চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পরপরই নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে নিয়েছিলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ। বিয়ে বিচ্ছেদের ক্ষমতা প্রদানসহ নারীকে দেয়া হয়েছিলো পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার অধিকার। উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই যা ছিলো তখন স্বপ্ন। লিঙ্গগত বৈষম্যের জন্য চীন আজ গর্ব করে। কিন্তু সমাজটা কি আসলেই বৈষম্যহীন? চীনা নারীরা কি ভোগ করছে সমঅধিকার? সমঅধিকার আছে ঠিকই, তবে তা কাগজে-কলমে। ১৯৮০’র দশকে নতুন অর্থনৈতিক যুগ সূচিত হবার পর থেকেই চীনা নারীদের ভাগ্যের চাকা দ্রুত ঘুরছে। এলিট শ্রেণির মেয়েদের জীবনযাত্রা দেখলে ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়। সম্পদশালী পরিবারের মেয়েরা উঁচুমানের শিক্ষা গ্রহণের পর কাজ করছে বহুজাতিক কোম্পানিতে। গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া তাদের জন্য কোনো ব্যাপার না। কিন্তু অগণিত গরীব বোনের কী খবর? কেমন কাটছে তাদের দিনকাল? উত্তর একটাই— নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। পাল্টেছে শোষণের ধরন। সেগুলো দূর করতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে এখনো অনেক কিছু করতে হবে।
বেশ্যাবৃত্তি বিষয়ক কোনো খবরই তো পত্রিকায় আসার কথা নয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম এ পেশাটি চীনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় ১৯৫০’র দশকে। সেই সঙ্গে ব্যবস্থা করা হয়েছিলো পতিতাদের পুনর্বাসনের। তবে আজো কেনো টিকে রয়েছে যৌনবাণিজ্য? পতিতালয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই, কিন্তু ম্যাসাজ পার্লার ও হেয়ার সেলুনে অর্থের বিনিময়ে সেক্সের প্রস্তাব দিচ্ছে অসংখ্য নারী। কেউ কেউ বলছে চীনে বারবনিতার সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। বাজার অর্থনীতি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও পণ্য বানিয়ে ছেড়েছে চীনের নারীকে। ১৯৮০’র দশকের শুরু থেকেই কাজের সন্ধানে হন্যে হয়ে ওঠা গ্রামীণ মহিলাদের স্রোত বইতে থাকে শহরের দিকে। ফলে শহরে নিম্নবিত্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে হু-হু করে। এক পর্যায়ে নারী অনুভব করলো, অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেকে বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই তার সামনে। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে যোগ দেয় বৈশ্বিক মহামন্দা। চায়নিজ উইম্যান স্টাডিজের উপর বিশেষজ্ঞ সমাজবিজ্ঞানী সুং ঝংজিনের অভিমত, পুঁজিবাদী নীতি অনুসরণ করার কারণে চীনা নারীদের পণ্য না হয়ে উপায় নেই। অনেক চাকরির বিজ্ঞাপনে ইদানিং লেখা থাকে— আপনি কি ১.৬ মিটার লম্বা? তার ওপর যদি সুন্দরী হন, তাহলে আপনাকেই খুঁজছে আমাদের কোম্পানি। আপনি সুযোগটা তাড়াতাড়ি গ্রহণ করুন।
মুুখে বলা হয় সমতার কথা, অথচ নারী-পুরুষের বৈষম্য সর্বত্রই বিদ্যমান। রাষ্ট্র-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় ফ্রি-ডে কেয়ার সার্ভিস চালু থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেলায় তা চোখে পড়ে না। সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির উইম্যানস হিসোটারি বিভাগের অধ্যাপক জিয়াং জিং বলছিলেন, ‘ সদ্য গ্র্যাজুয়েট হওয়া একজন নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি কাঠখড় পোড়ানোর পর চাকরি খুঁজে পায়। চাকরিদাতা চিন্তা করে, এ মহিলার ক’দিন পরেই বিয়ে হবে। সন্তান জন্মদান উপলক্ষে তখন তাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে। এর চেয়ে বরং কোনো পুষরুকে চাকরিটা দিয়ে দেয়াই ভালো।’
