মাসুদুজ্জামান

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪২
টুকরো টুকরো লেখা কিন্তু এই গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো একটি একক ভাবনার ঐক্যসূত্রে গাঁথা, সেটি হচ্ছে যৌনতা। যৌনতা ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের উত্স-সন্ধানই হচ্ছে লেখাগুলোর যোগসূত্র। যৌনতার সূত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে যে বিভাজন টানা হয়, যে-বিভাজনের প্রভাবে নারীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে, সেই অমানবিক দিকটির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। গত প্রায় পাঁচ-ছয় দশক ধরে নারীভাবুক ও নারীবাদীরা যৌনতার যে বহুমাত্রিক, গভীর বিশ্লেষণ করে যৌনরাজনীতির দৃশ্যপট ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছেন, তাকে পাঠকের সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। মিশেল ফুকোই কথাটা বলেছিলেন, পূর্বের যে-কোনো সময়ের তুলনায় উনিশ ও বিশশতকের যৌনতার ভাবনা ছিল একেবারেই আলাদা। বস্তুসদৃশ শরীর ছিল এর আগে যৌনতার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু এইসময়ে যৌনতার কেন্দ্র হয়ে উঠলো মানুষের মন বা অন্তর্লোক। মনোলোকের এই আবিষ্কারই হচ্ছে আধুনিকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। শরীর ছাড়িয়ে নারী-পুরুষ তখনই মানস সংযোগের সূত্রে পরস্পরকে অনুভব করতে পেরেছে, গড়ে উঠেছে মানসিক সখ্য। যৌনতা হচ্ছে এই সখ্যেরই তুঙ্গতম রূপ। মানবিকতারও উত্স এই যৌনতা। এটিই হচ্ছে মানবিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রাথমিকভাবে এই সম্পর্কটি শারীরিক, কিন্তু সামাজিক পটপরিসরে ঘটে এর বিকাশ ও পরিচর্যা। ফলে শারীরিক অনুষঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে যায় সামাজিক অনুষঙ্গ। সামাজিকতার সূত্র ধরে যুক্ত হয়ে পড়ে মনস্তাত্ত্বিক আচরণের সঙ্গে। যৌনতা এভাবেই শুধু শারীরিক হয়ে থাকে না, আমাদের যাপিত জীবন ও মতাদর্শের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। নারীভাবুকেরা বলেছেন, যৌনতা ব্যবহারিক জগতে ও মতাদর্শের ক্ষেত্রে যেভাবে উপস্থাপিত হয় সেটি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যৌনভাবনা, মিথুনকেন্দ্রিক নান্দনিক তত্ত্ব, শরীর ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিত্সার যেসব তত্ত্ব বিশশতকের ভাবনাজগেক আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, পশ্চিমী নারীবাদীরা সেইসব ভাবনার মধ্যেই লক্ষ করেছেন কীভাবে নারীকে পুরুষের অধস্তন করে রাখা হয়, কীভাবে ঘটে নারীসত্তার অবমূল্যায়ন। মিশেল ফুকো বলেছেন, বুর্জোয়া সমাজের বৈশিষ্ট্য হিশেবে গত কয়েক শতক ধরে ঘটেছে যৌনতার এই উপস্থাপনা। নারীবাদীরা লক্ষ করেছেন, পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ ও প্রক্রিয়ার অংশ হিশেবে লিঙ্গভেদের মধ্য দিয়ে সামাজিক বৈষম্যের দুঃসহ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। নারী এই সমাজ ও যৌনজীবনে, সিমোঁ দ্য বোভেয়ারের ভাষ্য অনুসারে, ‘দ্বিতীয় লিঙ্গে’র মানুষ, পুরুষের অবস্থান তার উর্ধ্বে। নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষতন্ত্রই সমাজে তার আধিপত্য বজায় রাখে। নারীর যৌনতার ওপর নারীর কোনো অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয় না। এই অধিকার হরণই পুরুষতন্ত্রের মূলকথা। পুরুষতন্ত্রের কাছে নারীর রয়েছে এমন এক শরীর, যে-শরীরকে কেন্দ্র করে পুরুষের যৌনবাসনার পরিতৃপ্তি ঘটে। নারীর আরেকটি বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, সে সন্তান জন্ম দিতে পারে। নারীর যৌনতাকে তাই পুরুষের বশে রাখা প্রয়োজন। নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষ নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। একইসঙ্গে ঘটবে যৌনবাসনার পরিতৃপ্তি এবং অব্যাহত থাকবে মানবপ্রজন্মের প্রবহমানতা। গত শতকের মাঝামাঝি থেকে নারীবাদ এই আধিপত্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক যৌনতার স্বরূপ উন্মোচন করে চলেছে। তাদের লক্ষ্য, নারীমুক্তির মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের সম্পকর্কে মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। সার্বিক মানবমুক্তির লক্ষ্যে আসলে নারীমুক্তির কোনো বিকল্প নেই। কথাটা বলেছিলেন ভার্জিনিয়া উল্ফ। পুরুষতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করেই অর্জন করতে হবে এই নারীমুক্তি। বৈষম্যহীন, ভারসাম্যমূলক পৃথিবীর জন্যই নারীমুক্তি অপরিহার্য। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও উল্লেখ করেছেন পুরুষের সমান উন্নতি না করতে পারায় নারী ‘পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিনী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল’। সমানাধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর স্বপ্ন হয়ে পড়লো সুদূরপরাহত। বিশশতকের শেষ কয়েক দশকে ‘যৌনতা’ এ কারণেই নারীবাদের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। যৌনতা এইসময় গণ্য হয়েছে ‘রাজনৈতিক’ বিষয় হিশেবে, বিশেষ করে পাশ্চাত্যে যৌননিপীড়নের বিরুদ্ধে সূত্রপাত ঘটে তীব্র নারী-আন্দোলনের। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও এর ঢেউ এসে লাগে। তবে যৌনতার প্রশ্নে পাশ্চাত্যে নারীবাদীরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললেও এ বিষয়ে কখনই কোনো অভিন্ন মতাদর্শে স্থির থাকতে পারেননি, তাদের মধ্যে এর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পরিণাম সম্পর্কে দেখা দেয় তীব্র তর্ক-বিতর্ক, নারীবাদীরা মতাদর্শিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই বিভক্তি, বলা প্রয়োজন, অস্বাভাবিক নয়, কেননা সাধারণভাবেই ব্যক্তিমানুষের যৌনচর্চা ও পরিচয়ের বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই জটিল বিষয়, বিতর্কিতও বটে। নারীবাদীরাও এইসময় যৌনতা ও ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে নানাভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, বুঝে নিতে চেয়েছেন নারীর আত্মমুক্তির সূত্রটি। পর্নোগ্রাফি, যৌনজীবিকা, যৌননিপীড়ন, সমকামিতা ও ব্যক্তিগত যৌনচর্চা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তারা তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব অবস্থান। একথার অর্থ হলো মানবসমাজে ও সংস্কৃতিতে এতদিন ধরে এই বিষয়গুলোকে ঘিরে যে প্রাচীন, ক্ষয়ে যাওয়া, পশ্চাত্পদ, সনাতন ধারণা প্রচলিত ছিল, নারীবাদীরা সেসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নারীবাদীরা এসব বিষয় সম্পর্কে আদর্শিকভাবে কখনই ঐকমত্যে পৌঁছুতে পারেননি।