ভ্যাটিকান এখন পোপশূন্য। গত সপ্তাহে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মের প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান অশীতিপর পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট। পোপের দায়িত্ব তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পালন করে যাবেন, এমনই ভাবেন ক্যাথলিকরা। কিন্তু চিরাচরিত সেই ভাবনাকে ভেঙে দিয়ে বেনেডিক্ট জানিয়েছেন, শরীর দিচ্ছে না। অবসর নিতে চান। ক্যাথলিক দুনিয়ায় তিনিই উচ্চতম পদে ছিলেন। তাই অবসর গ্রহণ করলে কারও কাছে পদত্যাগ পত্র দাখিল করার প্রয়োজন নেই। যদিও ক্যাথলিক ‘ক্যানন আইন’ অনুযায়ী ‘কলেজ অফ কার্ডিনাল’ এবং তার ডিনের কাছে অবশ্যই থাকতে হবে পদত্যাগের খবর।
প্রাসাদের বন্ধ দরজার আড়ালে ততক্ষণে ঘটে গেছে অন্য এক ঘটনা। ষোড়শ বেনেডিক্টের হাতের সিগনেট আংটি খুলে নিয়ে একটি রূপোর হাতুড়ি দিয়ে সেটিকে ভেঙে ফেলেছেন ভ্যাটিকানের প্রশাসনিক প্রধান। ‘ফিশারম্যান’স রিং’ নামে পরিচিত এই আংটিতে খোদাই করা থাকে সেন্ট পিটার্স-এর ছবি। পেশায় জেলে ছিলেন এই খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক, তাই আংটির নাম ‘ফিশারম্যান’স রিং’। ছবি ছাড়াও আংটিতে খোদাই থাকে পোপের নাম। তবে আংটি ভাঙ্গার আগে অন্য আর একটি কাজ করতে হয়। পোপের মাথায় রূপোর হাতুড়ি ঠুকে আগে নিশ্চিত হতে হয় পোপ আর জীবিত নেই। এ ক্ষেত্রে ষোড়শ বেনেডিক্ট স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়ায় মাথায় হাতুড়ি ঠোকার কোনো প্রয়োজন হয়নি। এপ্রিল পর্যন্ত ক্যাসল গান্দোলফোয় কাটিয়ে প্রাক্তন পোপ চলে যাবেন তার নতুন বাসগৃহে। এটি একটি পরিত্যক্ত কনভেন্ট। বর্তমানে এখানে মেরামতির কাজ চলছে। এখন থেকে তিনি ক্যাথলিক দুনিয়ায় পরিচিত হবেন ‘পোপ এমেরিটাস’ হিসেবে এবং তাকে ‘ইওর হলিনেস’ সম্ভাষণে সম্বোধন করা হবে।
যে কারণে পদত্যাগ: ষোড়শ বেনেডিক্ট নাম গ্রহণকারী জোসেফ রাটজিঙ্গার, তখন ধর্মতত্ত্বের দুনিয়া কাঁপানো অধ্যাপক। ক্যাথলিক দুনিয়ায় তিনি পরিচিত কয়েক ডজন বই এবং ছকভাঙা, চিন্তা উস্কে দেয়া বক্তৃতার জন্য। এই রাটজিঙ্গার সত্তাকে পোপের ছাঁচে ফেলতে গিয়েই যত বিপত্তি। পোপ হওয়ার পরেও নিজের বই লেখা চালিয়ে গিয়েছেন বেনেডিক্ট। এবং সেটাও জোসেফ রাটজিঙ্গার নামে। তার নিচে ছোট্ট করে লেখা থাকত ‘পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট’। অথচ ভ্যাটিকানের নিয়ম অনুযায়ী পোপ নিজের বই লিখতে পারেন না। কারণ তার ‘নিজস্ব’ বলে কিছু নেই। ঠিক এই ভাবনাটার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা থেকেই এই ‘বিপ্লবের’ জন্ম। কিন্তু সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটা ঠিক কী কারণে নিয়েছেন, সেটা ভ্যাটিকানের ভিতরের সদস্য এবং চার্চ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। তাতে যে ছবিটা বেরিয়ে এসেছে, সেটা এক অতি বিচক্ষণ মানুষের, যিনি চার্চের রোজকার কাজকর্মের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে না পেরে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছিলেন। এর মধ্যে ২০১২-এর মে মাসে একটা ঘটনা বেনেডিক্টের আত্মবিশ্বাস কিছুটা নাড়িয়ে দেয়। পাওলো গ্যাব্রিয়েল নামে পোপের ব্যক্তিগত বাটলার কিছু স্পর্শকাতর নথিপত্র সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দেয়। তার জেরে ভ্যাটিকানের দুর্নীতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। চাপা স্বভাবের বেনেডিক্ট এই ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। সমস্যা আরও ছিল। নতুন করে টাকা নয়-ছয়ের অভিযোগ ওঠে ভ্যাটিকান ব্যাংকের বিরুদ্ধে। তার উপরে ছিল যাজকদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ। ঘটনা এতদূর গড়ায় যে আয়ারল্যান্ডের মতো গোঁড়া ক্যাথলিক দেশও চার্চের প্রধানের ইস্তফা দাবি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পোপের সমকামিতাবিরোধী মনোভাব। জার্মান সাংবাদিক পিটার সিওয়াল্ডের কথায়, ‘আমার মনে হয়, তার বিরুদ্ধ মত ক্রমে বাড়ছিল। মোকাবিলা করার মতো যথেষ্ট ভরসার উপাদান তার কাছে ছিল না।
অবসরের পরে : ক্যাথলিক দুনিয়ার সর্বোচ্চ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর গান্দোলফো ক্যাসলের গ্রীষ্মকালীন পোপ আবাসনই হবে বেনেডিক্টের অস্থায়ী ঠিকানা। তবে ভ্যাটিকান কনভেন্টের সংস্কার পূর্ণ হলে এপ্রিল নাগাদ পাকাপাকিভাবে সেখানে চলে আসবেন তিনি। ধর্মকর্ম এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বাকি জীবনটা সম্ভবত সেখানেই কাটাবেন। দক্ষিণ রোমের গান্দোলফো ক্যাসল। পাহাড়ে ঘেরা মনোরম পরিবেশ। ঝুল বারান্দা থেকে গান্দোলফো হ্রদের কোলে সূর্যাস্ত দেখা যায়। রয়েছে বিশাল বাগান। ঝাউ-ঘেরা চওড়া রাস্তা। বিশেষ প্রার্থনা কক্ষ। অবসরের পর এমন জায়গাই আদর্শ বলে মনে করেছে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া প্রতি মাসে সম্মানি হিসেবে তাকে তিন হাজার ৩৪০ ডলার দেয়া হবে। এর বাইরেও তার ব্যক্তিগত খরচ, থাকা-খাওয়ার খরচ বহন করবে ভ্যাটিকান।
নতুন পোপের সন্ধানে :ভ্যাটিকানের কাছ থেকে অব্যাহতি নেয়ার আগের সপ্তাহে বিদায়ী পোপ নিজের উদ্যোগে বদল করেছিলেন এক আইন। নতুন আইনে আগের মতো আর ১৫দিন অপেক্ষা করতে বাধ্য নন ‘কলেজ অফ কার্ডিনাল’-এর সদস্যরা। বরং যত দ্রুত সম্ভব নতুন পোপ নির্বাচনের কাজ শুরু করে দিতে হবে তাদের। মনে করা হচ্ছে, মার্চের মাঝামাঝিতেই হয়তো নতুন পোপ পেয়ে যাবেন ক্যাথলিকরা। তাকে সামনে রেখেই আগামী ইস্টার পালনের কথা ভাবছে ভ্যাটিকান। তাই সময় নষ্ট না করে আলোচনায় বসতে চলেছেন ১১৫ জন কার্ডিনাল। নতুন পোপ হওয়ার দৌড়ে যারা এগিয়ে রয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ইতালির কার্ডিনাল অ্যাঞ্জেলো স্কোলা (৭১ ), কানাডার মার্ক উলেট (৬৮), ইতালির গিয়ানফ্রাঙ্কো রাভাসি (৭০), অস্ট্রিয়ার ক্রিস্টোফ শোয়েনবর্ন (৬৮), ব্রাজিলের অদিলো শেরার (৬৩), আর্জেন্টিনার লেওনার্দো সান্দ্রি (৬৩), ঘানার পিটার টার্কসন (৬৪), ফিলিপাইনের লুই তাগলে (৫৫), ব্রাজিলের হোয়াও ব্রাজ দ্য আভিজ (৬৫) এবং যুক্তরাষ্ট্রের টিমোথি ডোলান (৬২)।
