অর্থনীতির একটি বড় সূচক জিডিপি বা মোট দেশীয় উত্পাদন। একটি দেশের অর্থনীতির ভাল-মন্দ হিসাব করতে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে তা হচ্ছে জিডিপি। সাধারণভাবে ভোক্তার ভোগ, সরকারি ব্যয়, বিনিয়োগ ও নিট রফতানি এ চারটি উপকরণ যোগে হয় জিডিপি। এর অর্থ হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লে জিডিপি বাড়ে। কারণ এতে ভোগ বাড়ে। এ চাহিদা কীভাবে মেটানো হলো আমদানি করে না দেশীয় উত্পাদন দিয়ে তা নিয়ে জিডিপি’র প্রত্যক্ষ মাথাব্যথা নেই। অনেকের মতে, চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমেও যদি বাড়তি চাহিদা মেটানো হয় তাও জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। আবার কোন শ্রেণীর মানুষের এ চাহিদা বা ভোগ বাড়ছে তা দেখার দায়িত্বও জিডিপি’র নয়। এতে ধনী-গরীব বৈষম্য বাড়লো কি কমলো তা দেখার দায় জিডিপি’র নয়। বিনিয়োগ বাড়লে জিডিপি বাড়ে। এ বিনিয়োগ করে আপনি কি পারমাণবিক বোমা বানালেন, না জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করলেন তা হিসাবের দায়িত্ব জিডিপি’র নয়। আবার আপনি শ্রমঘন শিল্পে না উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগ করলেন তাও জিডিপি’র বিষয় নয়। বিনিয়োগ হলেই হলো। কাঁচামাল না ফিনিশড পণ্য রফতানি করে নিট রফতানি আয় বাড়ালেন তাও প্রবৃদ্ধির হিসাবের বিষয় নয়। সরকারি ব্যয় উত্পাদনশীল খাতে না অনুত্পাদনশীল খাতে হলো তা নিয়েও জিডিপি’র ভাবনা নেই। ব্যয় বেড়েছে তাই জিডিপি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো আবাসনসহ নির্মাণ খাতে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করেছে। এতে জিডিপি বেড়েছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে তাদের কর্মতত্পরতা বাড়িয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। কিন্তু বাস্তবে কি অর্থনীতি ভালর দিকে গেছে? যায়নি। কারণ ব্যাংকগুলো বর্ধিত অর্থের চাহিদা মিটিয়েছে। অর্থ ফেরত পায়নি। ফলে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। সরকারগুলোও সামরিক ও জনকল্যাণ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এ কল্যাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যয়টি অনেক স্ফীত হয়েছে। এতে জিডিপি বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতি কতটুকু শক্তিশালী হয়েছে তা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছে। জিডিপি’র চেয়েও জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরো জটিল একটি বিষয়। অর্থনীতিবিদদের কাছে জিডিপি’র পরিমাণ কত হলো তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লো না কমলো সেই বিষয়টি। এই যে বিশ্বব্যাপী মন্দা নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে এত হৈচৈ হচ্ছে সেই মন্দা নির্ধারণের মাপকাঠিও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। পর পর দুটি ত্রৈমাসিকে ঋণাত্মক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেই অর্থনীতিতে মন্দা প্রমাণিত হয়। সেই বিচারেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০০৯ সালে মন্দার মধ্যে ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৭টি দেশের জোট ইউরোজোন এখন মন্দার মধ্যে আছে। এর সদস্য হিসেবে গ্রীস, ইতালী, স্পেন, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড কখন মন্দা থেকে বেরিয়ে আসে অর্থনীতিবিদরা এখন সেই হিসাবটিই রাখতে পছন্দ করেন।
