ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৩, ১৭:৫১
হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক জাতীয় হূদরোগ ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা চার প্রকোষ্টের হূদযন্ত্র বা হার্ট আমাদের দেহের অত্যাবশ্যকীয় কেন্দ্রীয় অর্গ্যান বা অঙ্গ। গুরুত্ব বিবেচনায় মস্তিস্কের পরেই হূদযন্ত্রের অবস্থান। হূদযন্ত্র মানব দেহের জন্য অনেকগুলো জরুরী কাজ করে থাকে। হূদযন্ত্র ১. দেহের প্রতিটি কোষে খাদ্যকনা (গ্লাকোজ, প্রেটিন ও ফ্যাট) পৌঁছে দেয়। ২. ফুসফুস থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন কোষে কোষে পৌঁছে দিতে সাহায্যে করে ৩. বিশুদ্ধ করণের জন্য কোষ থেকে দূষীত কার্বন-ডাইঅক্সাইড ফুসফুসে পৌঁছে দেয়। ৪. দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে ৫. শরীরের মেটাবলিজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ৬. প্রতিটি প্রান্তে ওষুধ পৌঁছে দেয়। ৭. জীবনকে ছন্দময় করে। দেহের প্রতিটি অংশে খাদ্য প্রদানকারী মহান বন্ধু হূদযন্ত্র জন্ম থেকে মৃত্যুপর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যায়। The Heart never sleeps. হার্ট নিজেই নিজেকে দুইটি রক্তনালীর মাধ্যমে অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে থাকে। এই দ’টি রক্তনালীর কমপক্ষে ১টি আংশিক বা পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলেই সমস্যা হয়। এরই নাম ‘ইসকেমিক হার্ট ডিজিস’ বা হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা। বুকে ব্যথাই এই রোগের আভাস দেয়। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় বিশ্রাম বা জিহবার নীচে নাইট্রেট স্প্র্রে বা ট্যাবলেট দিলেই বুকের ব্যথ্যা কমে যায়। কিন্তু জটিল পর্যায়ে বিশ্রাম এবং নাইট্রেট জিহবার নীচে ব্যবহার করেও বুকে ব্যথা কমানো যায় না। হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারন করে। কেন হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা হয় হূদযন্ত্রে অক্সিজেনের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য হলেই হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা রোগ হয়। হূদযন্ত্রের রক্তনালীতে রক্ত চলাচল বন্ধ বা বাধাপ্রাপ্ত হলে। রক্তনালীর সংকোচন বা ব্লক কমপক্ষে ৭০% হলেই হূদযন্ত্রের মাংশ পেশীতে রক্ত তথা অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। অক্সিজেন স্বল্পতার প্রাথমিক অবস্থা হচ্ছে ইসকেমিয়া/ এ্যানজাইনা আর তীব্র বা প্রকট অবস্থা হচ্ছে ইনফারকশন বা হার্ট এ্যাটাক। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে ষ্ট্রোক হার্টের কোন রোগ নয়। ষ্ট্রোক মাথার অসুখ যখন মাথার রক্তনালী বন্ধ হয় বা ছিড়ে যায়। আর হার্ট এ্যাটাক হূদযন্ত্রের রোগ। অনেক মানুষ ষ্ট্রোককে হার্ট এ্যাটাক ভেবে রোগীকে ভূল করে হূদরোগ হাসপাতালে নিয়ে যায়। আবার হার্ট এ্যাটাককে ষ্ট্রোক ভেবে মাথার সিটি ষ্ক্যান করাতে চান। কতিপয় বিশেষ শ্রেণীর মানুষের হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা বেশী হয় । যেসব ক্ষেত্রে এই রোগ সম্ভাবনা বেশী থাকে- ১. উচ্চ রক্তচাপ ২. ডায়াবেটিস মেলাইটাস ৩. রক্তে অতিরিক্ত চর্বি/কোলেস্টেরল ৪. স্থুলতা ৫. পুরুষ ৬. বার্ধক্য ৭. কায়িক শ্রমহীনতা ৮. খাদ্যে শাক সবজি কম থাকা। ৯. এ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা ১০. খাদ্যে অনিয়ম ১১. পারিবারিক ইতিহাস ১২. বেশি টিপটপ জীবন যাপন ১৩. অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অত্যাধিক চর্বি, পরিশ্রমহীনতা, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি। হূদযন্ত্রে রক্ত স্বল্পতার রোগী বুকে ব্যথা, শ্বাস কষ্ট, বুকে চাপ, বুক ভারীলাগা- এ সব লক্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে আসতে পারেন। প্রাথমিক চিকিত্সার জন্য রোগীকে অতিদ্রুত হাসপাতালে জরুরী বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। সন্নিকটে হূদরোগের চিকিত্সা সুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল থাকলে সেখানে নিয়ে যাওয়াই উত্তম। চিকিত্সকের পরামর্শ মত ধারাবাহিক চিকিত্সা গ্রহণ করতে হবে। হাসপাতালে পৌঁছার আগে বাসায় বা কর্মস্থলে বা রাস্তায় যা করতে হবেঃ- ১. পর্যাপ্ত আলো বাতাস নিশ্চিত করতে হবে ২. জিহবার নীচে নাইট্রেট সেপ্র দুই চাপ দিতে হবে বা একটি নাইট্রেট ট্যাবলেট দিতে হবে। ৩. দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছার ব্যবস্থা করতে হবে। হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা চিকিত্সার চাইতে প্রতিরোধ অধিক সহজ ও নিরাপদ। হূদযন্ত্রে অক্সিজেন স্বল্পতা খুব কঠিন নয়। এ জন্য করনীয়:- ১. আদর্শ জীবন যাপন করা। ২. প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করা। ৩. বেশী শাক-সবজি খাওয়া। ৪. ধূমপান, গিলা, কলিজা, মাথা, জর্দা ও গরুর মাংশ বর্জন করা। ৫. তৈল, চর্বি, মিষ্টি কম খাওয়া ৬. পরিমিত বিশ্রাম ও ঘুম ৭. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিত্সা গ্রহণ করা ৮. উত্তেজনা প্রশমণ করা ৯. আলগা লবণ বর্জন করা ১০. দূশ্চিন্তা মুক্ত জীবন যাপন করা