গল্প

একটি আটপৌরে গল্প

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৯
আবার সেই একই স্বপ্ন দেখল রানু। প্রতিবারের স্বপ্নেই আলমের গা কাঁপানো জ্বর দেখে। আর সব সময়ের মতো স্বপ্নটা একই জায়গায় থেমে যায়। ঘুরেফিরে সেই একই স্বপ্ন—আলমের জ্বর, রানু তাকে দেখতে গেছে। ১৩ বছর এত দীর্ঘ সময়, তবু স্বপ্নটা সেই একই জায়গায় আটকে আছে। এ ক-বছরে স্বপ্নে কতবার সিগারেটের ছেঁকার তীব্র জ্বালা অনুভব করেছে, সেটা গুনে শেষ করা যাবে না। আলমদের বাড়ির সবাই এসে রানুকে আংটি পরিয়ে গেল, মিরপুর সেনপাড়ার সেই ছোট্ট গলিতে এতগুলো গাড়িই যেন দম আটকে বন্দী হয়ে ছিল। দারুণ দারুণ ঝকমারি সব গয়না পরা আলমের মায়ের পাশে রানুর মা তো দূরে থাক রানুকে এতটা মলিন আর চিমশে লাগছিল। বড় বোনের বিয়ের সেই জবরজং শাড়িটা পরাতে চেয়েছিল সবাই। রানু পরেনি, বড় দুলাভাই পুরান ঢাকার টায়ার ব্যবসায়ী, তার রুচি তো জানাই আছে। সবার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিউশনির টাকা জমিয়ে কেনা পয়লা বৈশাখের লাল-সাদা জামদানিটা পরেছিল। ছোট চাচি তো বারবার মাকে বলছিল, বড় ভাবি তোমার মেয়ের বিয়ে যদি ভাঙে, তবে এই শাড়ির জন্যই ভাঙবে। শাড়িটার জন্যই সে যাত্রা বিয়েটা টিকে গেছিল, নইলে খান অ্যান্ড ব্রাদারস গ্রুপের মালিকের ছেলের সঙ্গে রানুর বিয়ে ঠিক হয়। আলম বরাবরই লজ্জা-শরমের মাথা খাওয়া ছেলে। কোনো কথা নেই, বসার ঘরে সবার সামনে উঠে এসে রানুর পাশে বসল। রানু আঁতকে উঠেছিল। আলম পাশে এসে বসায় আঁতকে ওঠেনি, রানুর পাশ থেকে বসার ঘরের টেবিল ক্লথের ছেঁড়া অংশটা দেখা যাচ্ছে, আলমের চোখে যদি ওটা পড়ে যায়। আতঙ্ক কাটাতেই আলমের চোখের দিকে তাকিয়েছিল, কী গভীর মমতা ছিল। যেন একটা শান্ত পুকুর। ঢিল ছুড়লেই নীরবতা ভেঙে যাবে। নিজে থেকেই মাকে বলল আংটিটা দিতে। দরজার চিপায়, জানালার পাশে, কোনাকানায় দাঁড়িয়ে থাকা রানুদের বাড়ির সবাই সমস্বরে আলহামদুলিল্ল¬াহ বলে উঠেছিল। রানুর বড় দুলাভাই তো সেদিনই আলমকে দুলামিয়া ডাকতে শুরু করে দিল। আংটি পরানোর সময় ফিসফিস করে জানতে চেয়েছিল, আমার রাজকন্যাকে আবার কেউ নিয়ে যাবে না তো। রানুর খুব বলতে ইচ্ছা হয়েছিল, কার এমন সাধ্যি, আপনার কাছ থেকে নিয়ে যায়। সব কথা তো বলা হয় না, ম্ল¬ান হেসেছিল। রানুর বিয়ে উপলক্ষে বড় দুলাভাই মনখুলে বাজার করেছিলেন, শাঁখারীপট্টির কচি খাসির গোশত, শেওড়াপাড়ার গরুর গোশত, বিশাল সাইজের মোরগ, কালিজিরা পোলাওয়ের চালটা নানা পাঠিয়েছিলেন গত মাসে, বিক্রমপুরের দই আর পোড়াবাড়ীর চমচম বড় দুলাভাই এনেছিলেন। এ নিয়ে অবশ্য বড়াপা দুটো কথা শোনাতে ছাড়েনি। বড় জামাইকে বেয়াদব, আদব-কায়দাহীন বলা হয়, অথচ বাড়ির সব কাজেই তিনি সবার আগে এগিয়ে আসেন। দুলাভাইও খুব বকেছিলেন আপাকে, আমি পুরান ঢাকার পোলা, আমার আদব-লেহাজ এমতেই কম। এইগুলান হিসাবের বিষয় না, আমার সুন্দরী শালীর ভালায় ভালায় বিয়াটা মিটটা যাওক। টেবিল ভরতি এত খাবার দেখে রানুর নিজেরই অন্যবাড়ির টেবিল বলে মনে হচ্ছিল। আলম সব ফেলে ঝিরি আলু ভাজি আর পটলের দোলমা দিয়ে লেবু কচলে ভাত খেল। খাওয়া শেষে বড়াপার মেয়ে পিয়া যখন পান এগিয়ে দিল তখন সে বলল, আমি একটু রানুর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাই। কী যে লজ্জা পেয়েছিল রানু, বাড়ির সমবয়সীরা একটু ফিসফাঁস করছিল। আব্বা তো বিষয়টা মানতেই পারলেন না। কিছু বলতে গেলে বড় দুলাভাই আটকে দিলেন। তিনিই রানুর শোবার ঘরে আলমকে নিয়ে এলেন। বের হওয়ার সময় দরজা টেনে দিতে দিতে বললেন, ভাই রাখো তোমার সমপত্তি, তোমারে দিয়া গেলাম। আলম শুধু বলল, তোমার ঘরে সিগারেট খাওয়া যায়? রানু কী বলবে বুঝতে পারছিল না, শুধু মাথা নেড়েছিল। সিগারেট ধরাতে ধরাতেই জিজ্ঞেস করেছিল, আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে। জবাবে রানুর বলার মতো অনেক কথাই ছিল, কিন্তু সেদিন সে কিচ্ছু বলতে পারেনি। কেমন একটা আড়ষ্টতা রানুকে ঘিরে রেখেছিল। খুব বলতে ইচ্ছা করছিল, আমি এক জনম ধরে আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আলমের বোন এসে ডেকে নিয়ে গেল আলমকে। চলে যাচ্ছে ওরা। হাতে সোনার আংটিটা যেন বলছে আবার আসব, অপেক্ষা করো। পরের দিন বড় দুলাভাই এলেন বিয়ের কেনাকাটা, লেনদেন নিয়ে কথা বলতে। তিনিই জানালেন, এ বাসা থেকে যাওয়ার পরপরই আলমের জ্বর এসেছে। প্রচণ্ড জ্বর। লেনদেন নিয়ে কথা বলতে বড় দুলাভাই ফোন করেছিলেন, তখন আলমের মা জানালেন। রানুর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠেছিল। চোখ ফেটে কান্না এসেছিল। ছুটে যেতে খুব ইচ্ছা করছিল। কাকে বলবে, কীভাবে যাবে, বিয়ের আগে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া কীভাবে দেখবে। বাবা যেতে চাইলেন আলমকে দেখতে। বড় দুলাভাই থামিয়ে দিয়ে বললেন, আব্বা, আপনে এমতেই কম বুঝেন, পোলায় মাইয়ার লাইগা উতলা হয়া জ্বর বান্ধাইছে, সেইখানে আপনে যাইবেন কেলা, রানু যাক। বড় দুলাভাইকে একশটা সালাম করে ফেলতে ইচ্ছা হয়েছিল। সে জানে, সবার আপত্তি থাকলেও বড় দুলাভাইকে উপেক্ষা করার সামর্থ কারও নেই। বড় দুলাভাই পকেট থেকে মোবাইল বের করে আলমদের বাসায় ফোন করে জানালেন, বিকেলে রানু আসছে আলমকে দেখতে। ওদের বাড়ি থেকেই আপত্তি থাকার কথা ছিল, কিন্তু ওরা সাদরে গ্রহণ করেছিল। রানু একটা লাল শাড়ি পরল, কানে মায়ের এক রতি সোনার একটা দুল, কপালে একটা লাল টিপ। