দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কি অনিশ্চিত আগামীর ইঙ্গিত দিচ্ছে? তাহলে নানামুখী সংকটে থাকা অর্থনীতির কি হাল হবে, তা নিয়ে শংকা ক্রমেই বাড়ছে। রফতানি ও রেমিটেন্সের ওপর ভর করে চলা অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। এরমধ্যে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতির মাঠ। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়কে কেন্দ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন তীব্র। হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধীদলগুলোও রাজপথ দখলে রাখতে চাইছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তার কমতি নেই ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও অর্থনীতিবিদদের। তারা বলছেন, অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হলে রাজনৈতিক স্থিরতা খুব প্রয়োজন। সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। নির্বাচনকেন্দি ক সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট প্রলম্বিত হলে তা অর্থনীতিতে নেতিবাচক ভূমিকাই রাখবে বলে মনে করেন তারা।
রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরে সমস্যাগ্রস্ত অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম গ্যাস বিদ্যুতের সংকট। গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট সামাল দিতে বিনিয়োগকারীরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার ও দফায় দফায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতেও বিনিয়োগকারীরা চাপের মুখে রয়েছেন। তার উপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠায় শিল্প উদ্যোক্তাদের কপালের ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নতুন বিনিয়োগের ভরসাই পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। আর নতুন বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে কিভাবে, প্রবৃদ্ধিইবা বাড়বে কি করে- এমন প্রশ্নও বিশ্লেষকদের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতে পারে তবে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড দেশ ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, অর্থনীতিকে প্রাধান্য দিয়েই রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থবছরের ৮ মাস পরও এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করা যাচ্ছে না। অর্থনীতির সূচক থেকে বুঝা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে থাকতে পারে। এর বড় কারণ হলো, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য গত বছরের তুলনায় অন্তত ৭৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী নিজেও বিনিয়োগ মন্দা নিয়ে আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। নানামুখী সঙ্কটের কারণে বিনিয়োগ লাভজনক বিবেচিত না হওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আসতে চাইছেন না। তার উপর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তীব্র হয়ে উঠায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিনিয়োগের গতি প্রকৃতি বুঝতে বিনিয়োগ নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালে এক হাজার ৯৭৪টি প্রকল্পে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৩১ হাজার ৭৫ কোটি মিলিয়ন টাকা। আর সাময়িক হিসাবে ২০১২ সালে এক হাজার ৬০১টি প্রকল্পে নিবন্ধনের পরিমাণ চার লাখ ৯৮ হাজার ১৮৭ মিলিয়ন টাকা।
সামপ্রতিক সময়ে বিনিয়োগ মন্দার কারণ সম্পর্কে রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, বাংলাদেশের রফতানির প্রধান বাজার ইউরোজোন ও আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রফতানির প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। এর উপর দফায় দফায় জ্বালানি তেল, বিদ্যুত্, গ্যাস, ফ্যাক্টরি স্থাপনা ভাড়া, উেস কর, আয়কর, আমদানি শুল্ক, ব্যাংকের সুদ হার বৃদ্ধিসহ কাঁচামাল আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্পাদন খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশের রফতানিমূল্য তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বাংলাদেশ রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। শিল্প বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে, বাড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অথচ বর্তমানে দেশে বেশিরভাগ বিনিয়োগ লাভজনক না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকটাই থেমে গেছে। ফলে জনগণের আয় কমে চাহিদাও কমে যাচ্ছে। তাই অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে প্রভাবিত হচ্ছে জাতীয় উত্পাদনের প্রবৃদ্ধি।
এদিকে বিশ্বমন্দা ও সামপ্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইমেজ সঙ্কটের কারণে রফতানি কাঙ্ক্ষিত হারে না হলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য চাপের মুখে পড়বে। এ অবস্থায় চীন থেকে ক্রেতাদের আগ্রহ বাংলাদেশের দিকে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তা যেন ইমেজ সঙ্কটের কারণে নষ্ট না হয়ে যায়। সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া চীনের বাজার বাংলাদেশে আসলে তা ধরে রাখার জন্য নিজস্ব সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। জ্বালানির উচ্চ দাম, অবকাঠামোগত দুর্বলতা আর উচ্চ সুদ হারের জন্য এ সম্ভাবনা যেন নষ্ট না হয়ে যায়।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে বর্তমানে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট ও ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগ প্রসারিত হতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে ঋণ করায় ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার সঙ্কটে সুদ হার বেড়ে গেছে।
দেশের অর্থনীতিবিদরা যখন বিনিয়োগ বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছেন সেই মুহূর্তেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। এমনকি জ্বালানি তেলের দাম আরো সমন্বয় করার চাপও রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে। অন্যদিকে, শিল্প উদ্যোক্তারা বলেছেন, বিদ্যুত্ সরবরাহ কম হওয়ায় শিল্প ইউনিটগুলোতে ক্যাপটিভ জেনারেটর ব্যবহার করে বিদ্যুত্ উত্পাদনের মাধ্যম শিল্প চালু রাখতে হয়। ক্যাপটিভ জেনারেটরে জ্বালানি হিসেবে ডিজেলও ব্যবহূত হয়ে থাকে। সমপ্রতি ডিজেলের মূল্য লিটার প্রতি ৭ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে দেশের রফতানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
