যুক্তরাষ্ট্রের গেলো নির্বাচনের আগে আগস্ট মাসে শিকাগোতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যে ভাষণ দিয়েছেন তাকে এখনো আমেরিকাবাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আশা হিসেবে ধরা হয়। ওই ভাষণে ওবামা মার্কিন জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি কে তা কোনো বিবেচ্য নয়, আপনি দেখতে কেমন তাও বিবেচ্য নয়, আপনি কোথা হতে এসেছেন তাও বিবেচ্য নয়, আপনার নামের শেষে কি আছে তাও বিবেচ্য নয়, আপনি কি ভালোবাসেন তাও বিবেচ্য নয়, আমেরিকা এমন জায়গা যেখানে আপনি সবকিছু করতে পারেন।’ বিশ্লেষকদের মতে, ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে বিজয়ের পেছনে এ বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো। তবে ওবামার বক্তব্যের এ সমালোচনাও যে হয়নি তা নয়। রিপাবলিকানরা তখন বলার চেষ্টা করেছিলেন যে, ওবামার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ইউরোপিয়ান স্টাইলের সমাজের দিকে নিয়ে যেতে চান। তবে পক্ষে-বিপক্ষে যে কথাই আসুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় দুই পক্ষই তাদের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রবাসীর জন্য একটি সমান সুবিধা সম্বলিত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তবে এবার শুধু নতুন নয়, গত এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো দেশটির নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত থাকা। বর্তমানে সমসুবিধা ভোগের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক নেমে এসেছে। তালিকায় ক্রম অনুসারে ভালো আছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানী, নরওয়ে, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য। এর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। তবে এর আরো পেছনে তাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীদের সুযোগ-সুবিধা আরো কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ধনী এবং গরীবের ব্যবধান ছিলো প্রকট। এরপর এ ব্যবধান আস্তে আস্তে কমতে থাকে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর থাকলেও সেটি এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। অর্থনীতি কৃষি থেকে শিল্পে রূপান্তরিত হবার কারণে বিশাল একটি শ্রমশক্তি সেদিকে ধাবিত হয়েছে। সবার জন্য বিনা খরচে প্রাথমিক সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপক বিকাশ হয়েছে। তবে ১৯৭০ সালের কয়েক বছর পর যুক্তরাষ্ট্র উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে। আর্থ-সামজিক অবস্থা বদলের সাথে সাথে দেশটির ধনী-গরীবের ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে। মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণীর লোকের সম্পদের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কম আয়ের মানুষের সম্পদ কমতে থাকে। এসব পরিবারে যারা যারা জন্ম নিচ্ছেন তারা তাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে পারছেন না। পড়ালেখার বাইরে মিউজিক স্কুল বা ভ্রমণ— এসব কিছুই নেই তাদের জীবনে। আর অপেক্ষাকৃত কম আয়ের বাবা-মা তাদের সন্তানদের পড়াশুনা করাতে পারলেও ভালো যোগাযোগ থাকার পরও এসব পরিবারের সন্তানরা ভালো চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন না। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, গরীব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বাবারা তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন গরীব দেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। এজন্য তাদের ইংরেজি ভাষায় দখলও কম। এছাড়া আরেকটি বিষয় এখানে উদ্বেগের তা হলো ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে যারা জেলে গিয়েছেন তাদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। অপরাধের রেকর্ডের বিষয়টি মাথায় নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব পরিবারের কাউকে চাকরি দিতে চাইতো না। এখানে এখন একটি সামাজিক বিষয়ও এসে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেমন উচ্চবিত্তের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যদের বিয়ে হচ্ছে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ প্রবণতা কম। এর ফলে যার যে অবস্থান সে তাতেই থেকে যাচ্ছে। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ধনী এবং গরীবের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে সমাজে একটি অস্থিরতা তৈরির আভাষ দিচ্ছেন অনেকে।
গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীও অনেক দুর্বল হয়েছে। যে পরিবারের দুইটি সন্তান আছে তারা বছরে সরকার থেকে মাত্র এক হাজার মার্কিন ডলার সুবিধা পেয়ে থাকে; কিন্তু অন্যান্য দেশে যেমন কানাডার সাথে তুলনা করলে এটি একবারেই সামান্য। কানাডায় স্বামী-স্ত্রী যদি চাকরিজীবী হন আর তাদের যদি দুইটি সন্তান থাকে তাহলে ওই পরিবারকে সরকার বছরে তিন হাজার ডলার দিয়ে থাকে। আর পরিবার যদি চাকরি না করে তাহলে সরকার ছয় হাজার ডলার দিয়ে থাকে।
তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ধনী-গরীবের ব্যবধান কি বাড়তেই থাকবে? এ নিয়ে সরকার কি কোনো চিন্তা করছে না? অবশ্যই চিন্তা করছে; কিন্তু এ সমস্যা মোকাবেলায় সবচেয়ে কঠিন কাজটি এখন চালিয়ে যেতে হচ্ছে ওবামা প্রশাসনকে। যে বিষয়টির দিকে ওবামা প্রশাসন এখন সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছে তা হলো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা। এ কাজটিও একেবারে সহজলভ্য নয়। কারণ প্রযুক্তির উত্কর্ষের এ যুগে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। গত কয়েকে বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেখানে শিল্প স্থাপনের হার ক্রমেই কমে আসছে। উদ্যোক্তারা ক্রমাগতভাবে কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ধনী এবং গরীবের ব্যবধান সেখানে কতটা কমিয়ে আনা যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