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে, রোজা ছবির আটকে পড়া নায়ককে উদ্ধার করতে নায়িকা যাচ্ছে। দুলাভাই ফুল, মিষ্টি আর একটা গেট অয়েল সুন কার্ড কিনে দিলেন। দুলাভাইকে দেখে কখনোই মনে হয় না, মানুষটা এত আধুনিক। আলমদের বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন দুলাভাই, এ বাড়িতে এই প্রথম নয়, এর আগেও এসেছে রানু। মিতার গায়েহলুদে এসেছে। মিতারা আলমদের ওপর তলায় ভাড়া থাকে। সেখানেই রানুকে দেখে প্রস্তাব নিয়ে গেছিল আলমের খালা। যে কয়টা মেয়েকে দেখলে বুকের ভেতর ছ্যাত্ করে ওঠে, রানু সেরকম সুন্দরী। নিজেও খুব টের পায়। আলমের মা দরজা খুলে দিলেন, হাতের জিনিসগুলো কাজের মেয়ের হাতে দিতে দিতে বললেন, এগুলো আনতে গেলে কেন? ফুলটা রানু কী করবে বুঝতে না পেরে আলমের মায়ের হাতে দিয়ে দিল, ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, তুমিই না হয় আলমকে দিয়ো। বিষয়টা খুব ভালো লেগেছিল রানুর। চলো, আলমের ঘর দেখিয়ে দেই, ভেতরের ঘর থেকে একজন বয়স্ক মানুষের আওয়াজ ভেসে আসছিল, একে তো ফকিরনির বেটি, তার ওপর অপয়া, কী দেইখা মাইয়া পছন্দ করলি, বুঝলাম না। মাইয়ারে দেইখা আইসা পোলা জ্বরে পড়ে, জীবনে শুনছস। আলমের মা শুধু বললেন, মা, আপনে চুপ করেন তো। রানুকে আলমের ঘরে বসিয়ে দিয়ে মা চলে গেলেন। আলম ঘুমাচ্ছে। টেবিলের ওপর ফুল রাখতে গিয়ে কলমদানিটা ফেলে দিল, কলম পড়ার শব্দে আলম জেগে উঠল। আরে, রাজকন্যা যে! যেন সে জানতই, রানু আসবে। তার এখানে থাকাটাই স্বাভাবিক। রানু জড়োসড়ো হয়ে টেবিলের কাছেই দাঁড়িয়ে রইল, এই যে মেয়ে, জ্বর দেখতে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়? আপনি একটু কাছে এসে বসুন। বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসা আলমের পাশে বসল। কই, জ্বর দেখতে এসে জ্বরই তো দেখলে না—বলে নিজে থেকে রানুর হাত ধরে নিজের কপালে রাখল। সব কিছু এত অসম্ভব ভালো লাগছিল যে, রানুর চোখে পানি চলে এসেছে। চোখের পানি এড়াতে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যাগ থেকে কার্ড বের করে দিল। কার্ডটা এক ঝলক দেখে ছোট্ট করে থ্যাঙ্কস বলল। আলম রানুকে বলল, দরজাটা আটকে দাও। আতঙ্ক, ভালো লাগা—সব একসঙ্গে হলে যা হয়, সেই অনুভূতি ঘিরে ধরল, বাসার সবাই কী ভাববে। এটুকু উচ্চারণ করেছিল মাত্র, আলমের জোর গলার কাছে সেটাও টিকল না। রানু আমি কি আমার জ্বর নিয়ে দরজা বন্ধ করতে উঠব। কে বলবে মানুষটার জ্বর। কোনো চিহ্নই নেই। আড়ষ্ট পায়ে দরজা আটকে দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে রইল। এত সাজগোঁজ করে কী দরজা দেখতে এসেছ? কান্না পেয়ে যাচ্ছে রানুর। মানুষটা এমন কেন? আতিপাতি করে