বই আলোচনা

শব্দের কোঁরকে বাজে কুহক বেহালা

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৩১
কবিতাকেন্দ্রিক সমস্ত প্রার্থনা একই সাথে সকলের পাঠে, সকলের মনে জেগে ওঠে। এই জেগে ওঠা প্রাণ কবিদের কাছে শব্দধ্যান হয়ে থাকে, যা কবিতাকে দেয় পরম ও উপমার সাম্রাজ্য। এ রকম সাম্রাজ্য কবি তুষার কবিরেরও আছে। তাঁর এ পর্যন্ত ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। একুশ শতকের প্রথম দশকের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণগুলো তাঁর কবিতায় অনায়াসে পাওয়া যায়। তাই বারবার তাঁকে পাঠ করা যায়। বলে রাখি—এ যেন ‘বিশুদ্ধ সঙ্গম’। ষষ্ঠ কবিতার বই ‘কুহক বেহালা’য় আছে ‘দ্রুতশ্বাস-দুর্লভ-দুর্মর বুকচেরা ক্ষণ’-ঘেরা কিছু শব্দের আলিঙ্গন। ‘ছাপ্পান হাজার বর্গমাইল জুড়ে গড়িয়ে চলেছে যার শিল্পিত রক্তপ্রপাত’—সেই হুমায়ুন আজাদকে উত্সর্গ করা এ বইয়ে কবিতাসংখ্যা ৩৮। তুষার কবির প্রাণের মানুষের কথাকে নিজের রক্তঝরার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করেছেন। তাই একে একে পড়ে যাওয়া যায় ‘সাজঘর’, ‘সম্মোহন’, ‘মায়া’, ‘চামেলি অপেরা’, ‘জংশনে জমাট বৃষ্টি’, ‘জন্মদাগ’, ‘দেশলাই, মধুবালা : শীত’, ‘জলের কাঁচুলি’, ‘সেই সব চুমোগুলো’ ও ‘ঘোড়া, বিকল বেহালা : শীত’ কবিতাগুলো। আর তখনই যেন বেজে ওঠে কুহক বেহালার শব্দ । যেমন, ‘তোমার নাভির ঠিক ওপরে সুস্থির রাখা আছে ল্যাপটপ; যা থেকে পুরনো সব/ জাঙ্কমেল বের হয়ে যাচ্ছে, যা থেকে ঠিক্রে বের হয়ে যাচ্ছে ফিনফিনে প্রজাপতি,/ ফেলে দেয়া চুমোর চামচ, অনূদিত স্বপ্নের উত্সন্ন লগবুক।’ (মায়া) এ তো গেল তুষার কবিরের প্রবণতার একটি চিহ্ন, তাঁর রোমাঞ্চকর বার্তার ইঙ্গিত। হয়তো তাঁর উপলদ্ধির গহিন কুহকলাগা পথ—সবই শিল্পের সত্যতা। বইয়ের ফ্ল্যাপে উল্লেখ রয়েছে, ‘তুষার কবির পাঠককে নিয়ে যান বাগেদবীর হরিত্ আশ্রমে যেখানে হরিণের ছালে ঢাকা শব্দাবলির ভেতর থেকে লহমায় ছড়িয়ে পড়ে এক ঘোরলাগা আরণ্যিক আদিমতা ; চক্মকি পাথর আর রক্তকোরকের নিচে চাপা পড়া পঙিক্তগুলোর ভেতর থেকে একে একে বের হয়ে আসে জেব্রার গ্রীবার ছাপ, ম্যাজিকের চাবি, প্রজাপতি আর ভাঙাচোরা টোটেমের ডানা। তাঁর জ্যোতির্ময় শব্দের কোরকে কখনো বা এক দ্বীপবালিকা ছুটে যায় ক্যাথেড্রালের মোমগন্ধী হাওয়ায় আবার