গত কয়েকমাস ধরে মূলধনী দ্রব্য ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি কমছে। কমছে ভোগ্যপণ্যের আমদানিও। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও ডলারের দাম কমায় রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এদিকে মূলধনী দ্রব্য ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি কমে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে বিনিয়োগ মন্দাকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কটের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ লাভজনক হচ্ছে না বিধায় নতুন শিল্প স্থাপন খুব একটা নেই বললেই চলে। বিদ্যমান শিল্পের প্রসারও থমকে আছে। তাই মূলধনী দ্রব্য আমদানি কমে যাচ্ছে, কমছে শিল্প কাঁচামালের আমদানি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের মূলধনী দ্রব্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে ভোগ্যপণ্য আমদানি কমেছে ৩৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোগ্যপণ্য আমদানি কমে আসা কিছু দিক বিবেচনায় ইতিবাচক। তবে মূলধনী দ্রব্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমে গেলে তা নির্দেশ করে যে, নতুন শিল্প বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রসার সঠিকভাবে হচ্ছে না। এদিকে দেশের সামগ্রিক আমদানি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিনে দিনে বাড়ছে, বাড়ছে ডলারের সরবরাহ। ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ডলারের দাম কমে যাচ্ছে। এতে রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দেশের ব্যবসায়িক গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে পোশাক উত্পাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, এমনিতেই দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট রয়েছে, তার উপর ব্যাংকের উচ্চ সুদ হার ব্যবসায়ীদেরকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় অনেক ব্যাংক অভ্যন্তরীণ রফতানি বিল ক্রয় করতেও গড়িমসি করছে। ফলে ব্যবসায়ীরা শিল্প কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। সফিউল ইসলাম বলেন, ব্যাংক সংক্রান্ত সমস্যাগুলো কেন্দ ীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে বলা হয়েছে। তিনি এ বিষয়গুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও শিল্প প্রসারের গুরুত্ব অনেক বেশি। সঠিকভাবে বিনিয়োগ না বাড়লে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির উপর। কারণ বিনিয়োগ না বাড়লে উত্পাদন কমে যায়, কমে যায় কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ এবং মানুষের আয় তথা জীবনযাত্রার মানও প্রভাবিত হয়, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। চলতি অর্থবছরের কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য আগের অর্থবছরের তুলনায় অন্তত ৭৫ হাজার কোটি টাকা বেশি বিনিয়োগ করতে হবে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি থেকে বুঝা যাচ্ছে, বছর শেষে আশানুরূপ বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা নেই। বিনিয়োগ মন্দার কথা স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কটের পাশাপাশি সামনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায়ও বিনিয়োগ প্রভাবিত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার মাধ্যমে শিল্পোদ্যোগকে সহযোগিতা করতে হবে। তবেই প্রসারিত হবে শিল্প বিনিয়োগ। অর্জিত হবে কাঙ্ক্ষিত ও সুষম জিডিপি প্রবৃদ্ধি।
