স্টেশান মানে কোনো এক গন্তব্যে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা। আমরা অপেক্ষা করি কোনো মানুষের জন্য, কখনও কোনো দ্রুতগামী যানবাহনের জন্য, হতে পারে সেটা বাস, ট্রেন, ট্রাম, লঞ্চ অথবা আকাশযান। নিত্যানন্দের শিল্পকর্ম আমাদের বলে দেয় এমন এক বার্তা। এটি তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী। আজ ১ মার্চ, আলিয়ঁস ফ্রসেজের লা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ৩৫টি ছাপচিত্রকর্মের একক প্রদর্শনী। ছাপচিত্রের তিনটি মাধ্যমে তিনি কাজ করেছেন—লিথোগ্রাফ, এচিং বা ধাতুর তৈরি প্লেট তক্ষণ এবং পলিয়েস্টার লিথোগ্রাফ; শিরোনাম ‘ফ্রম দ্য স্টেশান’। শিল্পীর এমন ভাবনায় ছবির প্রদর্শনী প্রসঙ্গে বলেন, পৃথিবীটা একটা থিয়েট্রিক্যাল প্লেস। এখানে প্রতিনিয়ত মানুষ আসছে, যাচ্ছে। জীবনযাত্রার ঘুরপাকে মানুষের পথযাত্রা থেমে থাকে না। এটি ঘড়ির কাঁটার সাথে ঘূর্ণমান। মানুষের এমন আসা-যাওয়ার বিরামস্থল হিসেবে বেছে নেন স্টেশানকে। এ শব্দের ব্যবহার এখানে প্রতীকী। প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পশিক্ষা গ্রহণকালে দু-পর্বের কাজ হয়েছে। ঢাকা ও কলকাতায় করা দু-ধরনের ছাপচিত্রের বাছাই কাজ নিয়ে এ প্রদর্শনীর আয়োজন। ঢাকার কাজের নিরীক্ষার সাথে কলকাতার কাজের নিরীক্ষার ঐক্য অব্যাহত রেখেই তাঁর শিল্পচর্চার ভুবন তৈরি করেছেন।
নিত্যানন্দের কাজের মাঝে চিত্রতলকে বিশুদ্ধ শিল্পনির্মাণের ব্যহত প্রক্রিয়া বলতে ইচ্ছে হলেও শেষ অবধি খুঁটিয়ে দেখলে নিখুঁত এক সৃজনক্ষমতার প্রকাশভঙ্গি তাঁর শিল্পকর্মে দেখা মেলে। দৈনিক খবরের কাগজে ছাপা সংবাদের হরফ ব্যবহার করে নির্মাণ করেছেন চিত্রতল। তার মাঝামাঝি জায়গায় ফিগারের অবস্থান তৈরি করেছেন। অধিকাংশ কাজের মাধ্যম পলিয়েস্টার লিথোগ্রাফ। মাধ্যম হিসেবে শিল্পানুরাগীদের কাছে এটি নতুন। এর করণ-প্রক্রিয়া হলো ভারী লিথোর (লাইমস্টোন) পরিবর্তে পাতলা প্লাস্টিক শীট-এর ওপর পলিয়েস্টার প্রিন্ট নেওয়া হয়। শিল্পীর ভাবনায় এটি বাংলাদেশে ব্যবহূত নতুন এক মাধ্যম। রং ও রেখার ব্যবহারে মানুষের ফিগারগুলো বাস্তবানুগ রীতিতে গড়ে তুলেছেন। রেখার ব্যবহারে মানুষের স্টেশানে বসে থাকার নানা ভঙ্গিতে এক অপেক্ষমাণ যাত্রীর আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। কাজের মধ্যে বিষয়-নির্মাণের প্রতি মনোযোগ তাঁর সমস্ত শিল্পকর্মে উপস্থিত। এচিং অ্যান্ড অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে ‘মাই ফ্রাস্ট্রেশন’ ছবিতে চারজন মানুষের দেহভঙ্গির জমিন নির্মাণ করেছেন ঢাকা শহরের মানচিত্রের প্রতিচিত্র উত্কীর্ণ করে। মানুষের হতাশাগ্রস্ত আর্তি ছবির মানুষের ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে। নিত্যানন্দ মানুষের অস্তিত্বের টান টান অনুভূতিকে ছবির বিষয় করে নেন।
যাপিত জীবনের লড়াই-সংগ্রামকে ক্যানভাসে ধারণ করে সুশৃংঙ্খল চিত্রতল নির্মাণে নিত্যানন্দ মনোযোগী। আলো-ছায়ার বিপরীত আচরণে ছবির সম্মুখভাগে রেখার দ্রুত চলাচল ছবিতে গতি তৈরি করেছে। রেখার শক্তি আর চিত্রনির্মাণের পরিকল্পনায় শৃংঙ্খলা শিল্পীর কাজকে পরিশীলিত করেছে। উপমহাদেশের মানবিক বোধের লড়াইকে শাণিত করার দুজন অগ্রজ মানুষ মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসার অবয়বের যুক্ততায় তৈরি হওয়া শিল্পকর্ম দর্শক-বোদ্ধাদের উজ্জীবিত করে। জ্যামিতিক আকৃতি আর সূক্ষ্ম ও স্থূল রেখার দ্রুত চলাচল বিষয়ের গায়ে বিভক্তি তৈরি করে না বরং ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। প্রিন্টমেকিং মাধ্যমের শিল্পকর্মের মৌলিক কৌশলের দিকে না ঝুঁকে শিল্পী একটি শিল্পকর্মের নান্দনিক দিককে প্রধান করে দেখায় তাঁর সৃষ্টি কর্ম সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। ১ মার্চ শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হবে ১৪ মার্চ।
নিত্যানন্দ গাইন:জন্ম ১৯৮২, সাতক্ষীরা, বাংলাদেশ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগ থেকে স্নাতক ও কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২০১২ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক লাভ করেন। দেশ ও দেশের বাইরে ২৫টিরও বেশি দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন।
