বইয়ের নাম গুরু ও চণ্ডাল। সেলিম আল দীন ‘গুরু’, পাশাপাশি বিশেষণটি—লেখকের বিনীত অভিধা ‘চণ্ডাল’। সেলিম আল দীন এ বইয়ে আছেন; আছেন লেখক নিজেও। স্বাধীন নগর ঢাকায় যে নতুন কথ্যভাষার উদ্ভব ঘটেছে গত কয়েক দশকে—লিখিত ভাষায় এখনো তার প্রবেশাধিকার নেই। এ বইয়ে সে ভাষার কিছু ছাপ পড়েছে। এটি ভাষার নতুন কথ্যরীতি হলেও ব্যাকরণ-মানা লোকেরা এ ভাষাটিকে গুরুচণ্ডালী বলে দোষারোপ করেন।
সে অর্থেও এ বই ‘গুরু ও চণ্ডাল’।
স্যার চাইতেন লোকে ওনাকে কবি বলুক। ছোট এই শব্দটার প্রতি ওনার এক অনর্থক মায়া জন্মাইছিল। কিন্তু লোকে স্যারকে কবি বলত না। বলত রফিক স্যারকে। এজন্য তার মধ্যে এক ধরনের অভিমান ছিল। এ অভিমান ছিল দুরারোগ্য। এই অভিমানগুলো জমতে জমতে পাহাড়প্রমাণ হলে তিনি লিখতে বসতেন। আখ্যানের লাইনগুলোকে কবিতা করে তোলার তীব্র বাসনা তাকে আপ্লুত কইরা ফেলত। রফিক স্যারের সঙ্গে সেলিম স্যারের সম্পর্ক জোড়া লাগছিল শামীম রেজা, প্রশান্ত মৃধার দূতিয়ালিতে। রফিক স্যারের ঘরে শামীম ভাই ও প্রশান্ত দা’ ছিলেন। কে জানি সেলিম স্যারকে নিয়ে গেল সেখানে। স্যার রুমে ঢুকেই রফিক স্যারকে পা ছুঁয়ে সালাম করে বসলেন। রফিক স্যার তাকে বুকে টাইনা নিলেন, তারপর দুইজনে মিলে কানতে আরম্ভ করলেন। এইটা ১৯৯৭ সালের ঘটনা হবে। সম্ভবত নভেম্বর বা ডিসেম্বরে এই ঘটনা ঘটছিল। আমি কেমনে ওই সময় রফিক স্যারের রুমে উপস্থিত হইছিলাম সেইটা একটা বিস্ময়। ’৯৭ সালে অক্টোবরে আমি ক্যাম্পাসে গেছিলাম। ’৯৮ সালের জানুয়ারিতে আমাদের ক্লাস শুরু হইছিল। একথা স্পষ্ট মনে আছে, ক্লাস শুরুর আগেই কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্কের ভিত স্থাপিত হইছিল। কিন্তু এইরকম একটা মানভঞ্জন অনুষ্ঠানেও যে সাক্ষী হইছিলাম সেইটা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। এইখানে জানায়ে রাখি, সেলিম আল দীন এবং মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগের সূত্র ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ইলিয়াসের সঙ্গে কখনোই সাক্ষাতের সুযোগ হয় নাই। কিন্তু বই পড়ে কলেজ থেকেই তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হইছিল। ইলিয়াসের লেখা আমার ভীষণ পছন্দ হইত। রংপুরে থাকার সময় ১৯৯৭ সালে ইলিয়াসের মৃত্যু হইলে আমার মধ্যে দারুণ বিরহ উপস্থিত হইছিল। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর একটা দিন আমি একা একা শোকগ্রস্ত হয়ে ঘুরছিলাম পুরা শহর জুড়ে। জাহাঙ্গীরনগরে জানুয়ারি মাসে আমার মনে হইল, ইলিয়াসকে নিয়ে তার জন্মবার্ষিকীতে একটা অনুষ্ঠান করব। প্রথম দিকে ফারুক ওয়াসিফ আমাকে সমর্থন দিলেও পরে উনি লেখক শিবিরের বগুড়ার অনুষ্ঠান নিয়া ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন। বগুড়া চলে গেলেন। ফলে, পুরো আয়োজনটা আমি একক উদ্যোগে করছিলাম। অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হইছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও সেলিম আল দীন। বক্তব্য দিছিলেন আনু মুহাম্মদ। দর্শক হিসেবে উপস্থিত হইছিলেন—রেহনুমা আহমেদ ও মানস চৌধুরী। সেলিম স্যার ও রফিক স্যার দুজনেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণা করছিলেন। খালিকুজ্জামান ইলিয়াসকেও আমি দাওয়াত দিছিলাম। কোনো এক ব্যস্ততায় শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হইতে পারেন নাই। উনি তখন জাহাঙ্গীরনগররে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও কলা অনুষদের ডিন। অনুষ্ঠান হয়েছিল লেকের পাড়ে। ওই জায়গাটির নাম আমরা দিয়েছিলাম আকাশমনি চত্বর। অনেক অ্যাকাশিয়া গাছ ছিল চত্বরে। খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান হইছিল। সেলিম স্যার বক্তৃতায় কইলেন, ইলিয়াস ভাই আমার লেখা খুব প্রশংসা করতেন। খালিকুজ্জামানের বাসায় মাঝে মাঝে আসলে তার সঙ্গে ওনার আড্ডা হইত। এরকমই এক আড্ডায় তিনি ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। স্যারের মতে, আহমদ ছফা ছাড়া এমন উদার লেখক তিনি আর দেখেন নাই। আহমদ ছফা হলেন সেই বিরল লেখক যিনি তরুণদের মধ্যে সামান্য সম্ভাবনা দেখলে জনে জনে তা বলতেন এবং তাকে নিয়ে লিখতেন। আর ছিলেন এই ইলিয়াস। রফিক স্যারের কাছে ইলিয়াস ছিলেন মঞ্জু, অর্থাত্ তার বাল্যবন্ধু, ইয়ার মেট। তিনি মঞ্জুর বিবাহ, কলেজজীবন নিয়ে এক্সক্লুসিভ একটা বক্তৃতা দিছিলেন। সেলিম স্যার মাঝে মাঝে ইলিয়াসের প্রশংসার কথা পুনরাবৃত্তি করতেন। বলতেন মহান সাহিত্যিক আহমদ ছফার কথা। বলতেন, ‘চল না, একদিন ছফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে আসি।’ আমি আহমদ ছফাকে দূর থেকে অনেকবার দেখলেও কখনো কথা বলি নাই। স্যারের সঙ্গে ছফা-দর্শনে যাওয়ার আইডিয়াটা আমার মাথায় খেলে গেল। আহমদ ছফা তখন আজিজ মার্কেটে ‘উত্থানপর্ব’ নামে একটা দোকানে বসতেন। সেলিম আল দীনের ‘প্রাচ্য’ শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে বের হওয়া উপলক্ষে আমরা আজিজ মার্কেটে গেলাম। গিয়েই স্যার খোঁজ নিলেন আহমদ ছফা আছেন কি না। কে জানি বলল, আছে। দেখা হতেই স্যার প্রথমেই ছফার পদস্পর্শ নিলেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছফা কেমন ছিলেন সেই বিবরণ দিলেন আমাকে। তার পাখি পোষা, বাঁশি বাজানো ইত্যাদি নিয়ে বললেন। বললেন, ‘ছফা ভাই, একদিন আমার খাওয়ার টাকা ছিল না, আপনি আমাকে শরিফের দোকানে সকালের নাস্তা খাইয়েছিলেন, সেই দিনটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে।’