অর্থনীতির নির্ণায়ক হিসেবে এই প্রবৃদ্ধি হার যে বিপজ্জনক হতে পারে তারও উদাহরণ আছে। আফগানিস্তানের কথাই ধরা যাক। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশটির প্রবৃদ্ধি হার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতির সাদামাটা বিচারে দেশটির অর্থনীতি খুব ভালভাবে এগোচ্ছে। সত্যিই কি তাই! দেশটিতে বোমার আঘাতে প্রতিদিন বহু মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধ দিয়ে সামাল দিতে পারছে না। সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনছে তালেবানদের শায়েস্তা করার জন্য। দাতাদের থেকে ধার করে অর্থ আনছে। ব্যয় করছে জঙ্গিবাদ ঠেকাতে, জনগণের খাদ্য ও মানবিক সেবা দিতে। আর প্রাকৃতিক সম্পদ রফতানি করছে। সে কারণে নিট রফতানির অংকটাও খারাপ নয়। কিন্তু আসলেই কি আফগানিস্তান সরকার ও জনগণ ভাল আছে! একই কথা বলা যায় পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। নিরাপত্তার জন্য যে ব্যয় হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে তা দিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বৃদ্ধি জনগণের ভালর জন্য কতটুকু অবদান রাখছে তা দেখার দায়িত্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধির নয়। বিশ্বে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের উত্থানের ফলে প্রবৃদ্ধি হারের হিসাব-নিকাশই পাল্টে গেছে। আফিম, হিরোইন, ইয়াবা প্রভৃতি মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি ডলারের এ বাণিজ্যটিকে অর্থনীতিবিদরা কালো বা সুপ্ত অর্থনীতি হিসেবে চিহ্নিত করে এগিয়ে যেতে পারলেও জঙ্গীবাদের হুমকির জন্য বিশ্বের বাড়তি ব্যয় নিয়ে সত্যিই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যয়কে অর্থনীতিতে কীভাবে বিচার করলে অর্থনীতির প্রকৃত চেহারা ফুটে উঠবে তা নিয়ে গবেষণা করছেন। জিডিপি প্রবৃদ্ধির আরেকটি নেতিবাচক দিক দেখা দিয়েছে উদীয়মান অথনীতিগুলোতে। চীন গত তিন দশক ধরে গড়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ভারতও দুই দশক ধরে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এতে জীনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারেনি দেশ দুটির দারিদ্র্যপীড়িত ও নিম্নআয়ের বিশাল জনগোষ্ঠী। এর ফলে ধনী-গরীব বৈষম্য অনেক বেড়েছে। সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি প্রায় চারগুণ বেড়েছে। তারপরও চীনে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।
নিয়ো-ক্লাসিক্যাল অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমিকের অবদান, প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ সাধনে মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণ ও উত্পাদনশীলতা দিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির গুরুত্ব বেড়েছে। মূলধন বাড়িয়ে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজন করে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোকে কার্যকর প্রবৃদ্ধি অর্জন বলে মনে করা হয়। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর জন্য তা যুত্সই নয়। কারণ তাদের আছে বেকার অদক্ষ শ্রমিকের আধিক্য, মূলধনের মারাত্মক অভাব ও সেকেলে প্রযুক্তি। আবার অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই পুঁজিবাজার জিডিপি প্রবৃদ্ধির একটি বড় পরিমাপক হিসেবে বিবেচিত হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভাল মানেই অর্থনীতি ভালভাবে এগোচ্ছে। আবার শেয়ারের মূল্যসূচক বাড়ছে মানেই দেশের অর্থনীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। কারণ, প্রবৃদ্ধি হার ভাল মানেই সার্বিক উত্পাদনশীলতা বেড়েছে। কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাই শেয়ারবাজার চাঙ্গা। উত্পাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও পুঁজিবাজার তিনটিতে একসাথে সমান ইতিবাচক হতে হবে এমন কথা নেই। এর যেকোনোটিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমেও প্রবৃদ্ধি হার বাড়ানো সম্ভব। চীনের কথাই ধরা যাক। দেশটি ১৯৭৮-১৯৯৫ সময়ে গড়ে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই সময়ে পুঁজিবাজারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ। উত্পাদনশীলতায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ১৯৯৫-২০০৭ সময়ে দেশটির উত্পাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ ও ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। যা আগের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় অবদান রেখেছে পুঁজিবাজার। এর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৮১ শতাংশ। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে পুঁজিবাজার অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ, উত্পাদন ও সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মূলধন বাড়াতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ, শেয়ারে অর্থ বিনিয়োগ, লভ্যাংশ প্রাপ্তি কোনোটাই খুব স্বচ্ছ থাকে না। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ঢিল বিফলে যায়। দোষ পড়ে সরকারের ওপর। অথচ উন্নত বিশ্বে ভিন্ন চিত্র। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। সরকারকে কেউ দায়ীও করে না। পুঁজিবাজার তার আপন গতিতে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ারের সূচক বাড়া বা কমায় সরকারের কিছুই করার নেই। কেনো অনিয়ম হলে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আছে। সরকার শুধু লভ্যাংশ থেকে তার ট্যাক্সটা ষোলআনা আদায় করছে। আর কোনো কালো টাকা যাতে বিনিয়োগ করতে না পারে সেই মেশিনারিটা সক্রিয় রেখেছে। পুঁজিবাজারের আচরণ বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক নীতি প্রণয়ন করছে।
পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। এখানে বিনিয়োগ করতে অর্থের উত্স দেখাতে হয় না। এটি সাদা না কালো টাকা তা প্রমাণের সুযোগ নেই। কেউ এ নিয়ে প্রশ্নও করে না। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের লাভটা করের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সফল তো হন-ই-নি, উপরন্তু সহকর্মীদের সমালোচনা থেকেও রেহাই পাননি। কর দেয়া আয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে বাধ্যবাধকতা আরোপ করলে মতিঝিল পাড়ায় কী হবে তা ভাবনারও অতীত। সর্বত্র একটা জুজুর ভয় দেখানো হয়। যে এটা নিয়ে প্রশ্ন করলে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ২০১০ সালে সূচকের ব্যাপক দরপতনের কারণে ঢাকা মহানগরীতে শোরগোল শুরু হয়। অভিযোগ হলো গত পরশু ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে গতকাল ১০ টাকা লাভ পেয়েছি। আজ কেন লাভের পরিবর্তে ৫ টাকা লোকসান দেবো। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা অস্থায়ী কর্মসংস্থান ছেড়ে শেয়ারবাজারে এসেছি বিনাশ্রমে ধনী হওয়ার জন্য। তা হতে পারলাম না। তাই দোষ সরকারের। অথচ দেশের শেয়ারবাজারের একটা ক্ষুদ্র অংশই অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। শেয়ারবাজারের নেতিবাচক বা ইতিবাচক প্রভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির তেমন কিছু যায়-আসে না। একথাটাই তখন একজন উপদেষ্টা সহজ-সরলভাবে বলেছিলেন। আর যায় কোথায়! মিডিয়া, টক শো, সভা-সেমিনারে তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হলো। কারা করেছেন? যারা এই ভৌতিক ব্যবসাটায় নয়-ছয় করে অনেক কামিয়েছেন এবং আরো আয়ের ফাঁদ পেতেছেন। এর মধ্যে তথাকথিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট আছেন। আছেন একশ্রেণীর চাকরিজীবী, মিডিয়ার লোকজন। আছেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত্ আইন প্রণেতাসহ নগরীর ফিটফাট মানুষগুলো। যারা তিনজনের পরিবারে চারটি গাড়ী আর পাঁচজন বোয়া রেখে অভ্যস্ত। আয়কর দেয়ার সময় তারা তলানিতে থাকেন অথচ ভোগের সময় সর্বশীর্ষে। কিন্তু তারা জানতে চান না এর মাধ্যমে তারা গ্রামের অনেক পরিবারকে মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তে, নিম্নবিত্ত থেকে দরিদ্রের সারিতে নামিয়ে দিয়েছেন। অনেক সাধারণ পরিবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে দ্রুত ধনী হওয়ার আশায়। কোনো কিছু না জেনে, না