কখনো নিলামে বিক্রিত ঝাড়বাতি হাতে এক বেঘোর জুয়াড়ি ছুটে যায় জলদস্যুদের কীটদষ্ট পানশালায়। তাঁর চিত্রকল্পের বর্ণিল বলয়ে পাঠক কখনো পৌঁছে যান এক তৃণহীন-আঁশটে-প্রাচীন-নিওলিথ আস্তাবলে; যেখানে শ্বেতরঙা ঘোড়ার পাশে এক ইন্দ্রিয়হীন ভিখিরি একটানা বাজিয়ে চলে ছড়ছাড়া বিকল বেহালা, আবার কখনো ভূগর্ভস্থ শব্দসরোবর থেকে ভেসে ওঠে স্বর্গভ্রষ্টা কুমারীর শেষ লেখা ভাঁজপত্র।’ প্রথম দশকের মেধাদীপ্ত ক্ষুরধার প্রতিভা তুষার কবিরের এই অভিনব শব্দ-অভিধার আরেকটি যোগসূত্র তাঁর ষষ্ঠ কবিতার বই ‘কুহক বেহালা।’ প্রেমে-অপ্রেমে জীবনের মূল বাস্তবতাকে বিবৃত করতে চেয়েছেন কবি। এটাই তাঁর চরম উল্লাস। তাই তিনি লিখতে পারেন, ‘প্রেমিকারা সবাই হারিয়ে যাচ্ছে আজ বোধ থেকে। একে একে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে/ তারা টানটান সংবেদন থেকে। নেটসেক্সে বসে আছে কামের অপ্সরী।/ কাননবালারা আজ বড় বেশি ভালোবেসে ক্যামোফ্লেজ আভা। রোমান্সের বিশদ/ ফর্মুলা তাদের শিখিয়ে দিচ্ছে পরচুলা লেডি গাগা।’ (তারবার্তা) বা ‘বিজ্ঞাপন বিরতির ফাঁকে তুমি পড়ে নিতে পার মল্লিকা বাঈর ফেলে দেয়া চিঠি, গালিবের/ বাহারি শায়েরি, জ্যঁ পল সার্ত্রের ছত্রে ছত্রে ফিলোসফি। বারান্দায় ঈষত্ পায়চারি/ সেরে তুমি ঘুরে আসতে পার প্রেমিকার সমূহ ভূগোল, জগতের বিশদ কুহক, আর/ প্রেমিকার শরীরেই পেয়ে যেতে পার খোদ প্লাতো আর আরিস্ততল।’ (বিজ্ঞাপন বিরতির ফাঁকে) সমসাময়িক ঘটনা, বিচ্ছিন্নতাগুলো তুষার কবিরের কবিতায় বারবার ধরা দেয় যেমন ‘রূপনারাণের কূলে কয়েকটি শব্দ নিয়ে মেতে আছে কিছু ছোটকাগজকর্মী। তাদের/ বুকপকেটে আজো রয়ে গেছে ডাগর জোনাকপোকা, কচুরি ফুলের বিভা, হাসানের/ পৃথক পালঙ্ক। সদ্য লেখা কবিতার প্রুফ দেখতে দেখতে তাদের একজন বিড়বিড়/ আওড়াতে থাকে; “ছোট কাগজের নিচে একদিন চাপা পড়বে এই রিমিক্স দুনিয়া”।’ (চেগুয়েভারার চিঠি ও রিমিক্স দুনিয়া) তুষার কবিরের কবিতার স্টাইল পরখ করে দেখতে পারেন যে কেউ, এতে উপমা-উেপ্রক্ষার কোনো ঘাটতি নেই। বরং রয়েছে বিশদকালের অপরূপ ব্যঞ্জনা। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে প্রেম, কাম, জীবন, মানুষ, রাজনীতি, সমাজ, দর্শন—সবই । এটাই তাঁর তীক্ষ ও সাবলীল উপস্থাপনা। তাই তাঁর কবিতা পাঠে থাকে, পাঠে জাগে।