শান্তির পথ কতদূর

থাই সরকার ও মুসলিম বিদ্রোহীদের চুক্তি

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:৪৩
থাইল্যান্ড সরকার ও দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিম বিদ্রোহীদের মধ্যে সমপ্রতি শান্তি আলোচনার জন্য এক চুক্তি হয়ে গেল। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ঊর্ধ্বতন থাই নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং বারিসান রেভালুসি নাসিনালের (বিআরএন) সদস্যদের মধ্যে এ চুক্তি সই হয়। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষর হলেও এই সংগঠনটির অস্তিত্ব নিয়ে অনেকে নানা প্রশ্ন তুলেন। তাদের মতে, এটা নামসর্বস্ব একটি সংগঠন। সত্যিকার অর্থে তারা শান্তি আলোচনায় কতখানি আন্তরিক তা নিয়েও রয়েছে অনেক সংশয়। এছাড়া তাদের প্রকৃত সদস্য সংখ্যা কত, তাদের নেতা কারা, এটাও অস্পষ্ট। এতে করে তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে সরকার তাদের আলোচনার টেবিলে ডেকে এক অর্থে সংগঠনটির বৈধতা দিল। অন্যদিকে আবার কেউ কেউ বলছেন, এ দলটি প্রতিষ্ঠা লাভের পর সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। তাই আর কোন নতুন হত্যাযজ্ঞের চেয়ে শান্তি আলোচনাই শ্রেয়। তবে তারা এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, এটা সরকারের কোন লোক দেখানো অনুষ্ঠান নয়তো? কেননা এর আগেও অনেক বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে এ ধরনের বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এ কারণে অনেকের মাঝে একটা আশঙ্কার জায়গা সৃষ্টি হয়েছে যে, সত্যিকার অর্থে শান্তি আলোচনার পথ কতদূর? সরকারই বা এ সংকট নিরসনে কতখানি আন্তরিক? ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে বারিসান রেভালুসি নাসিনাল বা বিআরএন সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এরপর প্রথম দিকে এর তেমন কোন তত্পরতা লক্ষ্য করা যায়নি। ২০০৪ সালে এটা প্রথম সবার নজরে আসে। এ সময় সংগঠনটি নারাথিওয়াট প্রদেশে একটি আর্মি ক্যাম্পে হানা দিয়ে সেখানকার বহু অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নেয়। তখন থেকেই এটি থাই রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং ক্রমেই তা সরকারের কাছে এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে এরা অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে। নগদ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে দলে যুবকদের ভেড়ানো হয়। ২০০৬ সালের ১৫ মে পাত্তানিতে যে ভয়াবহ বোমা হামলা হয় এই গ্রুপটিই সে হামলা চালায়। আস্তে আস্তে এরা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম অবলীলাক্রমে চালাতে থাকে। এদের টার্গেটে পরিণত হয় বহু লোক। এভাবে সেখানে অনেক নিরীহ লোককে প্রাণ দিতে হয়েছে। যদিও এই সংগঠনটির দাবি, তারা একটি সুন্নী মুসলিম গ্রুপ। দক্ষিণাঞ্চলে পাত্তানি প্রদেশে তারা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ লক্ষ্যেই তারা তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। পাত্তানিতে যে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো রয়েছে তার মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় সক্রিয় দল হচ্ছে বিআরএন। থাইল্যান্ড সরকার এ কারণে তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে এর আগে সরকার ও সেনাবাহিনী অনেকবার এই বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করতে পারলেও শান্তি আলোচনায় কোন পথ সুগম হয়নি। এবারই এই প্রথম এ ধরনের কোন উদ্যোগ নেয়া হলো। তাই বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের আসন্ন আলোচনাকে অনেকেই গুরুত্ব সহকারে দেখেন। তাদের মতে, যে হারে বিদ্রোহীরা বেপরোয়া ও আত্মঘাতী দলের সদস্য হয়ে উঠছে তাতে করে এ সমস্যা যদি সমাধান না করা যায় তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণেই থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা সমপ্রতি মালয়েশিয়া সফরে যান। তখন মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় ওই শান্তি আলোচনায় সম্মত হয় থাই সরকার ও মুসলিম বিদ্রোহীরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুরে এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে থাই সরকারের পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাসচিব পারাড্রন এবং বিদ্রোহীদের পক্ষে ন্যাশনাল রেভুল্যুশন ফ্রন্টের প্রধান হাসান তায়িব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ তাজউদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির পর উভয়পক্ষই এর একটা সুষ্ঠু সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কেননা এই প্রথম দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে সরকার, যা অবশ্যই একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। এ মাসের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে এই আলোচনা হওয়ার কথা। থাইভিত্তিক একটি নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিস বলেন, এই শান্তি আলোচনা বাস্তবিক অর্থে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বহন করে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা এ সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে যাচ্ছে। এটা কেবল একটা পদক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটা বিদ্রোহীদের বৈধতা দেয়ার এক অগ্রযাত্রাও বটে। তবে এ আলোচনার পাশাপাশি কোনো যুদ্ধবিরতি হবে কিনা সে ব্যাপারে কোনোকিছু তাত্ক্ষণিকভাবে বলা হয়নি। থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সঙ্গে বৈঠকের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেন, আমাদের মধ্যস্থতায় আশা করা যাচ্ছে এর ভালো কোন ফলাফল আমরা পাবো। সেইসঙ্গে তিনি বলেন, এটা কোন চূড়ান্ত সমাধানের পথ নয়, একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। এর আগে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে বসেছিল মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) ও ফিলিপাইন সরকার। এবারও সেই একই পথ ধরে এগুচ্ছে মালয়েশিয়া। নাজিব রাজাক বলেন, আমরা আশা করছি এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের যা যা করা দরকার তা-ই আমরা করবো। মালয়েশিয়া বলেছে, আমাদের এ ক্ষেত্রে স্বার্থ একটাই, তাহলো আমরা এ অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভিতরে যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত রয়েছে তার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই।