গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়ায় মানুষ দ্রুত পরিবর্তনের যে আশা করেছিল, বাস্তবিক অর্থে তেমন পরিবর্তনের ছোঁয়া সেখানে আসেনি কিংবা আসলেও তা খুবই সামান্য। তারা বলছেন, এখনকার এই পরিবর্তন তাদের আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত ফসল নয়। আন্দোলনে বিজয়ের মাধ্যমে কল্পনার যে ছবি তারা এঁকেছিলেন, তার সাথে বর্তমান লিবিয়ার কোন মিল নেই। তাদের বক্তব্য, গাদ্দাফি বিরোধী আন্দোলনের পর দুই বছর কেটে গেলেও আজও তাদের বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি। বিবিসির রানা জাওয়াদ সমপ্রতি তার এক লেখনীতে বলেছেন, অনেক লিবীয় মনে করেন, নতুন সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর সে অর্থে কোন অগ্রগতি তারা দেখতে পাননি। আগামীতেও তা কতটা দেখা যাবে তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়।
বিলাল বেতামের সে দেশের সরকারের একজন কট্টর সমালোচক। সহসাই তিনি সবকিছু সহজে মেনে নেন না। যেখানেই অনিয়ম, সেখানেই তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তারচেয়েও বড় পরিচয় গাদ্দাফি বিরোধী আন্দোলনের প্রথম কাতারে যে সব ব্যক্তির নাম উঠে আসে তার মধ্যে তিনি অন্যতম। বেতামের বলেন, যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আমরা দীর্ঘদিনের ঘুণে ধরা শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছি, বিপ্লবউত্তর লিবিয়ায় তার ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা যে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আশা করেছিলাম নতুন সরকার আসার পরে তার ছিটেফোঁটাও হয়নি। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে বলতেই হচ্ছে নতুন এক বিপ্লব দরকার। সবকিছু ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন এক লিবিয়া দেখতে এর চেয়ে বিকল্প কিছু আর হতে পারে না। আইন বিষয়ে পড়াশুনা করা বেতামের বেনগাজিতে আন্দোলনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এখান থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। পরে এই আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল গোটা লিবিয়ায়। একে একে পতন ঘটে লিবিয়ার অনেক শহর। লৌহমানব গাদ্দাফির শক্ত ঘাঁটিগুলোও এই আন্দোলনের ফলে তছনছ হয়ে যায়। অবসান ঘটে ৪২ বছরের শাসনামলের। কিন্তু যে বেনগাজি থেকে আন্দোলনের শুরু সেখানকার বর্তমান চিত্র এখন ভিন্ন। হয়নি এখানে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন। উল্টো এটা এখন হত্যা, লুণ্ঠন আর উগ্র ইসলমপন্থিদের কেন্দ্রস্থল হিসাবে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। সরকার সেখানে নিরপত্তার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিলেও বেনগাজিবাসী মনে করছেন, এর পাশাপাশি এখানে দরকার দ্রুত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন। কেননা বিধ্বস্ত লিবিয়ায় অন্যান্য স্থানের ন্যায় এখানেও দরকার ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম।
বেনগাজিতে উন্নয়ন থমকে যাওয়ায় বেতামের গত বছরের শেষের দিকে আবারো সেই উত্তাল বিক্ষোভের রেশ ধরে রাখার তাগিদে সবাইকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এটা ওই সময়ের ঘটনা যখন বেনগাজিতে মার্কিন কনস্যুলেট অফিসে হামলায় রাষ্ট্রদূত ক্রিস স্টিভেনসসহ চার আমেরিকান নাগরিক নিহত হন। সে সময়ে আন্দোলনে জনতার জোয়ারে অনেক মিলিশিয়া ঘাঁটি তারা উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের গতি এখনও সেখানে দেখা যায়। মনে হয় ঘুমিয়ে পড়া লিবিয়া আবার জেগে উঠছে। বেতামের বলেন, বেনগাজি নিজেই এখন এক যোদ্ধা।
এটা ক্রমশ নতুন আন্দোলনের মাত্রা যোগাচ্ছে। সরকার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় আবারো আপামর জনতা ফুঁসে উঠছে। তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে জরুরি যে বিষয়টি দরকার তা হলো, মিলিশিয়াদের ভেঙ্গে দিয়ে পুলিশের হাতকে শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, বিপ্লবউত্তর লিবিয়ায় আর একটি বিপ্লব দরকার। আমরা চেয়েছিলাম একটা শক্তিশালী লিবিয়া গড়ে তুলতে। আমরা গাদ্দাফির কথা চিরতরে ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন কী দেখতে পাচ্ছি? এই লিবিয়া কী আমরা চেয়েছিলাম? তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগ আমার মতো অনেকেরই।
গাদ্দাফিকে হত্যার পর অন্তর্বর্তী সরকার আসে। তাদের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। অনেকে যারা এ যুদ্ধে আহত হয়েছেন, তাদের প্রতিও সরকার দায়িত্ব পালন করছে না। যুদ্ধাহতদের সাহায্যের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল, তা-ও আজ দুর্নীতির কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে। অথচ দেখা গেছে, অনেকেই উন্নত চিকিত্সার জন্য বিদেশে গিয়েছেন, তারা আসলে এই সংগ্রামে আহত হননি।
এদিকে দেশটিতে গত জুলাইয়ে নির্বাচিত ২শ’ জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যর ওপর জনগণের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। যদিও এই সংকট তারা উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন। তারপরও সেখানে বিদ্যমান সংকট নিরসনে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে এই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। তারা একটি কাজ করে দিচ্ছেন তাহলো- একটা বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের মাধ্যমে খসড়া সংবিধান তৈরি করছেন। তবে এক্ষেত্রে অনেক বিতর্কিত বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতো কিছুর পরও বেতামের হতাশ নন। তিনি বলেন, আমি যথার্থই ইতিবাচক, কেননা আমাদের মাঝে সততা রয়েছে। সেই সততা দিয়েই আমরা সব জরাজীর্ণতাকে দূরে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবো। বেতামের বলেন, প্রধানমন্ত্রী আলি জিদানের নেতৃত্বে একটি নতুন মন্ত্রিসভা দুই মাস আগে গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনাও হয়েছে।
গত সপ্তাহে কংগ্রেস অবশ্য একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, কীভাবে সাংবিধানিক প্যানেল গঠিত হবে। এক্ষেত্রে জনগণ তিনটি অঞ্চল থেকে ২০ জন বিশেষজ্ঞ নির্বাচিত করবে। তিনি বলেন, আমাদের এখন প্রয়োজন হয়ে উঠেছে এমন একটা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে করে সকল লিবিয়ার অধিকার নিশ্চিত করা যায়। তবে আমাদের এ বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে যে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গ্রুপ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভেতরে ভেতরে কাজ করে যাচ্ছে।
যা হোক, গাদ্দাফি পরবর্তী লিবিয়ায় যে এখন কঠিন সময় যাচ্ছে কিংবা সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে তা বোধ হয় বলা নিষ্প্রয়োজন। তারপরও দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর দেশটিতে শান্তির পতাকা উড়ুক, এটাই সকলের কাম্য। এক লৌহমানবের যবানিকাপাতের পর সেখানে গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে যাক এ প্রত্যাশা সবার। কেননা দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেখানে ছিল না কোন গণতন্ত্রের চর্চা। জাতিগত দাঙ্গা, ঝগড়া-বিবাদ রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল গাঁথা। সবকিছুকে কাটিয়ে দেশটি পুরনো গ্লানি মুছে নতুন ইমেজ তৈরি করুক সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ববাসী।