নারী যদি অসাধারণ কোনো কিছু প্রমাণ করতে পারে তাহলে তার চাকরিটা পেতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু সাধারণ মানের হলে উঁকি দেয় রাজ্যের প্রশ্ন। অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাও জেন্ডার সমতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল নন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফেং দংজিয়াং রাষ্ট্র পরিচালিত একটি ব্যাংকে চাকরি পেতে দরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু ইন্টারভিউয়ের আগে জানতে পারেন, ব্যাংটি যোগ্যতার চেয়ে পুরুষদেরকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। এর সত্যতাও খুঁজে পান তিনি। কারণ ব্যাংকটিতে কর্মরত একশ’জনের আশিজনই পুরুষ। শেষ পর্যন্ত ইন্টারভিউ দিতে যাননি ফেং দংজিয়াং। মন মতো চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। মঝে মধ্যে তার মনে হয় নারী হয়ে জন্মানোটাই বুঝিই অপরাধ।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষের অন্তর্ভুক্তি এখন সমানে সমান। ১৯৮০ সালেও নারীর অংশগ্রহণ ছিলো মাত্র ২৩ শতাংশ। শিক্ষায় নারী উন্নতি করলেও চাকরির ব্যাপারে এখনো বৈষম্যের শিকার। সিনাহারা নামক জরিপ সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে হোয়াইট কলার পুরুষদের গড় বেতন ছিলো ৪৪ হাজার ইউয়ান (৬,৪৪১ মার্কিন ডলার )। সে জায়গায় হোয়াইট কলার নারীরা ১২ মাসে গড়ে উত্তোলন করেছিলো ২৮ হাজার ৭০০ ইউয়ান (৪,২০১ মার্কিন ডলার)। ব্যবসাতেও নারীরা ভালো করছে। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেককে বড় পদ দেয়া হয় না। চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় সিনিয়র ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব পালনকারীদের মাত্র ৩০ শতাংশ হচ্ছে মহিলা।
চীনা সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু এটি কার্যকর করা খুব কঠিন। যেমনটি বলছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যানস সেন্টার ফর লিগাল এইডের পরিচালক লি ইং, ‘আমাদের সংবিধান খুব সুনির্দিষ্ট নয়; অনেক কিছু পরিষ্কারভাবে লেখা নেই। শুধু জেন্ডারের কারণে আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন— এ বিষয়টি কোর্টে গিয়ে প্রমাণ করা খুব কঠিন।’ নীতিনির্ধারক মহলেও রয়েছে বৈষম্য। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২০৪ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটিতে মহিলা রয়েছেন মাত্র ১৩ জন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ৭০ মিলিয়ন মিলিয়ন সদস্যের মাঝে মাত্র ২০ শতাংশ মহিলা।
জেন্ডার সমস্যা চীনের সর্বত্র। তবে বসে নেই; সমস্যা দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গৃহনির্যাতন বন্ধে দেশব্যাপী প্রচার চালানো হচ্ছে। যৌন লাঞ্ছনা বিরোধী নতুন আইন জারি করা হয়েছে। বড় শহরগুলোতে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন পতিতাবৃত্তি এড়ানোর বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছে। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, শহরে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে খুবই সচেতন। প্রতারণার শিকার হয় মূলত গ্রাম থেকে উঠে আসা নারীরা। দারিদ্র্যের কারণে এরা সহজেই ফাঁদে পা দেয়। এ নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে টক শোর আয়োজন করা হয় প্রায়ই। সবাই একটি বিষয় স্বীকার করেন, শুধু নারীরা সচেতন হলেই বৈষম্য দূর হয়ে যাবে না। সঙ্গে পুরুষদেরও মন মানসিকতারও পবিবর্তন প্রয়োজন।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে
