ভ্যালি ট্রান্সপোর্টের পেটমোটা ট্যাক্সি-ভ্যানে চেপে আমরা অবশেষে আমহার্স্ট শহরের নর্থ-ভিলেজে এসে হাজির হই। গাড়ির দীর্ঘকায় পক্ব গোঁফ ড্রাইভার দিব্যি খোশমেজাজে আমাদের স্যুটকেস-বাক্স-পেটরা নামাতে মোদদ দেন। হলেন চাবি হাতে দু-কামরার অ্যাপার্টমেন্টের দিকে যায়। কাজরি তার পুতুলের ঘর-সংসার জামা-কাপড়ে পূর্ণ চাকাওয়ালা স্যুটকেসটি টেনে টেনে তাজ্জব হয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। আমি ও ড্রাইভার ধরাধরি করে পরপর এগারোটি স্যুটকেস এনে অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় স্থাপন করি। আমরা আমহার্স্ট শহরে ফিরে এলাম প্রায় বছর সাড়ে পাঁচ বা ছয়ের পর। ম্যাসাচুসেটসের এ শহরে আজ আমরা আগন্তুক বটে কিন্তু একেবারে নতুন নই। চাকরি উপলক্ষ্যে লাওসে যাওয়ার আগে নব্বই দশকের গোড়া থেকে এখানে প্রায় বছর চার-পাঁচেক ছিলাম। আমি ও হলেন নর্থ-ভিলেজের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে যেতাম। এখানকার এক হেলথ ক্লিনিকে তীব্র বরফঝড়ের দিনে আমাদের মেয়ে কাজরির জন্ম হয়। আমহার্স্ট-সংলগ্ন বনানীতে কবি রবার্ট ফ্রস্টের স্মৃতিময় ফ্রস্ট ট্রেইলে আমরা অনেকবার একত্রে হেঁটেছি। তাই দীর্ঘদিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ লাওসে বসবাসের পর এখানে আসতে পেরে বেশ ভালোই লাগে।
লাওসের ভিয়েনচান শহর ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আমহার্স্ট পর্যন্ত আসতে আমাদের সপ্তাহ দুই লেগেছে। আসার পথে আমাদের প্রথম যাত্রাবিরতি হয় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরে। ব্যাংককে আমরা পরিপূর্ণ মেডিকেল চেক-আপ করিয়ে নিই—যাতে ট্র্যপিকসের বীজাণুরাশি আমাদের যাত্রাসঙ্গী হয়ে আমেরিকাতে আসতে না পারে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছেড়ে যাচ্ছি, আর কখনো নাও আসতে পারি—এ উত্কণ্ঠায় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিদায়-ভোজে মিলিত হতে, শেষবারের মতো ব্যাংককের চকমিলান বিপণীতে শপিং করতে করতে দিন কতক কেটে যায়। ব্যাংকক থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে উড়ে আসা বিড়ম্বনা বিশেষ। প্লেনে সারা দিন সারারাত বসে থেকে থেকে হাঁটু ও কোমরে রস বাতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আমরা অতি স্বল্প দিনের জন্য তাইপেতে থামি। থাইওয়ানের রাজধানী তাইপের হোটেলে দিনযাপন ব্যায়বহুল, তবে চীনা কেতায় প্রস্তুত সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ চেখে অপরিকল্পিতভাবে খানিক রেস্ত গচ্চা দেওয়াতেও সান্ত্বনা পাওয়া যায়। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে এসে—আমহার্স্টে আসার আগে আমাদের শেষ মঞ্জিল হয় সিয়াটলের কাছাকাছি পিজিট-সাউন্ড নামক প্রশান্ত মহাসগারীয় জলভাগের একটি ছোট্ট সবুজ দ্বীপ। দ্বীপটিতে হলেনের আত্মীয়স্বজনদের বাস। তাই বিনা ভাড়ায় পাওয়া যায় দিন কয়েক ব্যবহারের জন্য একটি কেবিন। মার্কিন মুলুকে নতুন করে জীবনযাপন করার আগে দ্বীপের সৈকতে দিন কয়েক কর্মহীন ঘুরে বেড়াতে খারাপ লাগে না।
আমহার্স্টে অনেকদিন পর ফিরে আসাতে কেমন যেন অবাস্তব লাগে। চাইলে আরও বছর কয়েক লাওসে কাটিয়ে দেওয়া যেত। আমাদের দুজনের চাকরি-বাকরি ছিল। আয়-উপার্জন মন্দ হতো না। দেশটিতে শান্তি ছিল। আমরা ভিয়েনচান শহরের যে পাড়ায় বাস করতাম—সেখানে কাজরির সঙ্গীসাথীও জুটেছিল। তারপরও আমাদের মন পরিবর্তন চাইল। ইচ্ছে হলো—সব ছেড়েছুড়ে অন্য কোথাও যাই। অনেক বছর হলো আমরা আন্তর্জাতিক পরিসরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত আছি; সুতরাং, নর্থ-কোরিয়া বা ইন্দোনেশিয়াতে কাজ পাওয়া কঠিন কিছু ছিল না। মাস কয়েকের জন্য যেতে পারতাম পূর্ব-তিমুরে। কিন্তু তারপরও কী ভেবে কেন জানি ফিরে এলাম আমহার্স্ট শহরে।
নর্থ-ভিলেজে যে অ্যাপার্টমেন্টটি পেয়েছি, তা সাজসজ্জায় সাদামাটা ও আকারে ছোট। রন্ধন স্পেসসহ মোট তিনটি কামরা। ইতিমধ্যে এক কামরায় কাজরি মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে তার পুতুলদের শোয়াচ্ছে, অন্য কামরায় স্তূপ করে রাখা একাধিক স্যুটকেস, বাক্স, পেটরা, ব্যাগ ও বান্ডিল। হলেন একের পর এক স্যুটকেস খুলে ক্রমাগত খুঁজে চলে দিনযাপনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। একটি ব্যাগে টুথপেস্ট পাওয়া গেলে কোথাও ব্রাশের সন্ধান মেলে না। হঠাত্ করে উত্ফুল্ল হয়ে সে অন্য এক স্যুটকেস থেকে বের করে আনে নাইটি, স্নানের রোব, আমার জন্য একপাটি চপ্পল, দুটি জীর্ণশীর্ণ কলকাতার দেশ পত্রিকা ও কাজরির জন্য শুকনো কিছু খাবার। কাজরি অনুযোগ করে, ‘হোয়াই উই ডোন্ট হ্যাভ এনি ফার্নিচারস ইন দিস হাউস? এ ঘরে চেয়ার-টেবিল কিছু নেই কেন?’ আমি মনে মনে ভাবি, অচিরে বাজারের একখানা ফর্দ তৈরি করে খরিদ করতে হবে বিছানা-বালিশ, খান দুই কুরছি-কেদারা, রেইন-কোট, ছাতা, ডেকচি, কেতলি ও কড়াই।
সাততাড়াতাড়ি যে আমাদের বিপুল আকারের বাজার-সওদা করতে হবে, তা ভেবে আমার মনে রীতিমতো আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। দেশ পরিবর্তনের ট্রানজিসনের সময় সর্বদা হিম্মত ধরে রাখতে হয়। তাই নিজেকে পজিটিভ চিন্তাভাবনায় মশগুল রাখতে চেষ্টা করি। আমহার্স্টে আমরা একেবারে নিঃসঙ্গ একা নই। পুরোনো জামানার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই এখনো এ শহরে বাস করছে। আমাদের এক বন্ধু ফিলিস রবিনসন আমাদের হয়ে অগ্রিম ডিপোজিট রেখে এ অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া করে রেখেছে। এতে আমরা আরও দিনকতক এখানে-ওখানে ভেসে ভেসে হোটেলবাসের গ্লানি থেকে রেহাই পেয়েছি। ফিলিস আমাদের প্রয়োজন হতে পারে বিষয়টি মালুম করে জোগাড়যন্ত্র করেছে সংসার শুরু করার নিত্যদিনের টুকিটাকি। সে মেঝেতে বিছিয়ে রেখেছে মেট্রেস, কম্বল ও বালিশ। তার মেহেরবানিতে ফ্রিজ পূর্ণ হয়ে আছে কমলার রস, পাকা কলা, টাটকা শাকসব্জি, ব্রেকফাস্ট সিরিয়েল ও পাউরুটিতে। এমনকি সে মেঝেতে ছড়িয়ে রেখেছে খান দুই স্থানীয় পত্রপত্রিকা ও জার্নাল।
আমি পত্রিকাগুলো ঈষত্ নাড়াচাড়া করে কিচেন স্পেসে আসি। হলেন একটি প্লাস্টিকের গ্লাসে পানি দিয়ে আফ্রিকান ডেইজি বলে এক ধরনের তাজা ফুল রাখছে। আমি জানতে চাই, ‘স্থান বদলের বিভ্রান্তির মাঝে ফ্রেশ ফুল পেলে কোথায়?’ সে আমার হাতে চমত্কার একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি খেয়াল করোনি! আমাদের বান্ধবী জেনি লেড ফুলগুলোর সাথে এই কার্ডটি পাঠিয়েছে।’ আমি কার্ডখানা পড়ি, আমহার্স্ট শহরে আমাদের ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ করার সাথে সাথে জেনি শান্তিতে নতুন করে জীবনযাপনের কথা লিখেছে। কার্ড পড়ে আর অফ্রিকান ডেইজির মসৃণ পার্পোল বর্না পাপড়িরাজির দিকে চেয়ে যে পরিস্থিতিতে পড়েছি, তা নিয়ে আর নাখোশ হওয়ার কিছু থাকে না।