কী যেন খুঁজছে বিছানার পাশের ড্রয়ারটাতে। একটা খালি সিগারেটের প্যাকেট পেয়ে ছুড়ে ফেলল। পাশে এসে বসো, সিগারেট খাওয়ার জন্য দরজা বন্ধ করতে বলেছিলাম। সিগারেট নেই। এই বাড়িতে ঘরে সিগারেট খাওয়া যায় না, দাদি ক্যাটক্যাট করে। নিজের ব্যাগ থেকে সিগারেট বের করে দিল রানু। আরি বাপস, তুমি সিগারেট খাও না কি? এবার হাসিই পেল। সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, তাহলে ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট ইনট্যাক্ট সিগারেট কেন বের হলো? আপনার জন্য, মনে হয়েছে আপনার সিগারেট শেষ হয়ে যেতে পারে। আর আপনি লুকিয়ে খান, এটা কালকেই বুঝতে পেরেছি। হুম, এতক্ষণে মেয়ের কথা ফুটেছে। তুমি সিগারেট খাওয়া পছন্দ করো? না। তাহলে আনলে যে? এমনি। রাজকন্যা, তোমার সম্মানে সিগারেট ছেড়ে দেয়া হবে। এত ভালো লাগছিল, এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে বুঝতে চাইছিল—সত্যি না কি স্বপ্ন। চোখ বন্ধ করেই বুঝতে পারছিল, খুব কাছে আলমের নিশ্বাস, আলমের দু-হাত শক্ত করে রানুর দু-বাহু চেপে ধরেছে। ডান হাতের সিগারেটের আঁচ টের পাচ্ছিল রানু, তার চেয়েও বেশি টের পাচ্ছিল আলমের জ্বর। কতক্ষণ যে সেই ঘোর ছিল, সে জানে না, নিজের ঠোঁটের ওপর একজোড়া পুরুষু্ব ঠোঁটের আনাগোনা টের পাচ্ছিল। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, আনন্দের না বেদনার, কিছুই জানে না। শুধু বুঝতে পারছিল এই ভয়ানক আনন্দ সে সারাজীবন চায়। আলম নিজেই প্রথম চিত্কার করে উঠল, সিগারেটের আঁচে রানুর বাম হাতের একটুখানি পুড়ে গেছে। আজব মেয়ে তো, আমাকে বলবে তো সিগারেটের ছ্যাঁকা লাগছে। চাইলেই কি সব বলা যায়। জ্বরগায়ে আলম নিজে উঠে বরফ আনল, বার্নল লাগিয়ে দিল। আলমের মা পায়েস খাওয়ালেন। মহিলা খুব আধুনিক, ঠাটবাটওয়ালা, কিন্তু মমতাময়ী। আলম নিজেই নিচে নামল রানুকে এগিয়ে দিতে। যদিও রানু বারবার বলছিল—আমি একা যেতে পারব। এর পরের সময়গুলো যেন হাওয়ায় ভেসে যেতে লাগল। বিয়ের দিন এগিয়ে এসেছে। সবশেষ শুধু বিয়ের শাড়ি বাকি। আলমের মা শাড়ি কিনতে রানুকে নিয়ে গেলেন। সবার কপালে তো এত সুখ সয় না। রোড অ্যাক্সিডেন্টে তার পা ভাঙল কিন্তু রানুর কিচ্ছু হলো না। হাসপাতালে বসে আলমের দাদি বারবার বলছিলেন, আগেই কইছি অপয়া মাইয়া, ছোঁয়া লাগলেও দোষ লাগে। আলমের মাকে দেখতে গিয়েছিল রানুর বড় বোন, বড় দুলাভাই আর রানু। কেবিনের বাইরে থেকেই কথাগুলো শুনতে পেল তারা তিনজন। আম্মা ঠিকই বলছে, ওই মেয়ে অপয়া, তুই যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করিস, তবে আমার মরা মুখ দেখবি। মায়ের মৃত্যুর কারণ হওয়ার মতো সাহস রানুর ছিল না। আংটিটা খুলে