প্রবন্ধের ক্লাস ও মূল্যায়ন

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৩, ২০:৫২
আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি পরীক্ষায় বারো নম্বরের এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি পরীক্ষায় বিশ নম্বরের বাংলা প্রবন্ধ রচনা করতে হয়। স্নাতক(পাস) ও স্নাতক(সম্মান)-এ বাংলা বিভাগের পাঠ্যসূচি ছাড়াও বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় বাংলা (আবশ্যিক) দ্বিতীয় পত্রে চল্লিশ নম্বর করে আশি নম্বরের দুটো প্রবন্ধ লিখতে হয়। আমি শিক্ষার্থীদের জানাই—স্কুলশিক্ষকগণ যখন প্রশ্নে লেখেন ‘রচনা লিখ’, তখন আসলে তাঁরা প্রবন্ধ রচনা করতে বলেন। প্রবন্ধ শব্দের অর্থ হলো প্রকৃষ্ট বন্ধন যুক্ত রচনা। আর রচনা শব্দের অর্থ হলো তৈরি করা বা বানানো। যেমন সে একটি গান রচনা করলো। পাখিরাও প্রেমে পড়লে জুটি বেঁধে নীড় রচনা করে। এগুলো রচনা, কিন্তু প্রবন্ধ নয়। প্রবন্ধ আধুনিক মানুষের যে কোনো একটি বিষয় কেন্দ্রিক চিন্তার গদ্য রূপে প্রকাশ। প্রবন্ধে একটি বিষয়কেন্দ্রিক চিন্তার বন্ধন প্রয়োজন। তবে একই বিষয় নিয়ে নানা জন নানাভাবে লিখতে পারে। যেমন গরু দিয়ে রচনা লিখতে গিয়ে কেউ লিখতে পারে ‘ আমার একটি গরু আছে তার নাম মহেশ।... ’ কিংবা কেউ লিখতে পারে ‘গরু গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। তার একটি লেজ আছে।... ’ আবার কেউ লিখতে পারে ‘গরু দিয়ে রচনা লিখতে শুরু করবো এমন সময় জানালা দিয়ে দেখি কলেজ-মাঠে একটি কালো গরু ঘাস খাচ্ছে। তার পিঠে একটি পাখি এসে বসেছে।...’ ইত্যাদি। তবে বুদ্ধদেব গুহের উপন্যাসের নায়কের মতো গরুকে কুমির দিয়ে খাইয়ে কুমিরের রচনাতে প্রবেশ করা যাবে না। অর্থাত্ একটি বিষয় সংক্রান্ত প্রকৃষ্ট বন্ধন ছিন্ন করা যাবে না। এরপর আমি শিক্ষার্থীদের মিথ্যা-মাদক-মুখস্থ—এ তিন ‘ম’কে পরিহার করে মা-মাতৃভূমি-মাতৃভাষা—এ তিন ‘ম’কে ভালোবাসতে অনুপ্রাণিত করি। বলি প্রবন্ধ মুখস্থ করার বিষয় নয় ,পড়ালেখা করে আয়ত্ত করার বিষয়। তবে প্রবন্ধের বিষয়বস্তু বা যুক্তি স্পষ্ট করতে যেসব গল্প-গান বা কবিতা-উদ্ধৃতি ব্যবহূত হবে তা যথাযথ হতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “শুধু পড়াশোনাতে কিছু হয় না ; বাজনার বোল লোকে বেশ মুখস্থ করতে পারে , হাতে আনা বড় শক্ত।” তবে যে কোনো শক্ত কাজ সহজ হয় মানুষের নিয়মিত অনুশীলন বা চর্চার মাধ্যমে। তাই আমাদের প্রচুর প্রবন্ধ পড়তে হবে এবং নিজে নিজে লেখার অভ্যাস গঠন করতে হবে। প্রবন্ধের যুক্তি বুঝতে হবে এবং পালটা যুক্তি উপস্থাপনকৌশল আয়ত্তে আয়াশী হতে হবে । এর পর আমি পুঁজিবাদী এই যান্ত্রিক যুগে সাহিত্য চর্চার প্রয়োজনীয়তা ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার সঙ্গে প্রবন্ধের পার্থক্য বুঝিয়ে বলি। শিক্ষার্থীদের সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যের রসাস্বাদনে অনুপ্রাণিত হবার আশাবাদ ব্যক্ত করে ক্লাস শেষ করতে চাইলে কিছু শিক্ষার্থী কয়েকটি কমন(ইম্পর্টেন্ট)রচনা(প্রবন্ধ) দাগিয়ে দেবার আবদার জানায়। এখানে উল্লেখ্য, আমাদের প্রতিষ্ঠানে জিপিএ পাঁচ পাওয়া শিক্ষার্থীও আছে আবার জিপিএ দুই পাওয়া শিক্ষার্থীও আছে। সুতরাং ঐ দুর্বল শিক্ষার্থীদের আবদার অগ্রাহ্য অসম্ভব। বিশেষত পরীক্ষার প্রশ্নে যেখানে পাঁচটি প্রবন্ধ থেকে বাছাই করে যে কোনো একটি লেখার সুযোগ রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পাঠ্যসূচির ষষ্ঠ ধারায় রয়েছে: “প্রবন্ধ রচনা,পত্র লিখন এবং ভাষণ অথবা প্রতিবেদনের বিষয় এমন হতে হবে যাতে পরীক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে অথবা নিজেরা চিন্তা করে লিখতে পারে। মুখস্থ করে উত্তরদানের প্রবণতা পরিহারের জন্য সাধারণত যে সব গতানুগতিক বিষয় পরীক্ষায় আসে সেগুলো বাদ দিতে হবে।” অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যে কোনো একটি শিক্ষাবোর্ডের ২০১২ সনের প্রশ্নে দেখা যাবে ২০১১ সনের প্রশ্ন বাদ দিয়ে ২০০৮ কিংবা ২০১০সনের কিছু প্রশ্নের প্রত্যাবর্তন। তাই আমার দুর্বল শিক্ষার্থীদের বলি চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ২০১১ সনের প্রশ্নে যেহেতু একুশের চেতনা এসেছে সেহেতু ২০১২ সনের প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা দেশপ্রেম বিষয়ক রচনা আসার সম্ভাবনা আছে । পরবর্তী সময়ে এবিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দেখে আমি মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস : প্রতীতি,মুক্তির উদ্যোগ’ (পৃষ্ঠা : ২২) বইটির শতাধিক কপি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করি। গত ৩ এপ্রিল ২০১২ চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রবন্ধ রচনা আসাতে আমি খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। কিন্তু সেদিন বিকেলে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ২০১২ ব্যাচে আমার সবার চেয়ে ভালো ছাত্রের মাকে খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “ছেলেটাকে তো আপনার মানস পুত্র বানিয়েছেন। সে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রচনা লিখেছে একুশ পাতা। খাতাটা কোনো ডানপন্থী শিক্ষকের হাতে পড়লে বাংলায় জিপিএ পাঁচ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে যাবে।” আমার অনেক সহকর্মীও মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা এরকম ‘রাজনৈতিক’ প্রবন্ধের কথা না বলাই নিরাপদ। পরের মাসেই এক কবি ও সহকারী অধ্যাপক বন্ধু ফোন করে জানালো, প্রধান পরীক্ষক তাকে ডেকেছেন খাতায় বেশি নম্বর দেয়ার অভিযোগে। যথারীতি বন্ধুর সঙ্গে প্রধান পরীক্ষকের দপ্তরে গিয়ে জানা গেলো নিরীক্ষক হিসেবে নিযুক্ত একজন প্রভাষকের অভিযোগ—“পরীক্ষায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর পরীক্ষার্থীরা লিখেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, চেতনা লিখেছে মাত্র এক প্যারা। এসব রচনার জন্য বড়জোর ৪০% নম্বর দেওয়া যায়। অন্তত ৬০%-এর বেশি নম্বরের খাতাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।” আমি তাদের বলি উচ্চমাধ্যমিকে এনসিটিবি কোনো ব্যাকরণ ও রচনা বই প্রকাশ করেনি এমনকি কোনো বইকে অনুমোদনও দেয়নি। বাজারে এনসিটিবি অনুমোদিত পাঠ্যসূচি অনুযায়ী প্রণীত বইগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিষয়ে বিস্তারিত নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষার খাতায় নম্বর প্রদানে উদার হওয়া আবশ্যক। তবু প্রধান পরীক্ষক ও নিরীক্ষক অটল । অগত্যা ৬০%-এর বেশি নম্বরের খাতাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ছাত্রের মা আর আমার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মুখগুলো । ভাবি আগামী ব্যাচের শিক্ষার্থীর ক্লাসে গিয়ে আমি কীভাবে প্রবন্ধ পড়াবো ? যেখানে আমাদের মতো নগণ্য শিক্ষকের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও পরীক্ষক-নিরীক্ষকবৃন্দের বিস্তর ব্যবধান ; অথবা ব্যবধান মেটানোর অনিবার্য উপাদান অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের অভাব। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি প্রত্যাশা করি। চট্টগ্রাম