ভারত সরকারের জারি করা একটি আইনের কারণে উদ্বিগ্ন সুনিতা দেবী। ২৮ বছর বয়সী সুনিতার গর্ভে বড় হচ্ছে একটি শিশু। তার নিজের সন্তান নয় এটি। কানাডীয় এক পুরুষের সন্তান বহন করছেন তিনি। শিশুটির ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তার শেষ নেই সুনিতার, একই সঙ্গে নিজের কথাও ভাবছেন তিনি। সুনিতা অর্থের বিনিময়ে তার গর্ভ ভাড়া দিয়েছেন (এ ধরনের মায়েদের বলা হয় সারোগেট মা)।
অর্থের বিনিময়ে ভারতের অনেক নারীই গর্ভ ভাড়া দিয়ে থাকেন। সরকারের সমর্থনে রীতিমতো একটি বিকাশমান ব্যবসা খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। নিঃসন্তান অনেক বিদেশি দম্পত্তি ভারত এসে এভাবে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের শেষ দিকে নতুন আইনের কপি ভারতের সব কয়টি বিদেশি দূতাবাসে প্রেরণ করেছে। এতে বলা হয়েছে সমকামী দম্পতি, বিয়ে করেনি এমন নারী কিংবা পুরুষ, বিয়ে ছাড়াই দাম্পত্য জীবন-যাপন করছে এমন নারী-পুরুষ ও বাণিজ্যিকভাবে সন্তান জন্মদান অবৈধ এমন দেশের নারী-পুরুষের সন্তান বহন করা যাবে না। সুনিতার দুশ্চিন্তার কারণ হচ্ছে, তিনি যে ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তার গর্ভ ভাড়া দিয়েছেন, সেই ব্যক্তি অবিবাহিত। এখন শিশুটি কীভাবে তার কাছে হস্তান্তর করবেন, পারবে কী শিশুটি কানাডা যেতে এটাই এখন তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।
আইনটি শুধু সুনিতা দেবীকেই দুশ্চিন্তায় ফেলেনি, দুশ্চিন্তায় ফেলেছে ভারতের আড়াই বিলিয়ন ডলারের সারোগ্যাসি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তদেরও। আইনে আরো বলা হয়েছে, যদি কোন নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে গর্ভ ভাড়া নিতে চান, তবে তাদের যথাযথভাবে বিবাহিত হতে হবে এবং তাদের দাম্পত্য জীবন কমপক্ষে দুই বছর স্থায়ী হতে হবে। গর্ভ ভাড়া দানকারীর বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। একজন নারী পাঁচবারের বেশি গর্ভ ভাড়া দিতে পারবে না। ওই নারী বিবাহিত হলে অবশ্যই স্বামীর অনুমতি নিতে হয়।
প্রতি বছর ভারতে কমপক্ষে ২৫ হাজার বিদেশি দম্পতি ভ্রমণ করেন এভাবে গর্ভ ভাড়া নিয়ে সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে। এভাবে প্রতিবছর জন্ম নেয় দুই হাজার শিশু। বিদেশি দম্পত্তিদের ভারত প্রীতির অন্যতম কারণ হচ্ছে অল্প অর্থ ব্যয় করে সন্তান পাওয়া যায়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য খরচ পড়ে এক থেকে দুই লাখ ডলার, সেখানে ভারতে প্রয়োজন মাত্র ১৮ থেকে ৩০ হাজার ডলার। তবে এজেন্টসহ অন্যান্য খাতে খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়। সরকারের নীরব সমর্থনে এটি একটি জনপ্রিয় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সন্তান জন্মদান অবৈধ এমন দেশ থেকে রীতিমতো এজেন্টরা নিঃসন্তান দম্পতিকে পাঠাচ্ছেন ভারতে। ইসরাইল ভিত্তিক তামুজ ডট কম ২০০৮ সাল থেকে সন্তান নিতে ইচ্ছুক এমন দম্পত্তিদের সন্তানের জন্য ভারত পাঠাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডোরোন ম্যামেট বলেন, ভারত হলো ভাড়ায় গর্ভধারণের এক চমত্কার স্থান। অত্যন্ত আধুনিক মেডিক্যাল সেবা এবং কম খরচ যে কাউকে এ সুবিধার জন্য আকৃষ্ট করে ভারত। সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য ভারতে নিবন্ধন ও অনিবন্ধনকৃত প্রায় এক হাজার ফার্টিলিটি সেন্টার রয়েছে। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান হলো নয়াদিল্লিভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফার্টিলিটি সেন্টার। যেখানে সুনিতা দেবীর নিবন্ধন রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, নতুন বিধির কারণে হয়তো বিকাশমান এ ব্যবসার উপর ৫ থেকে ৭ শতাংশ প্রভাব পড়বে। তবে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চিকিত্সকরা বলছেন, নতুন আইনটি তাদের মেডিক্যাল ট্যুরিজম ব্যবসার উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বিপর্যস্ত হবে এর সঙ্গে জড়িত নারীরা। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত সারোগেসি সেন্টার ইন্ডিয়ার পরিচালক শিবানি সাচদেব গৌর মনে করেন, ভারতীয় নারীরা কেবল অর্থ নয়, অন্য একটি পরিবারকে সাহায্য করার জন্যও গর্ভ ভাড়া দেন।
গর্ভ ব্যবসাকে সমর্থন করে এমন অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, ভারতেও বিয়ে এবং পরিবার একটি অলংঘনীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বসহ অনেক দেশই সারোগ্যাসিকে সমর্থন না করলেও ভারত একে সমর্থন করে। এতে আদতে উপকৃত হন একটি সন্তানের জন্য উন্মুখ এমন অনেকে। আর এই জন্যই ভারত সরকারের আইন করা। যাতে ঝামেলা ছাড়াই ব্যবসাটি বিকাশ হতে পারে। এ নিয়ে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় সরকার এই আইনটি করে।
নরওয়ের এক নারী বছর দুই আগে এভাবে ভারতে দুটি যমজ সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তাদের দেশে নিয়ে যাবার সময় । আইনি লড়াই বহুদিন চলে। পরে গত বছরের শেষ দিকে নরওয়ে তাদের ভিসা দেয়। এক নিঃসন্তান জার্মান দম্পতি ভারতে এসে এক গুজরাটি মহিলার গর্ভ ভাড়া নিয়েছিলেন প্রায় বছর তিনেক আগে। ওই মহিলা যমজ সন্তান প্রসব করেন। কিন্তু ঝামেলা বাধে ওই যমজ সন্তানকে দেশে নিয়ে যাবার সময়। ভাড়া করা গর্ভজাত সন্তানের বৈধতা নেই জার্মানিতে। ভিসা দিতে অস্বীকার করে জার্মান সরকার। ফলে শিশু দুটির নাগরিকত্ব কী হবে তাই নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হয়। ভারতীয় আইনেও এই ধরনের সন্তানকে নাগরিকত্ব দেবার কোন সংস্থান ছিল না। তবে নতুন আইনে বলা হয়েছে, এখন গর্ভ মাতাই এ ক্ষেত্রে সন্তান দেখভাল করবেন। জার্মান দম্পতির ক্ষেত্রে মামলা চলে দুই বছর। প্রথমে গুজরাট হাইকোর্টে পরে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের সক্রিয় উদ্যোগে জার্মান সরকার ব্যতিক্রম হিসেবে ওই জার্মান দম্পতির যমজ সন্তানের ভিসা মঞ্জুর করে। এক জাপানি দম্পতিরও ভাড়া করা গর্ভজাত সন্তান নিয়ে ভিন্ন রকম সমস্যা হয়েছিল। সন্তান জন্মের আগেই দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সেক্ষেত্রে নবজাত সন্তানের নাগরিকত্ব তথা ভবিষ্যত্ কী হবে তাই নিয়ে সৃষ্টি হয় এক মানবিক সমস্যার। ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যা যাতে না হয় তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করতে সরকার ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের ১২ সদস্যের এক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন। কমিটি ২০০৯ সালে একটি রিপোর্ট দেয়। লন্ডনের মিডলসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওলগা ভ্যান ডেন আকের বলেন, নতুন আইনের ফলে সারোগেট শিশু তার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সক্ষম হবে।