দিয়ে ছুটে বের হয়ে এসেছিল। বিয়ের সব কিছু প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, আত্মীয়-স্বজন দাওয়াত দেওয়া শেষ। এমন খবর শুনে বাবা স্ট্রোক করলেন। আলমের বোন এসে গায়েহলুদের তত্ত্ব ফেরত নিয়ে গেল। পরিবারের মান বাঁচাতে বড় দুলাভাই কোথা থেকে একজনকে ধরে আনলেন। ধরে আনলেন না পায়ে ধরে আনলেন। তাঁর সঙ্গেই ব্যবসা করেন, নাম মতিন। প্রচুর পান খান, সিগারেট খান, বসার ঘরে পা নাচাতে নাচাতে বসে বাংলা সিনেমা দেখছিলেন। রানুকে দেখে গা জ্বালানো হাসি দিয়ে বললেন, মাইয়া তো দেখি হুরপরি, তা পাত্রপক্ষ ছাড়ান দিল কেন? রানুর দুলাভাইয়ের পা ধরে বলতে ইচ্ছা করছিল, আপনি এ বিয়ে বন্ধ করেন। বিষ খাবে—এমনটাও ভেবেছিলেন। হাসপাতালে বাবা, অসহায় মা সব মিলিয়ে ঘোরলাগা রানুর যেন কিছুই বলার ছিল না। যেদিন আলমের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, সেদিন মতিনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়েতে বড় দুলাভাই সব খরচ করলেন। ছেলের বাড়ি থেকে একটা সুতাও দিল না। বড় আপার জবরজং শাড়ি দিয়ে রানুরও বিয়ে হলো। আত্মীয়-স্বজন হইচই করার চেষ্টা করল, কিন্তু রানুর বাবার অসুস্থতা আর ছেলের আচার-আচরণ দেখে কিছুই করল না। বিয়ের আসরে খাবার টেবিলে খাসি নেই বলে যা-ইচ্ছা-তাই করল। এর লাইগা ফকিরনির বাড়িতে বিয়া করতে নাই, বিয়া ভাঙা মাইয়া দিছে, লগে কিছুই দেয় নাই। রানুর শুধু মনে হচ্ছিল ধরণী দ্বিধা হোক, সে সেঁধিয়ে যাক। রানুদের বাড়িতেই বাসর হলো, ছেলেদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ; রাতে যাওয়া সম্ভব না। তাই এই বাড়িতেই সব হবে। দুলাভাইয়ের মতো দাপুটে মানুষ হাত কচলে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাসরঘরের বেলি ফুলের ঝাঁঝালো গন্ধ, হাকিমপুরি জর্দা দেওয়া পান চিবানো মতিন, ফ্যানের বাতাসে জরি কাগজের ফরফর শব্দ রানুর কাছে হাবিয়া দোজখের মতো লাগছিল। আলমের মুখটা মনে পড়ছে। গায়ের পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে মতিন জিজ্ঞেস করেছিল, ওই লোকের সঙ্গে শুইছিলা? অবশ্য শুইলেও কোনো সমস্যা নাই, তোমার যে রূপ হাজার কাদা মাখো, কাদা থাকত না। তুমি হইলা রাজহাঁস। গায়ে পেক কাদা থাকে না, ঝইরা পড়ে। ঘেন্নায় রানুর গা রি রি করে উঠেছিল। কান্নাও পায়নি, আজকে তেরটা বছর পার হয়ে গেল। নিশ্চুপ, বিচ্ছিন্ন একটা জীবন নিয়ে। বাবু হলো, বাবুকে নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। বাবুর নাম যখন অর্ঘ্য রাখতে চেয়েছিল, মতিন তখন নাক ঝাড়তে ঝাড়তে বলেছিল, আমার পোলায় পুরান ঢাকায় টায়ার বেইচা খাইব, হের এইসব নাটক-সিনেমার নামের দরকার নাই, হের নাম হইব