১৯৭১ থেকে ২০১৩- এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের নারীরা কখনো চোখ রেখেছেন সূর্যোদয়ের ক্যানভাসে, কখনো নিকষ কালো রাত্রি তাদের ঘিরে ধরেছে নেমেসিসের মতো। এই প্রজন্ম চত্বরে আসা নারীদের অসীম সাহসিকতা যখন দেখি, যখন চোখ পড়ে যায় কোনো মায়ের কোলের শিশুর হাতে ধরা জাতীয় পতাকায়, যখন শ্লোগান শুনি শ্লোগান কন্যাদের কণ্ঠে, তখন বুকের খুব ভেতরে, খুব গভীরের রক্তধারা বলতে থাকে- তুমি ভালো থাকবে বাংলাদেশ
এমন বাংলাদেশ কেউ দেখেনি কোনোদিন। অন্তত মুক্তিযুদ্ধের পর তো নয়ই। এ এক অন্যরকম বাংলাদেশ- যেখানে প্রলয় আর স্বপ্ন ডানা মেলেছে নীল ছোঁয়া কোনো কিংবদন্তীর মতো, যেখানে লক্ষ জনতার হূদস্পন্দন এক অনন্য সুরে মহিমান্বিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে যে নরপিশাচরা বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করেছিলো, নির্বিচারে গণহত্যা আর নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধগুলো করেছিলো, সেসব যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য আজ শ্লোগান ধরেছে ষোলকোটি বিপন্ন কোকিল। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর আজ তাই বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। গোটা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল যেনো হয়ে উঠেছে একটি প্রজন্ম চত্বর; প্রতিবাদ আর অগ্নিশপথের সমার্থক। এ যেনো আরেক একাত্তর। চোখ মেলে তাকালেই মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোনো চলচ্চিত্রের কথা, যেখানে নারীর সার্থক অংশগ্রহণ আর প্রতিবাদী শ্লোগানে মূর্ত এক প্রাণেশ্বরী ক্যানভাস।
গণজাগরণ মঞ্চ এখন একটি স্বপ্নের নাম, একটি প্রত্যাশার বাতিঘরের মতো আমাদের সামনে অহোরাত্রি দৃশ্যমান। এ বাতিঘর মুহুর্মুহু শ্লোগানে যারা জ্বালিয়ে রেখেছেন, সে নারীরা যেনো একাত্তরেরই সারথি। এমন টানা আন্দোলন শেষ কবে দেখেছিলো বাংলাদেশ? কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো হতাশা নেই, কেবল একটি স্বপ্ন দু’ চোখের মাঝে দীপ্র জ্বালিয়ে সবখান থেকে ছুটে আসছে সব মানুষ, মায়ের হাত ধরে আসছে শিশু। কণ্ঠে তাদের শ্লোগান- জয়বাংলা।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সকল সময়ের এক অনন্য অনুপ্রেরণা। এ কথা সত্যি যে, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অপ্রতিম অংশগ্রহণ এখনও সেভাবে উঠে আসেনি ইতিহাসের পাতায়। ছয় দফা যদি বাঙালির মুক্তির সনদ হয়, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় যদি বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের মাইলফলক হয়- তবে স্বীকার করতেই হবে এ দুইটি পর্বতসম অর্জনের পেছনেও বাঙালি নারীর অবদান সূর্যের মতো ধ্রুব। যদিও বাঙালি নারীর মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রটি প্রথম ফুটে উঠেছে সেলিনা হোসেনের ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেলিনা হোসেন কি জানতেন, ২০১৩ সালে আবার সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাহসী চরিত্রে অবতীর্ণ হবে বাঙালি নারী। একাত্তরের বাঙালি নারীর অজেয় সাহসিকতার পুনরুত্থান ঘটেছে। বাঙালি নারীর যে আলোকোজ্জ্বল সত্তা, যে অগ্নিসম চেতনা; তারই দুর্বার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ২০১৩ সালে। প্রজন্মের এই আন্দোলনে একেবারে ঘর থেকে প্রজন্ম চত্বর পর্যন্ত অংশগ্রহণ করছেন নারীরা। গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিটি মানুষের এ প্রাণময় অংশগ্রহণের পেছনে রয়েছে মায়ের অনুপ্রেরণা। কোনো কোনো মায়েরা আছেন, সন্তানদের নিয়ে আসেন, সন্তানের কপালে বেঁধে দেন জাতীয় পতাকা; শ্লোগান ধরেন প্রজন্মের শ্লোগান কন্যাদের সঙ্গে। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদ ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের মায়ের কথা। শিবপুর গ্রামের বাড়ি থেকে আসাদের মা ছাত্রনেতাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন চেতনার বাণী- ‘আমার আসাদের মৃত্যু হয়নি। আমার আসাদ বলতো ‘মা আগামী দশ বছরের মধ্যে এই মাতৃভূমি নতুন জীবন পাবে। আমার আসাদের এই স্বপ্ন তোমরা সার্থক করো’। সেই মায়ের চেতনা আজও জীবন্ত শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। শহিদ আসাদের মা যেনো শহিদ রাজীবের মা হয়ে আমাদের চোখের সামনে জ্বেলে ধরেন স্বপ্নের মশাল। রাজীব হত্যার প্রতিবাদে কালো পতাকা উত্তোলন করে গণজাগরণ মঞ্চ। শ্লোগান কন্যাদের দৃপ্ত শ্লোগান আর প্রতিবাদের অগ্নিশিখা দেখে মনে পড়ে ১৯৬৯ সালের সেই চট্টগ্রামের কথা, যেখানে কালো দিবস পালন করেছিলেন নারী শিক্ষার্থীরা।
গত ০৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অহিংস আন্দোলনের শুরু থেকেই নারীদের সাহসিকতা আর শ্লোগানে উদ্বেল করে তোলার অদ্ভুত ঋদ্ধতাকে অভিবাদন জানিয়েছে সারা দেশ। তাদের প্রত্যেকের রক্ত কণিকায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা প্রবাহিত। মিরপুরের কসাই, রাজাকার কাদের মোল্লার মামলার যে রায় প্রত্যাখ্যান করেছিলো বাংলার মানুষ, তাকে আরও শক্তিশালী করে তোলার পেছনে এই নারীদের সাহসী অবদান ইতিহাসের অংশ। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বলিষ্ঠ শ্লোগানেই বাঙালি একই পঙক্তিতে অনুরণিত হয়েছে বিগত সাতাশদিন। তারই প্রেক্ষিতে রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় হয়েছে। এ অর্জনে নারীর অংশগ্রহণ এক আকাশের মতো অখণ্ড।
কেবল অংশগ্রহণকারী নারীরাই নন, তাদের সঙ্গে রয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরাও। বিভিন্ন গণমাধ্যমের নারী প্রতিবেদকগণ যে সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চের এ আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করছেন, তারা যেনো একেকজন সেলিনা পারভীন। মধ্য দুপুরের দীপ্রতার মতো তারা হয়ে উঠেছেন এ আন্দোলনেরই অংশ। তাই নারীর ক্ষমতায়ন ও নবজাগরণের প্রশ্নেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা হবে গণজাগরণ মঞ্চ।
১৯৭১ থেকে ২০১৩- এ দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের নারীরা কখনো চোখ রেখেছেন সূর্যোদয়ের ক্যানভাসে, কখনো নিকষ কালো রাত্রি তাদের ঘিরে ধরেছে নেমেসিসের মতো। এই প্রজন্ম চত্বরে আসা নারীদের অসীম সাহসিকতা যখন দেখি, যখন চোখ পড়ে যায় কোনো মায়ের কোলের শিশুর হাতে ধরা জাতীয় পতাকায়, যখন শ্লোগান শুনি শ্লোগান কন্যাদের কণ্ঠে, তখন বুকের খুব ভেতরে, খুব গভীরের রক্তধারা বলতে থাকে- তুমি ভালো থাকবে বাংলাদেশ। অযুত চোখের নিযুত স্বপ্নে তুমি ভালো থাকবে, প্রজন্মের লক্ষ-কোটি তরুণ-তরুণীর কোরাসে তুমি ভালো থাকবে। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র প্রতিটি শব্দের মতো তুমি শাশ্বত আর ধ্রুব হবে বাংলাদেশ। তুমি পথপ্রদর্শক হবে, যেনো অপ্রতিম তুলনারহিত মুক্তিযোদ্ধা-বীরাঙ্গনারা আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। সে পথ আলোর পথ, সে পথ যুদ্ধাপরাধীমুক্ত, সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতিমুক্ত এক অনিন্দ বাংলাদেশের পথ। প্রজন্ম চত্বরের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই নতুন বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হবে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে, হূদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হবে- বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা/ সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান। ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালির স্বপ্ন কোনোদিন বৃথা যায়নি।
