দেশের স্বাস্থ্যখাত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। তাদের অভিমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়াদি অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে অপরাপর সংক্রামক ব্যাধিসমূহও সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দ্রুত রোগী শনাক্ত এবং এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া গেলে ম্যালেরিয়াজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব। যদিও ইতিমধ্যেই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। দেশে ২০০৫ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৫০১ জন মানুষ প্রাণ হারায়। অথচ ২০১২ সালে এসে এই সংখ্যা মাত্র ১১ জনে নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দৈনিক ইত্তেফাক ও ব্র্যাক যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খোন্দকার মোহাম্মদ সিফায়েতউল্লাহ, ম্যালেরিয়া গবেষক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজ, ব্র্যাক-এর স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা কর্মসূচির ড. মো: আকরামুল ইসলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এনপিও ডা. এম এ মান্নান বাঙ্গালী প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত। অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল কনসালটেন্ট ডা. কামরুন্নাহার সুলতানা, আইসিডিডিআরবি’র সায়েন্টিস্ট ডা. ওয়াসিফ আলী খান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. রুবেদ আমিন, এম এন্ড পি ডি সি’র ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. জহিরুল করিম, নিপসম (এনআইপিএসওএম)’র সহকারী অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির, সাজিদা ফাউন্ডেশনের অ্যাডভাইজার ডা. শামসের আলী খান, সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ণ সংস্থা (স্কাস)’র নির্বাহী পরিচালক জেসমিন প্রেমা, ইত্তেফাক-এর সিটি এডিটর আবুল খায়ের, চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক-স্বাস্থ্য ডা. শেখ সাহাবুদ্দীন আহমেদ, খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. হাসান ইমাম চৌধুরী, বিএআরডির পরিচালক (প্রোগ্রাম), শাহিদ উদ্দিন মাহমুদ, দৈনিক অরণ্য বার্তার সম্পাদক চৌধুরী আতাউর রহমান রানা প্রমুখ।
অধ্যাপক ডা. খোন্দকার মোহাম্মদ সিফায়েতউল্লাহ বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে। এছাড়া যক্ষ্মাসহ সবধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিই সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এজন্য সরকারের দায়বদ্ধতা, জনসচেতনতা ও গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে। অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজ বলেন, ম্যালেরিয়া রোগীকে রোগ নির্ণয়ের জন্য আগে হাসপাতালে যেতে হতো। কিন্তু এখন হাসপাতালই অনেকটা রোগীর কাছে চলে এসেছে। দেয়া হচ্ছে কার্যকর ওষুধ।
ড. মো: আকরামুল ইসলাম বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা মাঠ পর্যায় থেকেই নিতে হবে।
ডা. এম এ মান্নান বাঙ্গালী বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন এখন একটি ফ্যাক্টর। এটি নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা এমনভাবে নিতে হবে যাতে আমাদের হাতে প্রচুর অবকাঠামো, লোকবল ইত্যাদি না থাকার পরও আক্রান্তদের যথেষ্ট চিকিত্সা সেবা দেয়া যায়। ডা. কামরুন্নাহার সুলতানা বলেন, ম্যালেরিয়া হলে কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, ম্যালেরিয়া থেকে দূরে থাকতে কি করতে হবে, সেসব বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। একটা সময় আমরা অবশ্যই ম্যালেরিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। ডা. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, আমরা দেখতে চাচ্ছি কোথাও কোন গ্যাপ আছে কিনা। সেটা বের করতে হবে। ম্যালেরিয়া প্রবণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিশেষায়িত মশারি দেয়া হচ্ছে। তারা ঠিকমতো তা ব্যবহার করছে কিনা সেটা দেখতে হবে। ডা. রুবেদ আমিন বলেন, পার্বত্য এলাকায় অনেক মানুষ কাঠকাটাসহ বিভিন্ন কাজে যায়। সেখানে তারা মাচায় থাকে। এ অবস্থায় সেখানে মশারি কাজ করবে কিনা তা দেখতে হবে। কিছু কিছু জায়গায় এখনো সমস্যা রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্র্যাকের কর্মীরা একেবারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করছে, এটা খুবই প্রশংসনীয় ব্যাপার।
ডা. জহিরুল করিম বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের চেয়ে কমে এসেছে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে ২০১৫ সালের যে লক্ষ্য তা কিন্তু আমরা ২০১২ সালেই অর্জন করে ফেলেছি। ডা. ইকবাল কবির বলেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী ম্যালেরিয়া কমছে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে জলবায়ু পরিবর্তনের ট্রেন্ড এ্যানালাইসিস করতে হবে। ঋতু পরিবর্তনের ফলে ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন ঘটে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। ডা. শামসের আলী খান বলেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম তা ইতিমধ্যেই পূরণ করে ফেলিছি। এখন ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর হার কমেছে। ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকায় প্রত্যেকটি উপজেলায় বিশেষজ্ঞ দিয়ে টিম গঠন করার পরামর্শ দেন তিনি। জেসমিন প্রেমা বলেন, ম্যালেরিয়া নির্মূলে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠ পর্যায়ে অনেক কষ্ট করে কাজ করতে হয় আমাদের। ভালো কাজের স্বীকৃতি চাই আমরা।ডা. শেখ সাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, ম্যালেরিয়ায় প্রতিটি মৃত্যুই কিন্তু আমরা রোধ করতে পারি— যদি সময়মতো চিকিত্সা দেয়া যায়।
ডা. হাসান ইমাম চৌধুরী বলেন, ২০১২ সালে খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়ায় ৬ জন মারা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এরা দুর্গম এলাকায় বাস করে। অর্থাত্ ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় তারা সময়মতো হাসপাতালে আসতে পারেনি। এখন আমরা এখানকার কমিউনিটি হাসপাতালগুলোতে ম্যালেরিয়া চিকিত্সা কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। শাহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, মানুষের যেমন মাইগ্রেশন হয়, তেমনি মশারও হয়। তাই মহেশখালীকে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করা যায় কিনা তা দেখতে হবে। শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, শুধু ম্যালেরিয়া নয়, সব ধরনের রোগ থেকে সচেতন করতে হেলথ এডুকেশনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। তাহলেই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে বলা অধ্যাপক ডা: বে-নজির আহমেদ বলেন, দেশের দেড় কোটি লোক এখনো ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি চলছে। এর ফলে ম্যালেরিয়া বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন শুধু প্রতিরোধ নয়, সরকারের লক্ষ্য ম্যালেরিয়া নির্মূল করা।