আশরাফ। বাপের নামের লগে মিল¬া হইব আশরাফ মতিন। সে আশরাফ ডাকলেও রানুর ডাকা হয়নি। বাবু বলেই ডাকে, ক্লাস টুতে পড়ে এবার। প্রতিবাদ করার কিছু ছিল না। তিনি শুনবেন না। বাবুর প্রথম জন্মদিনটা কী বিচ্ছিরিভাবেই না পালন করেছে—খাসি জবাই করে পাড়ার লোক ডেকে মাইকে গান বাজিয়ে। রানুর ইচ্ছা ছিল তিনজনে মিলে একটা কেক কাটবে। শত শত মানুষের মধ্যে সেসব হবার জো কই? লোকটার একটা মাত্র গুণ, কোনোদিন রানুর কাছে কিছু দাবি করেনি। স্ত্রী হিসেবে রানু তার সঙ্গে সুখী না, এটা জানার পরও কোনোদিনও কোনো অভিযোগ তোলেনি। ভীষণ পরিশ্রমী, সেই টায়ারের ব্যবসাকে ট্রাকের ব্যবসা করেছে, ট্রাভেল চালায়, রানুকে দেখায়, দেখো তোমার জন্য আর আশরাফের জন্য করতেছি। রানুর কোনো ভাবান্তর হয় না। রানু সচ্ছলতা বা অর্থকড়ি চায়নি, ভালোবাসা চেয়েছিল অন্যরকম। জেদ করে পড়াশোনাটাও ছেড়ে দিল। মানুষটার সঙ্গে আপ্রাণ মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল; হয়নি। কিছু ভালো গুণ তো আছেই, এটুকু ভালো গুণের জন্য সুখী হওয়াটা খুব কঠিন ছিল। গতকালকেই জানল, যে সুখের স্বপ্ন দেখে এতদিন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে, সে সুখ তাকে ছাড়াই সুখী। বাবু ফার্স্ট হয়ে টুতে ওঠা উপলক্ষে কালকে চায়নিজ খেতে নিয়ে গিয়েছিল। বাবুই বলছিল বাইরে খাবে। নইলে এই লোক পাড়া জমাত এই উপলক্ষে। ওদের চায়নিজে বসিয়ে মতিন একটু বাইরে গেল, কোথায় ট্রাক আটকা পড়েছে নাকি। বাবুকে রেস্টুরেন্টটার গেম স্টোরের টিকেট কিনে দিয়ে গেল। রানু একটা কফি নিয়ে বাবুর খেলা দেখছিল। অনেকদিন পর কেন জানি খুব খুব ভালো লাগছিল। ছোটখাটো এসব আনন্দই তো চাওয়ার ছিল। পেছন থেকে একজন এসে বলল, আপনি রানু না? হাত ছলকে কফি পড়ে গেল। আলম। সেই আগের মতো আলম নিজেই টিস্যু এগিয়ে দিল। তার স্ত্রী লোপাকে ডেকে আনল। খুব ফ্যাশন-সচেতন হাইফাই মহিলা। কিন্তু রানুর রূপের কাছে নস্যি। তিনিই এসে হাত ধরে বললেন, ও বাবা এ তো ঐশ্বরিয়ার চেয়েও সুন্দরী, তুমি কীভাবে পারলে ওকে বিয়ে না করে। আর বলো না, কত ধরনের মিস কনসেপশন ছিল ওকে বিয়ে করা নিয়ে। আলমের কণ্ঠস্বরটা এমন ছিল, যেন ওকে বিয়ে না করেই কত উপকার হয়েছে। রানুর কী যে অপমান লাগছে। লোপা তোমাকে ওর হাত পোড়ানোর গল্পটা বলেছি না, এত ইন্ট্রোভার্ট ছিল মেয়েটা, হাত পুড়েছে তা-ও বলেনি। লোপা হাত ধরে সেই পোড়া দাগ দেখতে চাইল। যেন মজার একটা জোকসের বই পড়ছে স্বামী-স্ত্রী মিলে। দশ মিনিট ধরে স্বামী-স্ত্রী মিলে রানুর প্রসঙ্গে নানা কথা বলে হাসল। তাদের ছেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, মাতিস, ম্যাপললিফে পড়ে, রানুর স্বামী-সংসারের