নব্বইয়ের দশকে বিশ্বে অনেক ওলটপালট হয়। অনেকটা আচমকাই দুই মেরুর বিশ্বের পতন ঘটে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নাম্বার ওয়ান তকমাটা তো ১৮৭১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কপালে লেগে আছে। ১৯৬০ সাল থেকে বিশ্ব জিডিপিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ৩০ শতাংশে পৌঁছে। সাম্প্রতিককালে এ উচ্চহারে একটু ভাটার টান লাগলেও এখনো প্রায় বিশ্ব জিডিপি’র প্রায় ২৫ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। চীন ২০১০ সালে জাপান, জার্মানী, ফ্রান্সকে টপকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয়ের মধ্যে যোজন যোজন পার্থক্য বিদ্যমান। চীনের লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ডিঙিয়ে বিশ্বের সর্ববৃহত্ অর্থনীতির আসনটি দখল করা। যদিও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সে অবস্থায় পৌঁছার জন্য চীনকে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না। তাদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চীন অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। পরিসংখ্যানও তাই বলে।
১৯৯১ সালে বিশ্ব জিডিপিতে চীনের অবদান ছিল মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ২০১২ সালে তা ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। চীনের অগ্রযাত্রার এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের অনেক আগেই চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করতে পারবে। পর্যবেক্ষণ করলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সামাজিক খাতে চীন বিশ্বের তলানিতে অবস্থানের পরিবর্তন এত দ্রুত হবে না। সমাজতান্ত্রিক এ দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে না। গণতন্ত্রের দাবি কবে তেমন জোরালোভাবে উঠবে, কবে তা বাস্তবায়ন হবে তা স্পষ্ট নয়। কারণ ১৯৮৯-এর তিয়েনানমেন স্কোয়ারের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের কথা স্মরণ করে চীনা গণতন্ত্রকামীদের গা এখনো শিউরে উঠার কথা। ট্যাংক ও কামানের গুলিতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা আত্মাহুতি দিয়েছিল সেই বছরের ৩ ও ৪ জুন। কিন্তু গণতন্ত্র ফিরে আসেনি। বরং অনেক প্রদেশে মার্শাল ল’ জারি করে পরবর্তী কয়েক বছর হত্যা ও নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়েছে সরকার। চীনের গণতন্ত্রমনস্ক জনগণের সেই হূদয় কাঁপানো স্মৃতি মুছে যেতে কমপক্ষে এক প্রজন্ম পার হতে হবে। তাই অর্থনৈতিকভাবে সৃদৃঢ় হলেও চীন বিশ্বের সার্বিক সমীহ আদায় করতে আরও অনেক সময় লাগবে।
নব্বইয়ের দশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে নতুন নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পণ্যশুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। প্রায় ৪৭ বছর ধরে চলে এ আলোচনা। ন্যাটোভুক্ত শিল্পোন্নত দেশগুলো এ আলোচনার সূত্রপাত করে। তাই এ দীর্ঘ আলোচনায় সোভিয়েট ইউনিয়ন, চীনসহ কম্যুনিস্ট ব্লককে এ আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর অন্যতম কারণ ছিল কম্যুনিস্ট দেশগুলো বাজার সংরক্ষণ নীতি অনুসরণ করে। তাই ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি যখন ডব্লিউটিও’র জন্ম হয় তখন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এর বাইরে থেকে যায়। ডব্লিউটিও’র সদস্য হওয়ার জন্য দেশগুলো তখন থেকেই বিভিন্ন দেশ ও গ্রুপের সাথে আলোচনা শুরু করে। বাজার উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এভাবে ডব্লিউটিও’র শক্তিশালী সদস্যদেরকে সন্তুষ্ট করে। করিত্কর্মা চীন ২০০১ সালে এবং রাশিয়া ২০১২ সালে ডব্লিউটিও’র সদস্য হয়। অনেক কম্যুনিস্ট দেশই ইতিমধ্যে সদস্য হয়েছে। বাকিরা অন্তর্ভুক্তির পর্যায়ে আছে। ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বে নতুন করে মেরুকরণ শুরু হয়। এক বা দুই মেরুর বিশ্ব বহু মেরুতে পরিণত হয়। নিজ দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে এক সময়ের মিত্রও শত্রুতে পরিণত হচ্ছে। আর মিত্র এখন প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। যেমন, কৃষিপণ্যের জন্য ইউরোপের বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষ নেয়। তাদের সবার দাবি ইউরোপ কৃষিপণ্য আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিয়ে তাদের বাজার মুক্ত প্রতিযোগিতার জন্য উন্মুক্ত করে দিক।
আবার ইউরোপ-আমেরিকাসহ শিল্পোন্নত বিশ্ব চাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো শিল্পপণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস করুক, যাতে তাদের পণ্য সহজে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারে প্রবেশ করতে পারে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। দেড় দশক আগেও চীনে বিনিয়োগের চিন্তা করতো না বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। আর বিগত কয়েক বছর ধরে শিল্প ও সেবাখাতের বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো চীনে বিনিয়োগের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি, অপেক্ষাকৃত কম মজুরি, স্থাপন ব্যয় কম ইত্যাদি কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল বিশ্বে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কারণ পণ্য কোথায় উত্পাদিত হয়েছে তা নয়, বরং পণ্যের মান ও মূল্য দিয়েই বাজার নির্ধারিত হচ্ছে। ডব্লিউটিও’র নীতি এ সুযোগ করে দিয়েছে। এভাবেই মুক্ত বাজার সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও উন্নত দেশগুলো বসে নেই। শ্রমমান, গুণগতমান, উত্পাদন কৌশলমান, পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে, যাতে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত বিশ্ব এসব কঠিন শর্ত পূরণ করে পণ্য বাজারজাতকরণ করতে না পারে।
নব্বইয়ের দশকেই বিশ্বের স্মরণকালের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটে। লাদেন ধ্বংসাত্মক জিহাদ নীতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে দেশে দেশে উগ্র সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টিতে মদদ দেয়। বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার বিষয়ে পরিণত হয়।
নব্বইয়ের দশকে সবচেয়ে বড় আলোড়ন সৃষ্টি হয় সামাজিক খাতে। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি সত্তরের দশক থেকেই দারিদ্র্য হ্রাসের করণীয় নিয়ে কাজ শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে তা পূর্ণতা লাভ করে। জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্মেলন আয়োজন করে। সমস্যার গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করে। একই সাথে সমাধানের পথ খুঁজে। অঞ্চলভিত্তিক সমস্যাগুলোর একটা আন্তর্জাতিক রূপ দেয়। পাশাপাশি সমাধানের সাধারণ উপায়ও চিহ্নিত করা হয়। এমনি প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে। সেই সম্মেলনেই ১৯৩টি দেশের সম্মতিতে আটটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য গৃহীত হয়। ২০১৫ সালের মধ্যে লক্ষ্যগুলো পূরণের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত হয়। প্রতিটি মানুষ একটা ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখতে পারে, যাতে মানুষ ক্ষুধা ও নির্যাতনের শিকার না হয়। বিশ্বব্যাপী সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ই এতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ লক্ষ্য পূরণে কার কি দায়িত্ব তাও এ সম্মেলনে নির্ধারণ করা হয়।
আটটি এমডিজি হচ্ছে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল করা, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন, এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা, টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি বিশ্ব অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। প্রতিটি লক্ষ্যের সময়ভিত্তিক অর্জনের স্তর নির্ধারণ করে দেয়া হয়। লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি ২০০৫ সালে প্রথম পর্যবেক্ষণ করা হয়। তারপর প্রতি দুই বছর পর পর অর্জনের অগ্রগতি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। প্রতিটি দেশের রিপোর্টের ভিত্তিতে লক্ষ্য অর্জনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আর ২২ মাস বাকি আছে। জাতিসংঘের ২০১২ সালের অগ্রগতি রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সব অঞ্চলই এমডিজি-১ ও ২ এর লক্ষ্য পূরণের পথে আছে। কয়েকটি দেশ এমডিজি-২ অর্জনে পিছিয়ে আছে। নারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিতে কোথাও তেমন অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষা, চাকরি ও সম্পদ অর্জনে লিঙ্গ অসমতা রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে লক্ষ্যের চেয়ে এগিয়ে আছে। মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসে বেশ অগ্রগতি হলেও লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে বিশ্ব অনেক পিছিয়ে আছে। এইচআইভি’র চিকিত্সা সুবিধা সমপ্রসারিত হলেও এখনো সব রোগী চিকিত্সা পাচ্ছে না। যক্ষ্মা প্রতিরোধে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। ম্যালেরিয়ায় মৃতের সংখ্যা কমেছে। আর বিশ্বমন্দার কারণে বিশ্ব উন্নয়ন অংশীদারিত্ব নিয়ে কেউ মাথা পাততেই রাজী নয়।
এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশ চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলে এমডিজি লক্ষ্যের চেয়ে এগিয়ে আছে। বিশেষ করে গত চার বছর গ্রামমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৃষিতে গভীর মনোযোগ দান, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিগুলো জোরদার করার কারণে এখন আর কেউই অনাহারে থাকছে না। আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বছরে প্রায় আড়াই শতাংশ দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যটিতে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। যদিও প্রায় শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঝরে পড়ার হার এখনো বেশি।
বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষায় লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। চাকরিতে সমতা সৃষ্টি না হলেও স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই তৃতীয় লক্ষ্যটিও ভালভাবে এগোচ্ছে। চতুর্থ লক্ষ্য হিসাবে শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস বাংলাদেশ এমডিজি’র চেয়ে এগিয়ে আছে। একইভাবে মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ে পঞ্চম লক্ষ্যটিও বাংলাদেশ ভাল অবস্থানে আছে। এইডস ও অন্যান্য রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে খুব কম। ম্যালেরিয়াও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তাই ষষ্ঠ লক্ষ্যটি অর্জনেও বাংলাদেশ ভাল অবস্থায় আছে। সপ্তম লক্ষ্য তথা টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাধ্য কাজ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ দশটি দেশের একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং ঝুঁকি মোকাবেলা করা বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েও পর্যাপ্ত সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছে না। ফলে বাংলাদেশ এ লক্ষ্যটি অর্জন করতে পারবে না। যদিও সরকার নিজস্ব অর্থায়নে বেশকিছু কর্মসূচি পালন করছে।
অষ্টম লক্ষ্যটি কোনো দেশের পক্ষেই অর্জন সম্ভব নয়। কারণ বিশ্ব অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হলে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং দাতা সংস্থাগুলো বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে যেভাবে অনুদান ও ঋণ দেয়ার কথা ছিল তা দেয়নি। রপ্তানি পণ্যের সুবিধাজনক বাজার প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ করেনি। উপরন্তু নতুন শর্ত আরোপ করে মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করছে। যেমন- বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের মুক্ত প্রতিযোগিতার বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব স্বল্পোন্নত দেশকে জিএসপি’র আওতায় শুল্ক সুবিধা দিলেও বাংলাদেশকে দিচ্ছে না। অবাধ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব বাজারেই কম-বেশি প্রতিবন্ধকতা আছে। বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান গত তিন বছর ধরে অপরিবর্তিত আছে। ফলে বাংলাদেশ টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পেরেছে। বাংলাদেশের অবস্থা ভাল হলেও আফ্রিকাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এমডিজি অর্জনে পিছিয়ে আছে।
এমনি পরিস্থিতিতে ২০১২ সালের জুনে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ আয়োজিত টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে এমডিজি’র ওপর ভিত্তি করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) গ্রহণ করা হয়। ২০১৫ সালের পর থেকে এসডিজি’র বাস্তবায়ন শুরু হবে। বিশ্বমন্দার কারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল অধিকাংশ দেশ যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত তখন টেকসই ও সকলকে নিয়ে উন্নয়নের কথা কীভাবে ভাববে তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। যদিও বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্বচ্ছ এবং সকলকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে বিশ্ব উন্নয়নকে টেকসই করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কিন্তু সমভাবে উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য ডব্লিউটিও ও এমডিজিতে যেসব প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ছিল তা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিপালন করেনি। সে ব্যাপারে প্রতিকার না করে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলে তাও অবাস্তবায়িত থেকে যাবে। তাই আগে এমডিজি অর্জনের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যে আন্তরিক তা প্রমাণ করতে হবে। প্রতিটি দেশকে সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুত করতে হবে। নতুবা এসডিজিও অপূর্ণ থেকে যাবে।