কিছু কিছু দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গর্ভ ভাড়া দেয়া বৈধ। যেমন রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ বিশেষ অবস্থায় এভাবে সন্তান জন্ম নেয়া যায়। কিন্তু ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে কোনো অবস্থাতেই গর্ভ ভাড়া দেয়ার বিধান নেই। সমকামী দম্পতি কিংবা সিঙ্গেল প্যারেন্টস গর্ভ ভাড়া নিতে পারে সেসব দেশে। যুক্তরাষ্ট্র রাজ্যে এই আইন ভিন্ন। আরকানসাসে একক ব্যক্তি ইচ্ছে করলে গর্ভ ভাড়া নিতে পারে। কিন্তু সমকমী দম্পতি সেখানে এ সুবিধা নিতে পারবে না। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিয়ে করতে হবে কিংবা অন্য কোন বিধি নিষেধ নেই। ভারত সরকার এই নতুন আইনটি বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর। ফার্টিলিটি সেন্টারগুলোকে ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখের মধ্যে চলমান গর্ভ ভাড়া দেয়া নারীদের তালিকা দিতে বলা হয়েছে। ইসরাইলের মামেট বলেন, নতুন আইনটি নিয়ে সন্তান নিতে চান এমন ২০০ দম্পতির সঙ্গে তার বসার কথা রয়েছে। এ দম্পত্তিদের ভারতে আসার কথা আছে এবং প্রত্যেকেই ভারতে খরচ করে যাবে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার।
এসব ব্যবসার মধ্য দিয়ে কোটি কোটি ডলার আয় করা হলেও গর্ভধারণকারী ভারতীয় নারী একবার গর্ভ ভাড়ার বিনিময়ে সাড়ে তিন লাখ রূপির বেশি পান না। অবশ্য যমজ সন্তান জন্ম দিলে গর্ভ ভাড়া দানকারী নারীকে আরো ২০ শতাংশ বেশি অর্থ দিতে হয়। কিন্তু এভাবে একটা সন্তান পেতে হলে দম্পতিকে গড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ রূপি খরচ করতে হয়। এ ছাড়া গর্ভকালীন এ ধরনের নারীদেরকে প্রতি মাসে মাত্র এক হাজার রূপি দেয়া হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের দিকটি হচ্ছে- গর্ভকালীন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা সামাল দেয়ার জন্য কোনো বীমার ব্যবস্থা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার সমাজকর্মী মার্গারেট (ছদ্মনাম) সন্তান জন্মদানে অক্ষম। শিশু দত্তক নেয়ার দীর্ঘ চেষ্টার পর ৩৯ বছর বয়সে তিনি অন্য নারীর গর্ভ ভাড়া নিয়ে সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই যমজ দুই সন্তানের মা হয়েছেন তিনি। তার মতো অস্ট্রেলীয় অনেক নারীই ভারতীয় নারীদের গর্ভাশয় ভাড়া নিয়ে সন্তান লাভ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার এক জরিপে বলা হয়, দেশটির দম্পতিরা ভারতীয় নারীদের গর্ভ ভাড়া নিয়ে কেবল গত বছরই দুইশ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের গবেষক মেরিলিন ক্র্যাশো বলেন, ভারতীয় নারীদের গর্ভ ব্যবহার করে সন্তান উত্পাদনকারী বিদেশি দম্পতিদের প্রায় অর্ধেকই অস্ট্রেলীয়। ভারতে রিকশার পেছনে, পত্রিকায় এবং ওয়েবসাইটেও এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। ‘সারোগেট ফাইন্ডার ডটকম’ দেখেও অনেকে যোগাযোগ করছেন এসব মহিলার সঙ্গে। এমনই একজন মহিলা হলেন নাগমণি। থাকেন হায়দরাবাদে। শুধু টাকার লোভেই এ পেশায় জড়িয়েছেন তিনি।
