বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষুদ্র একটি জনবহুল দেশ। অত্যন্ত জনসংখ্যার চাপ, দুর্নীতি, গুম-হত্যা, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশটি। এতকিছুর পরেও দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে। তবে নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে পৃথিবীতে আরেকটি পরিচয় এনে দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আজ অনেক দেশই অনুসরণীয় বলে মনে করে। বাংলাদেশের মত একটি দেশের সরকার প্রধান এবং বিরোধী দলের প্রধান উভয়ই হলেন নারী। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ এ উন্নীত করেছেন। মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা অধিষ্ঠিত আছেন। সংসদ উপনেতা হিসেবেও একজন নারীকে বেছে নিয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার। তাছাড়া আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আসীন রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রধান হিসেবেও বাংলাদেশে নারীদের স্থান দেখা যায়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০২১ সাল নাগাদ প্রশাসন, চাকরি ও নেতৃত্বসহ বাংলাদেশের সব কর্মক্ষেত্রের অর্ধেক ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করবে নারীরা। এছাড়া তিনি সংসদেও নেতৃত্বের সব পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন করার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা আমাদের দেশের নারী সমাজের জন্য যেমন আশা জাগানিয়া তেমনি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তা হবে ফলপ্রসূ।
ক্ষমতায়নের স্বরূপ অনেক রকমের হতে পারে। যেমন: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের উপায় হচ্ছে— রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত নারীদের দায়িত্ব প্রাপ্তি, নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টিকারী আইন পরিবর্তন, সার্বজনীন পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন, নারীর কাজের স্বীকৃতি প্রদান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীর অভিগম্যতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। জেন্ডার ক্ষমতায়ন সূচকে বাংলাদেশের স্থান ১০৪ টি দেশের মধ্যে ৭৭ তম। এদেশে পারিবারিক নির্যাতনও মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করছে। বর্তমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২৫ কোটি অভিবাসী কর্মী রয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক কর্মরত আছে যার অর্ধেকই নারী। এখন তারা স্ব-উদ্যোগেই কাজ নিয়ে বাইরে যাচ্ছেন। তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া জরুরি। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে সারাবিশ্বে মাত্র ১২টি দেশ রপ্তানিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। আর এর পেছনে নারী শ্রমিকদের অবদান সবথেকে বেশি। আর দেশের অর্থনীতির অক্সিজেন গার্মেন্টস সেক্টরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তো আমাদের প্রান্তিক নারীরা। এ সেক্টরে ৩৫ লাখ শ্রমশক্তি নিযুক্ত, যার শতকরা প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। দেশের বাণিজ্য নীতি আরও নারীবান্ধব হলে এখাতে নারীর অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।
২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে শুধু টেক্সটাইল সেক্টর নয়, আরও সম্ভাবনাময় সেক্টরগুলোর উন্নয়ন এবং নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণাও দিয়েছেন যে, ২০২১ সালের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য। তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়াও বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতের মধ্যে রয়েছে; ওষুধ শিল্প, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, আইসিটি সেক্টর ইত্যাদি। আর এই সেক্টরগুলোর প্রত্যেকটির টিকে থাকার জন্য নারীর অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য এই ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। এই জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মালিক পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের মজুরি পুরুষের সমান করতে হবে এবং অন্যান্য সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে এবং সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে নারীরা আসীন। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারীদের পদচারণা আজ আশা জাগানিয়া। আমাদের নারীরা হিমালয় জয় করছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতার স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার নিয়ে আসছেন, গবেষণায় সফল হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নারী পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু এতোকিছুর পরও আমরা কী বলতে পারি আমাদের নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু পাচ্ছেন? বাতির নিচে অন্ধকারের মতোই নারীরা যেমন দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তেমনি শিকার হচ্ছেন নানা হয়রানির। পথেঘাটে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ এখনও নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, পারেনি নারী নির্যাতন রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা আরও মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণ করে দিল্লীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশেও। চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত অটো রিকশায় ধর্ষিত হয়েছেন এক নারী। এই ধরনের ঘটনা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। গত কয়েকদিনে আমরা দেখেছি কয়েকটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা। ঘরেও তারা নিরাপদ না। সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকার পরও দেখা যায় ঘরে ফিরে বাড়ির লোকের নানা অভিযোগের এবং বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য দায়ী মূলত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। সঠিক শিক্ষাই পারে নারীদেরকে তাদের পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দিতে।
আমাদের পশ্চাত্পদ বৃহত্তর নারী জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের নারীরা এখনো পশ্চাত্পদ। তবে, শিক্ষার হার বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বৃহত্ জনগোষ্ঠী দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত হতে পারেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা নারী সমাজের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যাবার প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যের উপস্থিতি রাখার বিধান রয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের সবথেকে আলোচিত বিষয় হলো নারীর ক্ষমতায়ন। সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের নারীরাও এগিয়ে চলেছেন। পুরুষের পাশাপাশি তারা নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে নেতৃত্বের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এতোকিছুর পরও নারী, বিশেষ করে যারা প্রান্তিক নারী তারা নির্যাতন-নিষ্পেশনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষার যে কোনো বিকল্প নেই তা বহুবার-বহুভাবে প্রচারিত হয়েছে। সেই পথে অগ্রসরও হচ্ছে আমাদের দেশ। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের নানা রোমহর্ষক চিত্র। এভাবে চলতে চলতে চলে এলো আরেকটি নারী দিবস। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘দ্য জেন্ডার এজেন্ডা গেইনিং মোমেন্টাম’। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশ কতোদূর অগ্রসর হতে পেরেছে বা পারছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
