বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলা অবস্থায়ই এই শঙ্কা প্রথম আলোচনায় এসেছিল। এখন শঙ্কাটা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। জাতীয় দল থেকে একজনের পর একজন খেলোয়াড় ছিটকে পড়ছেন ইনজুরিতে। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিদিন সকালে প্রশ্ন তৈরি হয়—আজ নতুন কেউ ইনজুরিতে পড়ল না তো?
জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের এরকম মিছিলের মত ইনজুরির কবলে পড়তে থাকাটা বিস্ময়কর একটা ব্যাপার বৈকী! এমন ঝাক ধরে খেলোয়াড়দের ইনজুরিতে পড়ায় আঙুল উঠছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দিকে। আবার ক্রিকেট বোর্ড ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দায়ী করছে খোদ খেলোয়াড়দেরই। এখন বোর্ড সূত্র বলছে, খেলোয়াড়দের এরকম ইনজুরি থেকে দূরে রাখতে তারা খুব দ্রুতই কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন।
বলাই বাহুল্য যে, সাকিব আল হাসান, এনামুল হক জুনিয়র, নাঈম ইসলাম, শাহরিয়ার নাফীসদের এই ইনজুরিতে বিরতিহীন ক্রিকেট প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে। ফলে অভিযোগ উঠছে যে, কেন তাদের বিপিএলে খেলার ওপর একটু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হল না?
বিসিবির ডাক্তার দেবাশিষ চৌধুরী বিপিএল চলাকালীন এরকম ইনজুরির ঝুঁকিতে থাকা ক্রিকেটারদের একটা তালিকা তৈরি করে বিপিএল কমিটির কাছে হস্তান্তর করেন। ছোটখাটো ইনজুরি রয়েছে এমন কয়েকজন ছিলেন সেই তালিকায়। ইনজুরিগ্রস্ত খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। কিন্তু বিপিএল কমিটি সেটা মানেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিসিবির ডাক্তার বলেন, ‘আমরা পাঁচজনের একটা তালিকা তৈরি করে বিপিএল কমিটির কাছে দিয়েছি। কিন্তু সেটা আংশিক মানা হয়েছে। পুরোটা মানলে হয়তো এরকম হত না’।
কিন্তু বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলরের সদস্য সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিক এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তিনি বরং বলছেন, খেলোয়াড়রা তাদের নির্দেশ সত্ত্বেও বিশ্রাম নিতে রাজী হননি, ‘দেখুন, আমরা অবশ্যই এ ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। ইনজুরিতে রয়েছে এমন সব খেলোয়াড়কে আমরা বলেছিলাম বিশ্রাম নিতে। কিন্তু তারা আমাদের কথা মানেনি। তারা দাবি করেছিলেন, সমস্যা নেই। আমাদের তো খেলোয়াড়দের কথা বিশ্বাস করতে হবে’।
জানা গেছে, বিপিএলের লিগ পর্ব খেলা শেষে সাকিব আল হাসান তার পায়ে ব্যাথা অনুভব করেছিলেন। বিপিএল কমিটিকে সেটা জানিয়েছেন তিনি। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল তাকে তখনি অস্ট্রেলিয়ার ডাক্তার দেখানোর কথা বলেছে। কিন্তু সাকিব সেটা মানেনি। বলেছেন, বিপিএল শেষে তিনি অস্ট্রেলিয়া যাবেন।
খেলোয়াড়দের এরকম ইচ্ছার কাছে বিপিএল কমিটিও অসহায় ছিল। অসহায়ত্বের কথা স্বীকারও করেছেন মল্লিক, ‘ব্যথা তো চোখে দেখা যায় না। এখন কোন খেলোয়াড় যদি তাদের ইনজুরি লুকিয়ে খেলতে থাকে; তাহলে আমরা কি করতে পারি? বিপিএল শেষে এখন সবাই বলছে, ব্যথা আছে। যেমন নাঈম ইসলাম তার নিজের ব্যথা লুকিয়ে খেলেছেন। এমনটাই অভিযোগ করেছে নির্বাচক কমিটি। বিপিএল শেষ, এখন সে ব্যথা অনুভব করছে’।
প্রধান নির্বাচক আকরাম খানকেও খেলোয়াড়দের ইনজুরি নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কাল নাফীসের হাত কেটে যাওয়ার পর আকরাম খান বলেন, ‘খেলোয়াড়দের অবশ্যই ফিটনেসের উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। এনামুল যেমন তার চোটের কথা বলেননি। তার এই ব্যথা পুরানো। তিনি অনেক আগেই ফিজিওয়ের পরামর্শ নিতে পারতেন’।
ইনজুরি নিয়ে খেলোয়াড়দের লুকোচুরি বন্ধ করতে অবশ্যই খুব শীঘ্রই বিসিবি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। জাতীয় স্বার্থের কথা আগে চিন্তা করতে হবে। পরে অন্য কিছু। কাল বিসিবির পরিচালক মল্লিক সেরকমটাই জানালেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি বিসিবির সভা আছে। খেলোয়াড়দের ইনজুরির প্রসংগ নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে চাই। ভবিষ্যতে খেলোয়াড়রা আগে জাতীয় দলের খেলা নিয়ে ভাবতে হবে। তারপর প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল এমনকি আইপিএল খেলার কথা ভাবতে পারবে’।
জানা গেছে, বিসিবির কাছে অনেক খেলোয়াড় আইপিএল খেলার অনুমতি চেয়েছে। বিসিবি যদি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে এ ধরনের টুর্নামেন্টও খেলতে পারবে না খেলোয়াড়রা। ইনজুরি লুকিয়ে খেললে বিসিবিও কিছু করার থাকে না ঠিকই কিন্তু খেলোয়াড়দের উপরও বিসিবির নজরদারি থাকাটা জরুরি। বিসিবির ডাক্তার দেবাশিষ বললেন, ‘আসলে সেভাবে দায় চাপাতে হলে অবশ্যই খেলোয়াড়দের উপরই বর্তাবে। কারণ তারা যদি ব্যথা লুকিয়ে খেলে, সেক্ষেত্রে বিসিবিই বা কি করবে?’
শ্রীলংকার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টের আগে এনামুল, নাঈম ও নাফীসের পর আর কতজন ইনজুরিতে পড়বে? এমন প্রশ্নে অবশ্য বিসিবির ডাক্তার বরং অভয় দিলেন, ‘দেখুন যাদের ছোটখাটো ইনজুরি রয়েছে, তাদেরকে আমি দেখেছি। মনে হয় না তাদের খুব বেশি সমস্যা হবে। তাছাড়া তারাও বলছে না তাদের ব্যথা কিংবা ইনজুরি রয়েছে। মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে আমি দেখেছি। তারা ঠিক আছে। শফিউল ইসলাম লংগার ভার্সন ক্রিকেট খেলতে পারবে না। কারণ সে দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ভালো অনুভব করলেও তৃতীয় দিন আর পারে না। একদিন বিশ্রাম নিলে চতুর্থ দিন থেকে সে পারে। এছাড়া শ্রীলংকা সফরে যারা স্কোয়াডে রয়েছে, তাদের আপাতত কোন সমস্যা নেই’।