কথা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনও বোধ করল না। ভাগ্যিস মতিন সেখানে ছিল না, লোকটা এটা নিয়ে তুলকালাম করত। বাবুকে খেলতে বলে রানু বাথরুমে গিয়ে কাঁদল। এই দুঃখ সে কই রাখবে। মতিন এসে একগাদা খাবারের অর্ডার দিয়ে হইচই করে খেল। রানুই পারল না। গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। কিছু খাবার প্যাকেট করেও আনল বাবুর স্কুলে টিফিন দেওয়ার জন্য। আজ রাতে আবার সেই স্বপ্নটা দেখে জেগে উঠেছে রানু। মতিন অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঠান্ডা লেগেছে লোকটার, গলা দিয়ে ঘরঘর আওয়াজ বের হচ্ছে। উঠে গিয়ে বাবুকে দেখে এল। কিছু করার নেই জানে; আর ঘুম আসবে না। এই স্বপ্ন দেখার পর ঘুম আসে না। রানু বিছানায় উঠে বসল। অন্ধকারে বাবুর সঙ্গে মনে মনে খেলবে। তাতে যদি রাতটা কাটে। রানু বসার সঙ্গে সঙ্গে মতিনও উঠে বসল। আবার আলম সাহেবরে স্বপনে দেখছ? রানু চমকে উঠল। হ্যাঁ-না কিছুই বলতে পারছে না, অন্ধকারে মানুষটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। আইজকা তেরোটা বছর ধইরা এই একটা মানুষরে স্বপ্ন দেইখা ঘুম থিকা চিত্কার কইরা উঠো, কাইলকা তো দেখলা, যার জন্য তোমার নিজের জীবন, আমার জীবন, বাবুর জীবন নষ্ট করতাছ, সে তোমারে কতটুকু মনে রাখছে? কী বাল রাখছে তোমার লাইগা? চামে দিয়া আমার বউরে নিয়ে মস্করা করে, ইংরেজি মারায়, কয় ইন্ট্রোভার্ট, আমিও এমএ পাস করছিলাম, ইংরেজি কম জানি না। রানু আতঙ্কে স্থির হয়ে গেছে। অন্ধকারে দেখতে পারছে না। অনেক শক্তি সঞ্চয় করে শুধু বলল, আপনি সব জানতেন? হ, জানতাম, তোমার দুলাভাই আমারে সব কইছে, আমি খালি অপেক্ষায় আছিলাম কবে তোমার এই মানুষটারে নিয়া ঘোর ভাঙব। আফসোস, সেই দিন আসতে আসতে ১৩ বছর লাইগা গেছে। কী পাইলা রানু? আমি কি খুব খারাপ? হের মতো দামি দোকানের কাপড় পরি না, হের মতো ইংরেজি কই না, কিন্তু তোমারে কোনোদিন অসম্মান করছি, কথা বেশি কই, বাজে কথা কই—এইগুলা আমার স্বভাব। আমি তো হের মতো হেডম ছাড়া পুরুষ না, মায়ে কইছে মাইয়া অপয়া, পোলাও আংটি ফেরত নিছে। আর তুমি আমার জীবনে আসনের পর থিকা আমার খালি উন্নতি হইছে। আপনি চুপ করুন। হ, চুপ থাকাই ভালো। ঘুমাও রানু। সকালে ম্যাপললিফ স্কুলে গিয়া একটা ফরম উঠায়া আনবা, আমার পোলারেও আমি নামি স্কুলে পড়ামু, আর তার নামের লগে অর্ঘ্য লাগায়া দিয়ো। তুমি মা, তোমার একটা দাবি আছে না। তোমার লগে এই একটা অন্যায় আমি করছি। আর ইচ্ছা কইরা খারাপ ব্যবহার করছি, যাতে তোমার ঘোর ভাঙে। আপনাকে আমি চুপ করতে বলেছি। ফুপিয়ে কাঁদছে রানু, মতিন একটা হাত দিয়ে রানুকে কাছে টেনে নিল। প্রথমবারের মতো লোকটার সপর্শে জেগে উঠল রানু। শক্ত করে আঁকড়ে ধরল মতিনকে।