিয়া লাফ দিয়ে এসে জালালের ঘাড় ধরে তাকে টেনে উপরে তুলে ফেলে একটা ঝাঁকুনি দিল। জালালের মনে হলো তার সমানে সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
জরিনি খালা হি হি করে হেসে বলল, ‘ওস্তাদরে মিস কল দে! বলতি হবি একটা শর্ট ছিল এখন আর শর্ট নাই। পুরা বিশজন ডেলিভারি দিবার পারমু। একটা বেকুবের বেকুব নিজে আইসা ধরা দিছে।’
জরিনি খালার হাসি আর থামতে চায় না।