আমরা ব্যর্থভাবে কিছুক্ষণ অ্যাপার্টমেন্ট গোছানোর চেষ্টা করি। দু-তিন কামরার ছোট্ট ঘরটিতে আসবাবপত্র কিছু নেই বলে কিছুই তেমন সুসার হয়ে ওঠে না। এদিকে বিকেল হয়ে এল। আরও ঘণ্টা দু-তিনেকের মাঝে আহারাদির প্রয়োজন হবে। আমাদের ডেগ, ডেকচি, খুন্তা, চামচ কিছুই নেই যে বাজার থেকে চাল, ডাল, আনাজপাতি এনে রন্ধন চড়ানো যাবে। আমরা ভাবি—শহরের একটি রেস্তোরাঁর দিকে হাঁটলে হয় না।
কাজরিকে নিয়ে পদব্রজে চলাফেরা করা ঝকমারি বিশেষ। তারপরও আমরা নর্থ-ভিলেজ থেকে বেরিয়ে এসে ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটসের চত্বরের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করি। এদিকে কোনো কিছুর পরিবর্তন তেমন হয়নি বলে আমাদের ভারি তাজ্জব লাগে। পথের দু-পাশে সারি সারি সাদা বর্ণের পাথুরে টালিতে ছাওয়া কাঠের বাড়ি। ড্রাইভওয়েগুলোতে দাঁড়িয়ে আছে একাধিক মডেলের রঙ-বেরঙের কার। গ্রীষ্মের শেষে গাছপালার পাতা ঈষত্ হলুদ লালচে হয়ে আসছে। আমাদের পাশ দিয়ে জগ করতে করতে দ্রুত ছুটে যায় ব্যায়ামপ্রিয় যুবক-যুবতীদের দল। বেবি ক্যারেজে বাচ্চাকে শুইয়ে ঠেলে চলেছেন বোধকরি কর্মহীন গ্র্যান্ডমা। একটি পুলিশকার নীল হলুদ আলো ফ্ল্যাশ করতে করতে অলসগতিতে টার্ন নেয়।
বাসস্টপে সাঁটা অসংখ্য লিফলেট, পোস্টার ও ফ্লায়ার। বয়সের ভারে বেজায় রকমের ভারাক্রান্ত অপেক্ষমাণ এক যাত্রী বিরস বদনে স্ট্রো দিয়ে পান করেন ককোকোলা। আমরা রঙচঙে কম্পিউটারে করা লিফলেট পোস্টারের দিকে নজর করি। মনে হয় অনেকেই বিক্রি করতে চাচ্ছে—কম্পিউটার, সিডিরম বা সেকেন্ডহ্যান্ড কার। দামের দিকে খেয়াল করে দ্রব্যগুলোকে আর সস্তা মনে হয় না। আমরা বহু দিনের পুরোনো ম্যাপেল বৃক্ষরাজির ছায়াতলে ধীরে হাঁটি। কাজরি সড়ক থেকে একটি পেনি কুড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘আমার কয়েন কালেকশন বাপি। আই ডোন্ট হ্যাভ এনি আমেরিকান কয়েন ইয়েট?’ সত্যিই তো, সে আমেরিকান মুদ্রা কোথায পাবে? আমরা মেয়েটির মুদ্রা সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটাই না।
ইউনিভারসিটির হাউজিং অফিস ওসাকি-হাউস নামক ভবনটির পাশ দিয়ে হাঁটতে হঁটাতে আমরা স্কুল অব এডুকেশনের লালচে ইট ও ইস্পাতে গড়া দালানের সামনে চলে আসি। আমাদের সামনে চৌরাস্তা। ওয়াক-সাইন জ্বলতে না জ্বলতেই স্কেটবোর্ডে সাওয়ার হয়ে হাত ধরাধরি করে ঈষত্ লম্ফ দিয়ে সড়ক অতিক্রম করে অত্যন্ত স্বল্পবাসের যুবক-যুবতী। ওপারে পৌঁছে ছেলেটি স্কেটবোর্ড হাতে নিলে মেয়েটি জড়িয়ে ধরে তার কোমর। তাদের গতিপথের দিকে চেয়ে থেকে আমাদের যুগপত্ মনে হয়, দিস ইজ ভেরি স্ট্রেনজ, সব কিছু দেখছি আগের মতোই আছে, আমহার্স্ট শহরের তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি যে একেবারে! কাজরি স্কেটবোর্ডে চড়া ছেলেমেয়েদের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলে, ‘হোয়েন অ্যাম আই গোনা গেট ওয়ান অব দিস থিং? কখন আমাকে তোমরা এ রকম কিছু কিনে দেবে?’ আমরা তার প্রশ্নের জবাবে মৌন থাকি। আর আমি মনে মনে যেন একটু শঙ্কিত হই এই ভেবে যে—আর কত না উত্কট কিছু সে এখন থেকে বায়না ধরবে!