দেখে বাজারে ঢুকেছেন। সর্বস্বান্ত হয়েছেন। নিজের ভুলে এ পরিণতি হওয়ার সেই ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণীর কোনো সাড়াশব্দ নেই। নীতি-নির্ধারক, মিডিয়াকর্মী, চাকরিজীবীও এই ক্ষতিগ্রস্ত গ্রুপে আছেন। এমন এক নীতিনির্ধারকের কথাই বলি। তার পিয়ন বেতনের চেক নিয়ে বাসায় এসেছে। ধন্যবাদ দেয়ার পরিবর্তে তাকে তিনি বেশ গালমন্দ করলেন। হরহামেশাই উত্তেজিত হওয়া তাঁর বৈশিষ্ট্য হলেও এক্ষেত্রে কেন অগ্নিশর্মা হলেন বোধগম্য হলো না। পরক্ষণেই তাঁর পুত্রবত্ অস্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করা ভাতিজাকে ডাকলেন। চেকটি দিয়ে বললেন দ্রুত শেয়ার কিনে ফেলতে। টাকাটা যাতে তাত্ক্ষণিক ক্যাশ করতে পারে সেজন্য ব্যাংকের ম্যানেজারকে ফোন করে দিলেন। পরে বুঝলাম ঐ পিয়ন চেকটা আনতে দুদিন দেরি করেছিল। তখন ঢাকার শেয়ারবাজারে সূচক ৯ হাজার ছেড়েছে। আমি নিশ্চিত সেই বিচক্ষণ ব্যক্তিটি শেয়ারবাজারের ভেলকি বোঝার বোধশক্তিটা হারিয়ে ফেলেছিলেন নতুবা এ চেষ্টাই করেননি। তার খেসারত নিশ্চয়ই তাঁকে এখন দিতে হচ্ছে। পুঁজিবাজার যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হারে কোনো অবদান রাখে না এর বড় প্রমাণ ২০১০-১১ অর্থবছর। সেই বছর মূল্যসূচক অনেক কমেছিল। অথচ সেই বছরই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উত্পাদনশীলতার ওপরই জোর দিতে হচ্ছে।
শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা নাকি এখন স্বপ্নের মধ্যেও বাজেট ব্যয় হ্রাসের কৌশল খোঁজেন। এতে মিশেল কতটুকু বঞ্চিত হচ্ছেন, মালিয়া ও সাশা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটুকু ঠিক সরকার ইচ্ছে করলেই রাতারাতি সবকিছু পাল্টে দিতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ সাল থেকেই আর্থিক ঘাটতি বড় হয়ে উঠেছিল। সরকার যে তখন বিষয়টি বুঝতে পারেনি তা নয়। বুশ নির্বাচনকে সামনে রেখে তা হজম করেছেন। ওবামা জয়ী হলে সবকিছু পরিবর্তন আনবেন। সাথে সাথে আর্থিক ঘাটতিও কাটিয়ে উঠবেন। কিন্তু তা হয়নি। বরং তা আরও প্রকট হয়েছে। অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়েছে। সার্বভৌম ঋণমান কমেছে। সরকারের ঋণ নেয়ার সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়েও শেষরক্ষা হয়নি। সময় গড়িয়েছে কিন্তু সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। এখন বাজেট ব্যয় হ্রাসের ফর্মুলা খুঁজে পাচ্ছে না। তাই তাদের পুঁজিবাজারও বিরূপ আচরণ করছে। যেমন, গত অক্টোবর-ডিসেম্বর কোয়ার্টারে ডাউ জোনসের সূচক প্রায় ১০০ পয়েন্ট বেড়েছে। এর সহজ অর্থ বিনিয়োগ লাভজনক হয়েছে। সাধারণ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে ভাল জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০১২ সালের শেষ কোয়ার্টারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শূন্য দশমিক এক শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এসব বিভিন্নমুখী টানাপোড়েনের ফলে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সাম্প্রতিককালে অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ বাড়িয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিমূলক কর্মসূচিগুলো জোরদার করেছে। দেশ-বিদেশে প্রায় এক কোটি বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বিশ্বমন্দার অভিঘাত সত্ত্বেও গত চার বছর ধরে গড়ে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধি টেকসই এজন্য হয়েছে যে, গত চার বছরে দারিদ্র্য প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। সরকারের সুষম প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতি ও আন্তরিকতা এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের জন্য বেশ প্রণোদনা যুগিয়েছে। সরকারের এ কল্যাণধর্মী মানসিকতা বজায় রাখতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। সে চেষ্টাটি জনগণকেই করতে হবে।
